Tuesday, August 5, 2025
জুলাই ঘোষণাপত্র
১। যেহেতু উপনিবেশ বিরোধী লড়াইয়ের সুদীর্ঘকালের ধারাবাহিকতায় এই ভূখণ্ডের মানুষ দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল এবং নির্বিচার গণহত্যার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করে জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল;
এবং
২। যেহেতু, বাংলাদেশের আপামর জনগণ দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই ভূখণ্ডে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বিবৃত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতে উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে;
এবং
৩। যেহেতু স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন পদ্ধতি, এর কাঠামোগত দুর্বলতা ও অপপ্রয়োগের ফলে স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধের জন আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল এবং গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন করেছিল;
এবং
৪। যেহেতু স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীনতার মূলমন্ত্র গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিপরীতে বাকশালের নামে সাংবিধানিকভাবে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করে এবং মতপ্রকাশ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ করে, যার প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশে সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লব সংঘটিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে একদলীয় বাকশাল পদ্ধতির পরিবর্তে বহুদলীয় গণতন্ত্র, মতপ্রকাশ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রবর্তনের পথ সুগম হয়,
এবং
৫। যেহেতু আশির দশকে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় বছর ছাত্র-জনতার অবিরাম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং ১৯৯১ ইং সনে পুনরায় সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।
এবং
৬। যেহেতু দেশি-বিদেশি চক্রান্তে সরকার পরিবর্তনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় ১ / ১১-এর ষড়যন্ত্রমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার একচ্ছত্র ক্ষমতা, আধিপত্য ও ফ্যাসিবাদের পথ সুগম করা হয়;
এবং
৭। যেহেতু গত দীর্ঘ ষোলো বছরের ফ্যাসিবাদী, অগণতান্ত্রিক এবং গণবিরোধী শাসনব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে এবং একদলীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অতি উগ্র বাসনা চরিতার্থ করার অভিপ্রায়ে সংবিধানের অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক পরিবর্তন করা হয় এবং যার ফলে একদলীয় একচ্ছত্র ক্ষমতা ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়;
এবং
৮। যেহেতু শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসন, গুম-খুন, আইন-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং একদলীয় স্বার্থে সংবিধান সংশোধন ও পরিবর্তন বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে ধ্বংস করে;
এবং
৯। যেহেতু, হাসিনা সরকারের আমলে তারই নেতৃত্বে একটি চরম গণবিরোধী, একনায়কতান্ত্রিক, ও মানবাধিকার হরণকারী শক্তি বাংলাদেশকে একটি ফ্যাসিবাদী, মাফিয়া এবং ব্যর্থ রাষ্ট্রের রূপ দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে;
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। আজ মঙ্গলবার (৫ আগস্ট, ২০২৫) রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। আজ মঙ্গলবার (৫ আগস্ট, ২০২৫) রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেছবি: দীপু মালাকার
এবং
১০। যেহেতু, তথাকথিত উন্নয়নের নামে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী নেতৃত্বে সীমাহীন দুর্নীতি, ব্যাংক লুট, অর্থ পাচার ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের মধ্য দিয়ে বিগত পতিত দুর্নীতিবাজ আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশ ও এর অমিত অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং এর পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য ও জলবায়ুকে বিপন্ন করে;
এবং
১১। যেহেতু শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দল, ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনসহ সমাজের সর্বস্তরের জনগণ গত প্রায় ষোলো বছর যাবৎ নিরন্তর গণতান্ত্রিক সংগ্রাম করে জেল-জুলুম, হামলা-মামলা, গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়;
এবং
১২। যেহেতু বাংলাদেশে বিদেশি রাষ্ট্রের অন্যায় প্রভুত্ব, শোষণ ও খবরদারিত্বের বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষের ন্যায়সংগত আন্দোলনকে বহিঃশক্তির তাঁবেদার আওয়ামী লীগ সরকার নিষ্ঠুর শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে দমন করে;
এবং
১৩। যেহেতু অবৈধভাবে ক্ষমতা অব্যাহত রাখতে আওয়ামী লীগ সরকার তিনটি প্রহসনের নির্বাচনে (২০১৪,২০১৮ ও ২০২৪ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন) এ দেশের মানুষকে ভোটাধিকার ও প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত করে;
এবং
১৪। যেহেতু, আওয়ামী লীগ আমলে ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, শিক্ষার্থী ও তরুণদের নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করা হয় এবং সরকারি চাকরিতে একচেটিয়া দলীয় নিয়োগ ও কোটাভিত্তিক বৈষম্যের কারণে ছাত্র, চাকরি প্রত্যাশী ও নাগরিকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম হয়;
এবং
১৫। যেহেতু বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের ওপর চরম নিপীড়নের ফলে দীর্ঘদিন ধরে জনরোষের সৃষ্টি হয় এবং জনগণ সকল বৈধ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই চালিয়ে যায়;
এবং
১৬। যেহেতু, সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থার বিলোপ ও দুর্নীতি প্রতিরোধে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ব্যাপক দমন-পীড়ন, বর্বর অত্যাচার ও মানবতাবিরোধী হত্যাকাণ্ড চালানো হয়, যার ফলে সারা দেশে দল-মত নির্বিশেষে ছাত্র-জনতার উত্তাল গণবিক্ষোভ গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়;
এবং
