.

Friday, July 11, 2014

১৭ মার্চ ১৯৯২, রাবি'র ইতিহাসের এক কালো দিবস

(শহীদ ইয়াসীর আরাফাত পিটু)






(গুরুতর আহত আমীর আলী হলের জিএস জাসদ ছাত্রলীগ নেতা প্রিন্স ও লিটন)
ইসলামী ছাত্র শিবির, একটা প্রতিষ্ঠিত সন্ত্রাসী সংগঠন। তাদের মূল দল জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী প্রধান দল। সেই সময়ে জামাতের তৎকালীন ছাত্র সংগঠনের নাম ছিল ইসলামী ছাত্র সংস্থা। জেনারেল জিয়ার আমলে ১৯৭৭ সালে পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তারা ইসলামী ছাত্র শিবির নামে বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করে এবং মূল ধারার রাজনীতি করার সুযোগ পায়। পরবর্তীতে স্বৈরশাসক এরশাদের ছত্রছায়ায় লালিত পালিত ইসলামী ছাত্র সংঘের বাংলাদেশী ভার্সন ছাত্র শিবির আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে নামে তাদের শক্তি প্রদর্শনে। ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রাম কলেজের সোহরাওয়ার্দী হলের ১৫ নম্বর কক্ষে শিবিরের কর্মীরা ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ও মেধাবী ছাত্র শাহাদাত হেসেনকে জবাই করে হত্যা করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে হাত পায়ের রগ কেটে হত্যার রাজনীতির সূচনা করে। এর পরে ১৯৮৬ সালে চট্রগাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের প্রভাবশালী নেতা আব্দুল হামিদ এবং ১৯৮৭ সালে কারমাইকেল কলেজের জাতীয় ছাত্রলীগ (বাকশাল সমর্থিত) নেতা আব্দুস সবুরের হাত কেটে নিয়ে কর্তিত হাত বল্লমের ফলায় গেঁথে উল্লাস প্রকাশ করে এবং নৃশংস রূপে আবির্ভূত হয় শিবির।

(শহীদ ইয়াসীর আরাফাত পিটু)

শিবিরের তেমনি এক নৃশংসতার সাক্ষী হয়ে আছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণ আদালতে একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচারের দিন যতই এগিয়ে আসছিল ততটাই মরিয়া হয়ে উঠছিল ৭১ এর পরাজিত শক্তি জামাত-শিবির চক্র। তারই অংশ হিসাবে এই সন্ত্রাসী সংগঠন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ধরনের একটা হামলার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি ছিল খুবই উত্তেজনাপূর্ণ। তেমনি এক সময় ১৭ মার্চ ১৯৯২ ইং, ফাকা ক্যাম্পাসে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রগতিশীল ছাত্র ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের উপর পুলিশের সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের বর্বরোতম হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রথম বর্ষের ছাত্র শহীদ ইয়াসীর আরাফাত পিটুকে। আহত করা হয় শতাধিক ছাত্রকে। গান পাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয় বিভিন্ন হল।