১৭। যেহেতু ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে অদম্য ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক দল, ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী, শ্রমিক সংগঠনসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষ যোগদান করে এবং আওয়ামী ফ্যাসিবাদী বাহিনী রাজপথে নারী-শিশুসহ প্রায় এক হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে, অগণিত মানুষ পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্ব বরণ করে এবং আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে সামরিক বাহিনীর সদস্যগণ জনগণের গণতান্ত্রিক লড়াইকে সমর্থন প্রদান করে;
এবং
১৮। যেহেতু, অবৈধ শেখ হাসিনা সরকারের পতন, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের লক্ষ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে জনগণ অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে, পরবর্তী সময়ে ৫ আগস্ট ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ পরিচালনা করে এবং ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনরত সকল রাজনৈতিক দল, ছাত্র-জনতা তথা সর্বস্তরের সকল শ্রেণি, পেশার আপামর জনসাধারণের তীব্র আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে গণভবনমুখী জনতার উত্তাল যাত্রার মুখে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়;
এবং
১৯। যেহেতু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলায় গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ব্যক্ত জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রত্যয় ও প্রয়োগ রাজনৈতিক ও আইনি উভয় দিক থেকে যুক্তিসংগত, বৈধ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত;
এবং
২০। যেহেতু জনগণের দাবি অনুযায়ী এরপর অবৈধ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের মতামতের আলোকে সাংবিধানিকভাবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়;
এবং
২১। যেহেতু, বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণের ফ্যাসিবাদবিরোধী তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদ, বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের অভিপ্রায় প্রকাশিত হয়;
এবং
২২। সেহেতু, বাংলাদেশের জনগণ সুশাসন ও সুষ্ঠু নির্বাচন, ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ, আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বিদ্যমান সংবিধান ও সকল রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক সংস্কার সাধনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে;
এবং
২৩। সেহেতু, বাংলাদেশের জনগণ বিগত ষোলো বছরের দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম কালে এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালীন সময়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক সংঘটিত গুম-খুন, হত্যা, গণহত্যা, মানবতা বিরোধী অপরাধ ও সকল ধরনের নির্যাতন, নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি লুণ্ঠনের অপরাধসমূহের দ্রুত উপযুক্ত বিচারের দৃঢ় অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে;
এবং
২৪। সেহেতু, বাংলাদেশের জনগণ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সকল শহীদদের জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণা করে শহীদদের পরিবার, আহত যোদ্ধা এবং আন্দোলনকারী ছাত্রজনতাকে প্রয়োজনীয় সকল আইনি সুরক্ষা দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে।
এবং
২৫। সেহেতু, বাংলাদেশের জনগণ যুক্তিসংগত সময়ে আয়োজিতব্য অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদে প্রতিশ্রুত প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশের মানুষের প্রত্যাশা, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আইনের শাসন ও মানবাধিকার, দুর্নীতি, শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে।এবং
২৬। সেহেতু বাংলাদেশের জনগণ এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছে যে একটি পরিবেশ ও জলবায়ু সহিষ্ণু অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন কৌশলের মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার সংরক্ষিত হবে।
এবং
২৭। বাংলাদেশের জনগণ এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে যে, ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪-এর উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হবে এবং পরবর্তী নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের সংস্কারকৃত সংবিধানের তফসিলে এ ঘোষণাপত্র সন্নিবেশিত থাকবে।
এবং
২৮। ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে বিজয়ী বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে এই ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হলো।
Friday, September 24, 2021
বিশ্বখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট শহীদ অধ্যাপক ডাঃ ফজলে রাব্বি।
লেখক : Dr. Zafrullah Chowdhury স্যার এর ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া
এই ফজলে রাব্বি তিনি, সমগ্র পাকিস্তানকে সাত বার আটি দরে বিক্রি করলেও তাঁর মস্তিষ্কের দাম উঠবে না৷ সেই ফজলে রাব্বি তিনি যিনি হতে পারতেন বাংলাদেশের প্রথম নোবেলজয়ী চিকিৎসা বিজ্ঞানী।তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিকেলের এমবিবিএস চূড়ান্ত পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অধিকারী ছাত্র। মাত্র ৩২ বছর বয়সে ১৯৬৪ সালে মেডিসিনের উপর তাঁর বিখ্যাত কেস স্টাডি 'A case of congenital hyperbilirubinaemia ( DUBIN-JOHNSON SYNDROME) in Pakistan' প্রকাশিত হয়েছিলে বিশ্বখ্যাত গবেষণা জার্নাল 'জার্নাল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন হাইজিন' এ।
মাত্র ৩৮ বছর বয়সে ১৯৭০ সালে তাঁর বিশ্বখ্যাত গবেষণা Spirometry in tropical pulmonary eosinophilia প্রকাশিত হয়েছিলো ব্রিটিশ জার্নাল অফ দা ডিসিস অফ চেস্ট ও ল্যান্সেট এ।
১৯৭০ সালে মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই ডাঃ ফজলে রাব্বি মনোনীত হয়েছিলেন পাকিস্তানের সেরা অধ্যাপক পুরস্কারের জন্য। কিন্তু তাঁর আত্মায় ছিলো বাংলার অসহায়র্ত মানুষ। ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছিলেন তিনি সেই পুরুষ্কার।
মাত্র ৩৯ বছর বয়সী ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রফেসর অব ক্লিনিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড কার্ডিওলজিস্ট। আজকের দিনে কল্পনা করা যায়?
মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় তিনি আহত মানুষদের সেবা দিয়েছেন মেডিকেলে বসে। বেশ কয়েকদফা নিজের সাধ্যের চেয়ে বেশী ঔষধ আর অর্থ সহায়তা দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় গোপন রেখে দিয়েছিলেন চিকিৎসাও।
মুক্তিযুদ্ধের ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর ডাঃ ফজলে রাব্বির স্ত্রী জাহানারা রাব্বী একই স্বপ্ন দুবার দেখলেন। স্বপ্নটা এমন একটা সাদা সুতির চাদর গায়ে তিনি তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে জিয়ারত করছেন এমন একটা জায়গায়, যেখানে চারটা কালো থামের মাঝখানে সাদা চাদরে ঘেরা কী যেন।
১৫ই ডিসেম্বর সকালে জাহানারা রাব্বী এ স্বপ্নের কথা বললেন ফজলে রাব্বিকে। রাব্বি বললেন, ‘তুমি বোধ হয় আমার কবর দেখেছ’। ভয় পেলেন জাহানারা রাব্বি। টেলিফোন টেনে পরিচিত অধ্যাপকদের বাড়িতে ফোন করতে বললেন।
ফজলে রাব্বি ফোন করলেন, কিন্তু কাউকেও লাইনে পাওয়া যাচ্ছেনা।
আকাশে তখন ভারতীয় যুদ্ধবিমান। রকেট, শেলের শব্দে কান ঝালাপালা। সকাল ১০টায় ২ ঘন্টার জন্য কারফিউ উঠলো। ফজলে রাব্বি স্ত্রীকে বললেন, 'একজন অবাঙালি রোগী দেখতে যাবো পুরান ঢাকায়।' যেতে মানা করলেন জাহানারা রাব্বি।
ফজলে রাব্বি কথার এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন ‘ভুলে যেয়ো না, ওরাও মানুষ।’
সেদিন তিনি ফিরেছিলেন কারফিউ শুরু হওয়ার আগেই।
দুপুরের খাবার ছিলো আগের দিনের বাসি তরকারি। কিন্তু ফজলে রাব্বি উল্টো বলেছিলেন, ‘আজকের দিনে এত ভালো খাবার খেলাম।’
জাহানারা রাব্বি দেখলেন এখানে থাকা বিপজ্জনক। তিনি বললেন, চলো চলে যাই। ফজলে রাব্বি বলেছিলেন 'আচ্ছা, দুপুরটা একটু গড়িয়ে নিই।’
কিছুক্ষণ পর বাবুর্চি এসে বললো ‘সাহেব, বাড়ি ঘিরে ফেলেছে ওরা।’
বাইরে তখন কাদালেপা মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে। মাইক্রোবাসের সামনে রাজাকার, আলবদর আর হানাদারেরা।
খুব হালকা স্বরে ফজলে রাব্বি জাহানারা রাব্বিকে বলেছিলেন, ‘আমাকে নিতে এসেছে।’ এরপর
দারোয়ানকে গেট খুলে দিতে বলেছিলেন তিনি। যখন মাইক্রোবাসে তিনি উঠলেন তখন সময় ঘড়িতে বিকেল চারটা।
১৮ই ডিসেম্বর ডাঃ ফজলে রাব্বির লাশটি পাওয়া গিয়েছিলো রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। দুই চোখ উপড়ানো। সমগ্র শরীরে জুড়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আঘাতের চিহ্ন। দু হাত পিছনে গামছা দিয়ে বাঁধা। লুঙ্গিটা উরুর উপরে আটকানো। তাঁর হৃদপিন্ড আর কলিজাটা ছিঁড়ে ফেলেছে হানাদার ও নিকৃষ্ট আলবদরেরা।
এই সেই ডাঃ ফজলে রাব্বি, যাঁর গোটা হৃদয় জুড়ে ছিলো বাংলাদেশ আর অসহায়র্ত মানুষ। যার হৃদয় জুড়ে ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন। হানাদার ও আল বদরের ঘৃণ্য নরপিশাচেরা সেই হৃদয়কে ছিঁড়ে ফেললেই কি সমগ্র বাংলার মানুষের হৃদয় থেকে কি তাঁকে বিছিন্ন করা যায়। যায়না। হাজার বছর পরেও ডাঃ ফজলে রাব্বি থাকবেন আমাদের প্রাণে, হৃদয়ের গহীনে।
আজ কিংবদন্তি চিকিৎসক ও বুদ্ধিজীবি শহীদ অধ্যাপক ডাঃ ফজলে রাব্বির জন্মদিন। জন্মদিনে নতচিত্তে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই কিংবদন্তি চিকিৎসককে। আমাদের ফজলে রাব্বিকে আল্লাহ যেন বেহেশত নসীব করেন - আমীন
Thursday, February 18, 2021
দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবি
জানুয়ারি ৬৯ এ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করে। এই ধর্মঘটে পুলিশ বাধা দেয় এবং ছাত্রদের ওপর চরম নির্যাতন চালায়। এর প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে আসে। ছাত্রদের রাজপথের এই মিছিলে গুলি চলে। পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান ( শহীদ আসাদ ) আহত হন এবং হাসপাতালে নেয়ার পথেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে সমগ্র দেশে সূচিত হয় দুর্বার আন্দোলন, স্বাধীনতার আন্দোলন ।
এর মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলার মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি অবস্থায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গুলি করে হত্যা করে।
সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার প্রতিবাদে সারা দেশের মত রাজশাহীর মানুষও ক্ষোভে ফেটে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য স্থানীয় প্রশাসন রাজশাহী শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী সেদিন ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে পড়ে। এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে শুরু হয় সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষে বেশ কিছু ছাত্র আহত হন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে খবরটি প্রচারিত হলে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জোহা স্যার খবরটি পাওয়ামাত্র এস এম হলের প্রভোস্ট ড. মাযহারুল ইসলাম স্যারকে সঙ্গে নিয়ে গাড়িতে করে তাত্ক্ষণিক ঘটনাস্থলে চলে আসেন। আহত ছাত্রদের ভ্যানে তুলে চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেদিন আহত ছাত্রদের রক্তে তার জামা ভিজে গিয়েছিল। তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে তিনি বলেছিলেন,