যাই হোক বলছিলাম রাবির ইতিহাসের এক কালো দিবসের কথা। সেই প্রসঙ্গে ফিরে যাই। ১৯৯২ এর ১৭ মার্চ জাসদ সমর্থিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (না-শ), ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র ইউনিয়নসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি রাগিব আহসান মুন্না, তৎকালীন জিএস রুহুল কুদ্দুস বাবু, ছাত্র মৈত্রী নেতা সাদাকাত হোসেন বাবুল খান, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ও সিনেট সদস্য আব্রাহাম লিংকনসহ ৬০ জন প্রগতিশীল নেতা কর্মীর নামে শিবির কর্তৃক দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে রাজশাহী শহরের সাহেব বাজার বড় রাস্তায় প্রতীক অনশন কর্মসূচীর ডাক দিয়েছিল। সেই কর্মসূচী সফল করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতা কর্মীরা যখন ক্যাম্পাস থেকে শহরে যায়। শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচী পালন শেষে সবাই মিছিল করে যখন ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন তখন শান্তিপূর্ণ সেই মিছিলের সামনে থাকা মেয়েদের সাথে পরিকল্পিতভাবে অসদাচরণ করে পুলিশ। এতে ছাত্রদের সাথে পুলিশের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের এক পর্যায়ে পুলিশ সেই মিছিলে বেধড়ক লাঠিচার্জ করে। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে মিছিল কারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ফিরতে থাকে। কিন্তু শহরের সেই ঘটনার সাথে সাথেই ফাকা মাঠে বিনা বাঁধায় সকল আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসের দখল নেয় চট্টগ্রামের কুখ্যাত সিরাজুস সালেহীন বাহিনীসহ কয়েক শত সশস্ত্র বহিরাগত শিবির সন্ত্রাসী । আর এই কাজে তাদের সহযোগিতা করে তখনকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এমএ মতিনের পুলিশ বাহিনী। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ কলাভবন থেকে ক্লাস করে বের হওয়া রাষ্ট্র বিজ্ঞান ১ম বর্ষের ছাত্র বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (না-শ) নেতা ইয়াসীর আরাফাত পিটুকে রোজা রাখা অবস্থায় ভিসির বাস ভবনের সামনে বুকে এবং পায়ে গুলী করে হত্যা করে জামাত শিবির চক্র ও তাদের দোসর পুলিশ বাহিনী। এসময় বুকে গুলিবিদ্ধ হন সেই সময়ের রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ক্যাম্পাসের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা নেতা মনোয়ার রুশো (এম এম রুশো, পরে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি)সহ আরও দুই ছাত্রনেতা।

শুধু পিটুকে হত্যাই নয় সেদিন শিবির সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত হন জাসদ ছাত্রলীগের আইভি, নির্মল, লেমন, রুশো, জাফু, ফারুক, আমীর আলী হল ছাত্র সংসদের জি এস প্রিন্স এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের রাজেশ সহ প্রায় দেড় শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী আহত হয়। এদের অধিকাংশেরই হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়া হয় এবং রাজেশের কব্জি কেটে ফেলা হয়। এই হামলার সময় শিবির ক্যাডাররা এস এম হল, আমির আলী হল এবং লতিফ হল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ব্যাপক আকারে গান পাউডারের ব্যবহার করায় হলের জানালার কাঁচগুলো গলে গিয়েছিলে। লতিফ হলের অনেকগুলো কক্ষ দীর্ঘ দিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। পুরো ক্যাম্পাস জুড়েই সেদিন তাণ্ডবলীলা চালায় শিবির সন্ত্রাসীরা। এই হামলার তীব্রতা এতই ছিল যে, বেলা ১১টায় শুরু হওয়া হামলা বিকেলে বিডিআর নামানোর আগ পর্যন্ত বন্ধ হয়নি।

    এই ন্যক্কার জনক ঘটনার পরে তৎকালীন পাঁচ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় নেতা হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেননসহ একটা প্রতিনিধি দল রাজশাহী সফর করেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পরে ঢাকায় এসে সাংবাদিকদের কাছে নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে পাঁচ দলের নেতৃবৃন্দ বলেন, স্বাধীনতার ২১ বছর পরে আবারও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে শিবিরের ধ্বংসযজ্ঞ।

১৭ মার্চ ১৯৯২, রাবির ইতিহাসে রচিত হয় এক কালো অধ্যায়। মূলত সেদিনের তাণ্ডবের পর থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কাম্পাসে তাদের একক আধিপত্য বিস্তারের পথ উন্মোচিত হয়। পরে ১৯৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর শিবির সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র হামলায় ছাত্রদল নেতা বিশ্বজিৎ, সাধারণ ছাত্র নতুন এবং ছাত্র ইউনিয়নের তপন সহ ৫ জন ছাত্র নিহত হয়। একই বছর ১৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শেরেবাংলা হলে বহিরাগত সশস্ত্র শিবির ক্যাডাররা হামলা চালিয়ে ছাত্র মৈত্রী নেতা বিশ্ববিদ্যালয় টিমের মেধাবী ক্রিকেটার জুবায়ের চৌধুরী রিমুকে হাত-পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। এভাবেই ধীরে ধীরে রাবি ক্যাম্পাস সম্পূর্ণ শিবিরের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সর্বশেষ ২০১০ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ নেতা ফারুককে হত্যার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উৎখাত হয় তারা। সেই সাথে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে এবং তাদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ গ্রেফতার হলে কোন ঠাসা হয়ে পড়ে সন্ত্রাস নির্ভর সংগঠন ছাত্র শিবির। তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হওয়ার ধারাবাহিকতায় কয়েকজন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের সাজা হওয়ার প্রেক্ষিতে আবারও মরিয়া হয়ে উঠছে শিবির। গত কয়েক মাসে দেশব্যাপী তাদের তাণ্ডব সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নাই। বিশেষ করে সিটি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাঁরা বোমা ও গুলিবর্ষণ করে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে তারা।

যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, যে স্বপ্নের সফল বাস্তবায়নে প্রাণ দিয়েছেন শহীদ পিটু, সেই মৌলবাদী ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা কারীদের বিচার প্রক্রিয়া চলমান। অবশ্যই এই বাংলাদেশে একদিন ঐ সব দালালদের বিচার হবেই। বাংলার মাটিতে রাজাকার, আলবদরদের ঠাই নাই। বর্তমান সরকারের শেষ সময়ে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচার কাজ সম্পন্ন করা হোক।

(গুরুতর আহত আমীর আলী হলের জিএস জাসদ ছাত্রলীগ নেতা প্রিন্স ও লিটন)

    পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রত্যাশী সকলকে এই বিচার সম্পর্কে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। যে কোন মূল্যে এই বিচার প্রক্রিয়া বাঁধাগ্রস্ত করার বিশেষ মিশনে আজ মাঠে নেমেছে একাধিক মুখোশ ধারী সুবিধাবাদী দালাল। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারীদের রক্ষায় আজ এমনই বেহায়া ও নগ্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছে যে মুখোশের আর দরকার মনে করছেনা এক “বীর মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডারের স্ত্রী”। অবশ্য এই মুখোশ অনেক আগেই উন্মোচিত হয়েছে এদেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাছে। বিভিন্ন ভাবে দেশকে বিশৃঙ্খল করার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দেশের মুক্তিকামী সচেতন ছাত্র জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সকল ভেদাভেদ ভুলে, সকল অহমিকা ত্যাগ করে প্রগতিশীল শক্তির বৃহত্তর ও কার্যকর ঐক্যই পারে বাংলার মাটি থেকে ইয়াহিয়া, আইয়ুব, রাও ফরমান, নিয়াজীদের প্রেতাত্মাদের সমূলে উচ্ছেদ করতে।

    বাঙ্গালী বীরের জাতি। যুগে যুগে ক্ষুদিরাম, সূর্য সেন থেকে চট্টগ্রামের শাহাদাত, রাজশাহী মেডিকেলের শহীদ জামিল আক্তার রতন, সিলেটের শহীদ মুনীর, জুয়েল, তপন, নূতন, রাবির শহীদ পিটু, রিমু, ফারুক, রাজশাহীর মুকিমরা নিজেদের জীবন দিয়ে এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন। আজ জাতির প্রয়োজনে আসুন আরও একবার হাতে হাত রাখি, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করি, ১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৯০ এর চেতনায়। আবারও সংগঠিত হই ইস্পাত দৃঢ় মানসিকতায়, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের শুরু করা কাজ শেষ করার লক্ষে। অবশ্যই এই বাংলায় দালালদের বিচার হবে। “বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাটি, বুঝে নিক দুর্বৃত্ত, বুঝে নিক দালাল আলবদর, রাজাকাররা। বুঝে নিক দালালদের রক্ষায় ব্যস্ত রাজাকার, জামাত, শিবিরের পোষক প্রভুরা। বুঝে নিক ইতিহাসের আস্তাকুড় থেকে তুলে এনে কুখ্যাত রাজাকার শাহ্‌ আজিককে প্রধান মন্ত্রীর আসনে অধিষ্ঠিত করে যাওয়া সেই সব তথাকথিত 'পাকিস্তান পন্থী মুক্তিযোদ্ধার' বংসদবদেরা”।