"কাল আবার এসে তোমাদের দেখে যাব"।
ঐদিন সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে চলছিল একুশের অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তিনি তাঁর শার্টে ছাত্রদের রক্তের দাগ দেখিয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেন,
"আহত ছাত্রদের রক্তের স্পর্শে আজ আমি গৌরবান্বিত। এরপর থেকে শুধু ছাত্রদের রক্ত নয় প্রয়োজনবোধে আমাদেরও রক্ত দিতে হবে। এরপর আর যদি কোনো গুলি করা হয়, কোনো ছাত্রের গায়ে লাগার আগে যেন সেই গুলি আমার বুকে এসে লাগে।"
১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯। আনুমানিক বেলা তখন সাড়ে ৯টা, ছাত্রদের সঙ্গে পাকিস্তানি সৈন্যদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিয়ে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তাঁর প্রিয় ছাত্রদের রক্ষায় জোহা স্যার আবার ছুটে এলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে, নাটোর রোডের ওপারে যেখানে প্রতিবাদী ছাত্রদের গুলি করার জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জোয়ানরা রাইফেল তাক করে ছিল।
ড. শামসুজ্জোহা ( জোহা স্যার ) তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। তিনি কর্মরত সামরিক কর্মকর্তাকে বলেন,
"প্লিজ ডোন্ট ফায়ার। আমার ছেলেরা এখনই ক্যাম্পাসের মধ্যে ফিরে যাবে।"
ছাত্ররা তখন তাঁদের প্রিয় স্যারের আদেশে ক্যাম্পাসে ফিরে যাচ্ছে, এমন সময় হঠাত্ গুলি। কেঁপে উঠল সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়। পিছনে ফিরে তাকাতেই সবাই দেখল তাদের স্যার মাটিতে পড়ে চিৎকার করছেন -
"বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাকে গুলি করেছে।"
যে স্যার মাত্র গতকাল তার ছাত্রদের কথা দিয়েছিলেন, তিনি তার আহত ছাত্রদের আজ হাসপাতালে দেখতে যাবেন, তিনি তার সেই কথা রাখতে পারেন নি। তবে দ্বিতীয় গুলিটা যেন তার প্রিয় ছাত্রের গায়ে না লেগে তার গায়ে লাগে, সেই কথাটা কিন্তু তিনি ঠিকই রাখতে পেরেছিলেন। দেশের জন্য জীবন দিয়ে তিনি স্বাধীতার অনির্বাণ শিখায় রক্তাক্ত পলাশের নৈবেদ্য দিয়ে গেলেন।
এই দেশ, লাল সবুজের এই পতাকা, এই স্বাধীনতা - এ দেশের ছাত্র শিক্ষক কৃষাণ মজুর শ্রমিক সর্বস্তরের জনগণের ঘামে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। আমরা সশ্রদ্ধ সালাম জানাই সেই সব মহান শহীদদের। বঞ্চনা, অশিক্ষা, অপসংস্কৃতি, অবিচার ও গনতন্ত্রহীনতায় এই স্বাধীনতা যেন কোনোভাবে কলুষিত বা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা দেখা এবং রক্ষার দায়িত্বও দেশের আপামর জনগণ এবং বর্তমান প্রজন্মেরই।
শহীদ শামসুজ্জোহা হলের একজন প্রাক্তন আবাসিক ছাত্র হিসাবে আজকের এই স্মরণীয় ঐতিহাসিক দিনে নিজেকে গৌরান্বিত বোধ করছি। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা আমাদের প্রিয় জোহা স্যারকে আপনি বেহেস্তের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করুন।
লেখক : জিয়াউর রহমান খান লিটন , সাবেক যুগ্ম সচিব, শিল্প মন্ত্রণালয়
Sunday, November 8, 2020
শহীদ মুফতী ও এক গুচ্ছ রুমাল
![]() |
| বামদিকের পারিবারিক ছবিতে পেছনের সারির মাঝখানের জন মুফতি মোহাম্মদ কাসেদ। ডান দিকে বন্ধুদের সংগ্রহে থাকা শহীদ মুফতির ছবি। |
মুফতীর ছোট বোন সুলতানা অনেকগুলো রুমাল খুব যত্নে ভাঁজ করে সুটকেসে রাখছিল। ময়মনসিংহ জেলা স্কুল ছেড়ে মুফতী চলে যাচ্ছে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে। তালিকা ধরে সুটকেস গোছানো হচ্ছে। ব্যবহার্য প্রতিটি জিনিসের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা আছে।
রুমালের সংখ্যাই বেশি। আমি এসেছি নৌমহলে, মুফতীর বাসায়। আগামীকাল সে চলে যাবে। তারপর কেটে গেছে ষাট বছরের কাছাকাছি। বহুদিন ধরে ভেবেছি মুফতীকে নিয়ে লিখবো। আমার জেলা স্কুলের সহপাঠী বর্তমানে নিউ জার্সির বাসিন্দা আমিনুর রশিদ পিন্টু দিনকয় আগে ফেইসবুকে মুফতীর ছোটবেলার একটা ছবি পাঠিয়েছে। যে লেখা হয়ে উঠছিল না, ছবিখানা দেখে মুফতীকে নিয়ে সে লেখা লিখতে বসেছি। কেন জানি না ভাইয়ের জন্য ছোট বোন রুমাল গুছিয়ে সুটকেসে রাখছে – এই দৃশ্যটি প্রথমে মনে এল।
১৯৬১ সাল। আমার স্টেশন মাস্টার বাবা জামালপুরের কাছে বাউশি স্টেশন থেকে বদলি হয়ে ময়মনসিংহ রোড স্টেশনে এসেছেন। এর আগে বিভিন্ন স্টেশনে গ্রামের স্কুলে পড়েছি। এবারে আমাকে ভর্তি করা হয়েছে ময়মনসিংহ শহরের নামকরা জেলা স্কুলে। ক্লাস সিক্সে। বছরের মাঝখানে ভর্তি হয়েছি। লাল ইটের বিশাল ভবনে সারি সারি ক্লাস। হেড স্যারের অফিস থেকে একজন দপ্তরি দেখতে ছোটখাট নতুন এক ছাত্রকে সিক্স বি ক্লাসে নিয়ে এলো। স্যার এবং সারা ক্লাসের দৃষ্টি এই নবাগতের দিকে। উচ্চতায় খাট বলেই হয়তো স্যার আমাকে একেবারে প্রথম সারিতে বসতে বললেন। সেই প্রথম দিনেই পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়ে গেল মুফতীর সাথে। বেঞ্চে তার পাশেই আমি বসেছিলাম।
অল্প কয়দিনেই জমিয়ে বন্ধুত্ব। আমি চুপচাপ প্রকৃতির। মুফতী সপ্রতিভ। ক্লাসের বাইরের বই প্রচুর পড়ে। “গোয়েন্দা গল্প বা অ্যাডভেঞ্চার– এসব পড়?” মুফতীর প্রশ্নের উত্তরে জানাই, আমাদের বাসায় মোহন সিরিজের বই আছে। শুনেতো মুফতী উত্তেজিত। “আজই স্কুল শেষে তোমার সাথে বাসায় গিয়ে বই নিয়ে আসবো।”
বললাম, আমার বাসাতো তিন মাইল দূরে, হেঁটে যেতে হবে। কোনও পরোয়া নেই মুফতীর। রেললাইন ধরে হেঁটে আমি স্কুলে আসা-যাওয়া করি। আমার প্রতিদিন ছয় মাইল হাঁটার সংবাদ মুফতী জানে। সেদিনই মুফতী চলল আমার সাথে। শীতের বিকেলে বাসায় পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যা। মোহন সিরিজের একটি বই নিয়ে মুফতী ফিরে গেল একা নৌমহলে তাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
ময়মনসিংহ শহরের পূর্ব পাশ ঘেঁষে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। শনিবার স্কুল আগে ছুটি হয়। মুফতী ও আমি চলে যাই ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। নদীর পানি টলটলে স্বচ্ছ। শরতে কাশফুলে ঢাকা চর। নদী পাড়ের বেঞ্চে বসে থাকি আমরা। শুভ্র কাশের রূপ দেখি। মুফতী বললো, “ওপারে শম্ভুগঞ্জে আমার এক আত্মীয়ের বাড়ি আছে। শীতে নদীর পানি এত কমে যায়, হেঁটেই পার হওয়া যায়। আমরা একবার সে বাড়িতে যাব।”
তারপর শীত এলো। এক বিকেলে স্কুল শেষে আমরা দু’জন নদী পার হলাম। আমরা তখন হাফপ্যান্ট পরতাম। শহরের ছেলেরা জুতো পড়লেও আমি খালি পায়েই স্কুলে আসতাম। অন্যরা তা তেমন নজরও করতো না। তো হাফপ্যান্ট ও খালি পা থাকায় নদী পার হতে কোনও ঝামেলা হলো না। ছোট একটু জায়গা সাঁতরাতে হলো। মুফতীর আক্ষেপ কেন আজ জুতো পরে এলো! হাতে নিতে হলো জুতো। শম্ভুগঞ্জ থেকে শহরে ফিরতে সন্ধ্যা পার। তারপর আরো তিন মাইল হেঁটে ময়মনসিংহ রোড স্টেশনের বাসায় পৌঁছাতে বেশ রাত। সবাই চিন্তায় পড়েছিলেন। সব বৃত্তান্ত শুনে কোনও বকাঝকা করলেন না আম্মা-আব্বা। ওই বয়সে বড় একটা অ্যাডভেঞ্চার করেছি, এমনটা ভেবে তারা হয়তো ভেতরে ভেতরে খুশিই হয়েছিলেন।
জেলা স্কুলের মাঠে অ্যাসেম্বলি হত। কিছুটা শরীর চর্চাও। তারপর মার্চ করে আমরা ক্লাসে যেতাম। গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানাবার থাকলে আমাদের হেডমাস্টার ফসিহ স্যার অ্যাসেম্বলিতে তা জানাতেন। একদিন বজ্রপাতের মত তেমন একটা ঘোষনা আমরা শুনলাম স্যারের কণ্ঠে। আমাদের ক্লাসের কয়েকজন ছাত্রকে টিসি দেওয়া হবে। নাম ডেকে অ্যাসেম্বলির সামনে জনা ছয়েককে দাঁড়াতে বলা হলো।
স্যার বললেন, “এরা সবাই ভাল ছাত্র, কিন্তু গুরুতর শৃঙ্খলা ভঙ্গের সাথে এরা যুক্ত।” স্যার আরো জানালেন, দুটো গোপন প্রতিদ্বন্দ্বী দল এরা গঠন করেছে। ‘বজ্রমুষ্টি’ ও ‘ব্ল্যাক টাইগার’।
বহু বছর আগে ময়মনসিংহ শহরের এক প্রান্তে নন্দীবাড়ি ছিল সমৃদ্ধ জনপদ। সেসব গত হয়েছে বহু আগে। এখন নন্দী পরিবারের বিশাল অট্টালিকা, বাগান সবই ঘন জঙ্গলে ঢাকা। ওই পোড়োবাড়িতে দিনের বেলায় যেতেও মানুষ ভয় পায়। নন্দীবাড়ির জঙ্গলে ‘বজ্রমুষ্টি’ গোপনে আস্তানা গেড়েছে। ‘ব্ল্যাক টাইগার’ আরেক জায়গায়। পরষ্পরকে হুমকি দিয়ে পাঠানো এদের গোপন চিঠি স্কুল কর্তৃপক্ষের হাতে এসেছে। অভিভাবকদের এ বিষয়ে জানানো হয়েছে। গভীর বিস্ময়ে জানলাম- আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুফতী ‘বজ্রমুষ্টি’ দলের নেতা। চকিতে মনে পড়লো স্কুলে ভর্তির পরপরই মুফতীর অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীর প্রতি গভীর নেশার কথা। আসা-যাওয়া মিলিয়ে ছয় মাইল পথ হেঁটে আমার বাসা থেকে মোহন সিরিজের বই সংগ্রহের কথা। শেষ পর্যন্ত অভিভাবকদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে এই খুদে রবিনহুডদের আর টিসি দেয়নি স্কুল কর্তৃপক্ষ।
মুফতীর পক্ষ থেকে অবশ্য কোনও মুচলেকা এলো না। স্কুলে আসাও বন্ধ করলো সে। বাসায় গিয়ে জানলাম জেলা স্কুলে সে আর পড়বে না। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য সে বাসায় থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে পরীক্ষায় পাশ করে মুফতী চলে গেল ক্যাডেট কলেজে। ক্লাস সেভেনে। মনের গহীনে তার কি কোন স্বপ্ন ছিল? জেলা স্কুলে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে সে। এবারে ক্যাডেট কলেজের কঠিন শৃঙ্খলায় নিজেকে তৈরি করবে সামনে অনেক বড় কোনও অ্যাডভেঞ্চারে অংশ নেওয়ার জন্যে। সে মাহেন্দ্রক্ষণ এসেছিল ১৯৭১ সালে। সে সম্পর্কে বলবার আগে মুফতী ও তার পরিবার নিয়ে দুটো কথা বলবো। তার আগে শুধু জানাই যে ক্লাস সিক্সের রবিনহুডদের সবাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল।
আমার সে সময়কার আরেক সহপাঠী ইঞ্জিনিয়ার আমিনুল ইসলাম। তার স্মরণশক্তি প্রখর। ষাট বছর আগের ঘটনা, স্থান, বিভিন্ন জনের নাম তার পরিষ্কার মনে আছে। মুফতীর সাথেতো আমার বন্ধুত্ব বেশিদিনের নয়। কিন্তু আমিনুল ময়মনসিংহ শহরের বাসিন্দা হওয়াতে মুফতী ও তার পরিবারের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। তার শরণাপন্ন হই, মুফতী সম্পর্কে ওইসব কথা জানতে যা আমার জানা নেই।
মুফতীর বাবা মোহাম্মদ ওয়াহীদ ছিলেন ময়মনসিংহ পৌরসভার সচিব। নৌমহলে তার নিজের বাড়ি। ছয় পুত্র ও চার কন্যার মধ্যে প্রথম পুত্র ছোট বেলায় মারা যায়। তারপর কন্যা। আমরা ডাকতাম সাকী আপা বলে। তারপরেই মুফতি। আমিনুল বলছিল বাবা ওয়াহীদ সাহেবের কথা। স্বল্পবাক এই মানুষটি অবসরে গভীর মনোযোগে বই পড়তেন। বই পড়ার এই অভ্যাসটি পেয়েছিল মুফতি। তবে পাঠ্য বইয়ের বাইরের বই পড়ার নেশা ছিল তার। ওয়াহীদ সাহেব তাতে আপত্তি করতেন না। ছেলে-মেয়েরা কে কী পড়ছে তা নিয়ে মাথাও ঘামাতেন না। তবে তাদের ইংরেজি শেখাবার একটা চেষ্টা তার ছিল। ঘরে রাখা হতো ইংরেজি অবজারভার পত্রিকা। ছেলে-মেয়েরা পড়াশুনা করছে। বাবা বললেন, “মা শাহানা আজকের প্রধান খবরগুলো পড়ে শোনাওতো।” আরেকটি হবি ছিল ওয়াহীদ সাহেবের। ডায়েরি লিখতেন তিনি। নিয়মিত ডায়রি লেখার জন্য মনের একটা শৃঙ্খলা দরকার হয়। ভাবনারও প্রয়োজন পড়ে। মুফতী ছোটবেলা থেকেই বাবার এই বৈশিষ্ট্যগুলো পেয়েছিল। বেহালা বাজানো ও দাবা খেলার প্রতি ঝোঁক তার ছেলে বেলা থেকেই। দুটোর জন্যেই প্রয়োজন ছিল শৃঙ্খলা, চিন্তার গভীরতা ও নিষ্ঠা। আমিনুল বলছিল সেসবের কথা।
নৌমহলে মুফতিদের বাসার কাছেই সমীর চন্দ্র চন্দের বাসা। সবাই কটন-দা বলে ডাকে। সঙ্গীত নিয়েই তিনি ও তার গোটা পরিবার। বেহালা ও গিটার শেখান তিনি। মুফতী ও তার ছোট ভাই হাদীর বেহালায় হাতেখড়ি তার কাছেই। দাবা কোথায় শিখলো? আমিনুল বলতে পারেনি। বললো, “হয়তো নিজে নিজেই শিখছে।” তবে মজার কথাও একটা জানালো আমিনুল। ময়মনসিংহ শহরের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মির্জা আজাদ বখত ওপার বাংলা থেকে এসে এ শহরে বসতি করেছেন। তিনি দাবা খেলতেন মুফতীর সাথে। কখনো মুফতীকে হারাতে পারতেন না। তাতে তার কোন খেদ ছিল না। বলতেন, “বুঝলে মুফতি, কাঠ ঘষলেও ধার হয়, কিন্তু ইস্পাতের মত নয় কখনো। আমি কাঠ আর তুমি হচ্ছো ইস্পাত।”
মুফতীর বাবা ময়মনসিংহ শহরে ১৯৫৫ সালে একটি আধুনিক কাঠের আসবাবপত্র তৈরির কারখানা শুরু করেছিলেন। সেই কারখানায় মুফতী দাবা খেলার বিশাল সব গুটি তৈরি করেছিল। বাসার মেঝেতে দাবার ছক কেটে বড় বড় দাবার গুটি দিয়ে ভাই-বোন বন্ধু-বান্ধব মিলে দাবা খেলার আসর বসাতো মুফতি। নিজের চোখ বেঁধে মুফতী অনেকের বিরুদ্ধে একা খেলতো। কেউ জিততে পারতো না। ফোনে কথা হয় ময়মনসিংহের নজিব আশরাফ হোসেনের সাথে। মুফতীর চাচার ছেলে। মুফতীর প্রতি অন্তপ্রাণ নজিব বলছিল, “মুফতী ভাই নিজের চোখ বেঁধে এক সাথে ৭ জন দাবাড়ুকে হারিয়েছিলেন। এমন কৃতিত্ব সে সময়ে আর কারও ছিল না।”
মুফতীর সব কাজ একা একা। এমনি একদিন থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে একদম একা মুফতী চলে গিয়েছিল ঘাতক পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে বৃদ্ধ সামাদ দফতরিকে বাঁচাতে। ১৯৭১-এর ১৪ জুন তারিখে। সে বিষয়ে বলবো পরে।
কলেজ শেষ করে আমি ভর্তি হয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োক্যামেস্ট্রি বিভাগে। মুফতী ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে। মুফতী মোহাম্মদ কাসেদ। একের পর এক বিভিন্ন টুর্নামেন্টে বিজয়ী হয়ে চলেছে ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মুফতি। জেলা স্কুলে আমাদের আরেক সহপাঠী কামরুল। ক্লাসে তৃতীয়। নৌমহলে মুফতীর বাসার পাশেই তার বাসা। পরে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মেকানিক্যালে মুফতীর সাথে পড়েছে। বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কৃতি অধ্যাপক মো. কামরুল ইসলামের সাথে ফোনে কথা হয়। “মুফতী থাকতো কায়দে আজম হলের (বর্তমান তিতুমির হল) ২০৭ নম্বর (উত্তর) কক্ষে। দাবায় এত সময় দিত যে তৃতীয় বর্ষে তার ক্লাস উপস্থিতি কম থাকায় বিভাগীয় প্রধান মাদ্রাজি অধ্যাপক ভি জি দেসা তাকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে দেবেন না বলে জানিয়ে দিলেন। তৎকালীন পাকিস্তান শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্রের (বর্তমান বিটাক) পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন অধ্যাপক দেসার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার অনুরোধে অধ্যাপক দেসা মুফতীকে পরীক্ষায় বসতে দিতে রাজি হলেন। সংযোগটি হলো দাবা খেলা। মুফতীর সাথে বড় আনন্দে দাবা খেলেন মোশাররফ হোসেন। অনুমতি দিলেও মুফতীর উপর বিশাল অ্যাসাইনমেন্টের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিলেন অধ্যাপক দেসা।”
এত বছর পর কথাগুলো বলতে গিয়ে অধ্যাপক কামরুলের কণ্ঠে ঝরে পড়ছিল শুধুই ভালবাসা। “জানো, পড়াশুনা না করলে কি হবে, পরীক্ষার আগে আগে আমাদের কাছ থেকে নোট নিয়ে অল্প সময়ে সব রপ্ত করে নিত মুফতী। অ্যাসাইনমেন্টও ঠিক সময়ে জমা দিতে পেরেছে। আমরা একটু সাহায্য করেছি মাত্র। যথারীতি পরীক্ষায় ভাল করেছে মুফতী।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন। মুফতীকে বড় ভালবাসেন তিনি। সূত্রটা হচ্ছে দাবা খেলা।
মজার এক তথ্য জানালো বন্ধু আমিনুল। ছুটি শেষে মুফতী বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ফিরবে।। মাকে বললো, একটা বালিশ আর কম্বল লাগবে। মা তো অবাক। গত ছুটি শেষে নতুন বালিশ ও কম্বল তো সে নিয়ে গিয়েছিল। মুফতী কুণ্ঠার সাথে মাকে জানায় বালিশ-কম্বল নিয়ে দাবা খেলতে গিয়েছিল। সারা রাত ধরে খেলা। দূর সেই জায়গা থেকে ফেরার সময় বালিশ-কম্বল নিতে ভুলে গিয়েছে। মা তার এই আত্মভোলা ছেলেটিকে বড় বেশি ভালবাসেন। সবার বড় ছেলেটিকে হারিয়েছিলেন যখন তার বয়স চার। তারপর মুফতি। মা মুফতীকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “বালিশ-কম্বলের দরকার নেই বাবা, আমার ছেলে ফিরে আসলেই হলো।”
কত অজানা যায়গায় মুফতী চলে গেছে, কিন্তু প্রতিবারই ফিরে এসেছে। কিন্তু ৭১-এর ১৪ জুনে সেই যে গেল মায়ের ‘আদরের পুতলা’ মুফতী, আর তো ফিরে এলো না!
১৯৭১। আমাদের প্রজন্মের হিরন্ময় সময়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর অমর ভাষণের পর থেকে ২৫শে মার্চের কালোরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা শুরু পর্যন্ত সময়টি বাঙালির জীবনে দুনিয়া কাঁপানো ১৮ দিন। এ সময়েই বাঙালি জনগণ মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুদ্ধবিদ্যা শেখা ও সামরিক প্রস্তুতির কাজ শুরু করে দেয় এ সময়ে।
মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য পয়লা মার্চ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে আমরা গঠন করি ‘সূর্যসেন স্কোয়াড’। ২৭ মার্চ ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের পথে আমাদের কয়েক জনের যাত্রা শুরু হল। প্রধানত, হেঁটে মুক্তাগাছায় আমরা পৌঁছে যাই এপ্রিলের শুরুতে। ময়মনসিংহ শহর তখনো মুক্ত। পুলিশ লাইন এবং ইপিআর ক্যাম্পের বাঙালি সদস্য এবং ২য় বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানির সৈন্যরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে। জানতে পারলাম এদের সাথে যুক্ত হয়েছে ছাত্র স্বেচ্ছাসেবকেরা। প্রতিরোধ রচনা করছে টাঙ্গাইল-মধুপুর হয়ে ময়মনসিংহের পথে আগুয়ান হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে। মুক্তাগাছায় গড়ে উঠেছে একটি ঘাঁটি। আমরাও যুক্ত হয়ে গেলাম সেখানে।
ভাই মুফতীর কাছে বোন সুলতানার চিঠি
![]() |
| ভাই মুফতীর কাছে বোন সুলতানার চিঠি |
বহু বছর পর মুফতীর যুদ্ধদিনের কথা বিস্তারিত শুনি মুফতীর ছোট ভাই ও মুক্তিযুদ্ধের সাথী হাদী হাসানের কাছ থেকে। ক্যাডেট কলেজে মুফতীর সহপাঠী জেনারেল (অব) মোহাম্মদ সাঈদের সাথে ফোনে কথা হয়। বলছিলেন, ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনেই মুফতী বললো, “বার্তা পেয়ে গেছি। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে। ময়মনসিংহ চলে গেল মুফতী। অসহযোগের দিনগুলোতে যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করে দিল।”
২৭ মার্চ ফুলপূর-তারাকান্দা অঞ্চলের এমপি শামসুল হকের নেতৃত্বে তৎকালীন ইপিআর-এর আঞ্চলিক হেডকোয়ার্টার এবং পুলিশ লাইন থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে মুফতী ও তার সঙ্গীরা। মধুপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে বীরের মত লড়াই করে মুফতী ও তার দল। ১০ এপ্রিল ময়মনসিংহ শহরের পতনের পূর্ব পর্যন্ত মুফতী ও তার ভাই হাদী সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকে প্রতিরোধ সংগ্রামে। পাকিস্তানি গোলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। হয়তো আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হানাদার বাহিনী প্রবেশ করবে শহরে। আমার বড় সাঈদ ভাই এবং সাথী তাজুল ইসলাম বেবি ভাই ও আমি শহরের মিশন রোডের পাশে একটি চার্চ থেকে সংগ্রহ করেছি একটি ফোর্ড করটিনা গাড়ি। শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি জামালপুরের দিকে। সাথে কয়েকটি হাল্কা অস্ত্র ও পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট থেকে নেয়া একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন। হাদী বর্ণনা করছিলেন ঠিক একই সময়ে একটি ল্যান্ড রোভার জিপ ও একটি ট্রাকে করে মুফতীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধার দল শহর ছেড়ে গফরগাঁয়ে তাদের গ্রামের দিকে যাত্রা করেছে। কত কাছে থেকেও আমাদের দেখা হয়নি। আহা, সে সময় মুফতীর সাথে দেখা হলে হয়তো আমরা একসাথেই যুদ্ধ করতাম!
![]() |
| মুফতীর আঁকা কার্টুন। ছোটবোন সুলতানার সংগ্রহ থেকে নেওয়া |
মুফতী ও তার দল গ্রামের বাড়ি চলে যায় প্রতিরোধ সংগ্রামকে সংগঠিত করার জন্য। ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারে সে গ্রাম। সেখানে পাকিস্তানিদের পৌঁছানো সহজ ছিল না। এপ্রিল মাসের মধ্যেই হানাদার বাহিনী দখল করে নিয়েছিল জেলা শহরগুলো। মে মাস পার হয়ে জুন থেকে গ্রামের দিকে হানাদার বাহিনী এগুতে থাকে। তাদের পথ চিনিয়ে নেবার জন্যে রাজাকার, আলবদর ও অনুগত বাঙালি পুলিশ তখন তৎপর।
এখন বলবো ১৪ জুনের কথা। একদিন খবর আসে গফরগাঁওয়ের এমপি অধ্যাপক শামসুল হুদার শ্বশুর সামাদ দফতরি গফরগাঁও থানার পুলিশের একটি দল ধরে নিয়ে যাচ্ছে। মুফতী তড়িৎ সিদ্ধান্ত নেয় বৃদ্ধ সামাদ দফতরিকে উদ্ধার করতে হবে। সে মুহূর্তে তার সাথে কোন মুক্তিযোদ্ধা ছিল না। একমাত্র সম্বল তার থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে মুফতী একাই এগিয়ে গেল। কাউরাইদ স্টেশনের কাছে পাইথল গ্রামের এক ধানক্ষেতের সেচ দেয়ার ড্রেনের আড়ালে অবস্থান নিয়ে একটি ফাঁকা গুলি করলো মুফতী। অল্প দূরে পুলিশ বাহিনী। চিৎকার করে মুফতী বললো দফতরিকে ছেড়ে দিতে। তা না হলে তাদের উপর গুলি করবে মুক্তিযোদ্ধারা। ভয় পেয়ে সামাদ দফতরিকে ছেড়ে দিয়ে উর্ধ্বশ্বাসে পালায় পুলিশ। বৃদ্ধ সামাদ দপ্তরী জীবন ফিরে পেয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে এসেছেন। মুফতীর মিশন সফল। পলায়মান পুলিশের অবস্থান জানতে মাথা একটু উঁচু করেছিল মুফতী।
ঘাতক বাহিনীর একজন তাকে দেখে ফেলে। বুঝে ফেলে মাত্র একজন মুক্তিযোদ্ধা আছে এখানে। তার ছোড়া গুলি সরাসরি আঘাত করে মুফতীর মাথায়। লুটিয়ে পড়ে মুফতি। এবার ঘাতকেরা এগিয়ে আসে। মুফতীর উপর আরো গুলিবর্ষণ করে তারা চলে যায়। সেই জলমগ্ন ধানক্ষেতে পড়ে থাকে শহীদ মুফতী মোহাম্মদ কাসেদের নিথর দেহ। পরদিন ১৫ জুন তারিখে গ্রামবাসী পরম মমতায় শহীদ মুফতীকে দাফন করে পাইথল গ্রামের জয়ধর খালী পাড়ায়। ১৭ জুন ময়মনসিংহ শহর হেডকোয়ার্টার থেকে পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামে হানা দিয়ে কবর খুঁড়ে লাশ নিয়ে যায় ময়মনসিংহ শহরে। ময়না তদন্ত হয় সে লাশের। তারপর তার স্বজনদের খোঁজ শুরু করে। দালালরা জানিয়ে ছিল এর বাবা ময়মনসিংহ পৌরসভা অফিসের সচিব।
মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় বহু শোকগাঁথার একটি রচিত হয় পৌরসভা অফিসে। একটি লাশ নিয়ে এসেছে হানাদার বাহিনী। পাকিস্তানি এক মেজর মুফতীর বাবা ওয়াহীদ সাহেবকে নির্দেশ দেয় তার ছেলেকে শনাক্ত করতে। পিতার সামনে পুত্রের লাশ। কী করবেন পিতা? যদি স্বীকার করেন এই লাশ তার পুত্রের, তা হলে তিনি ও তার পরিবার শুধু নয়, মুফতীর সহযোদ্ধাদের সমূহ বিপদ। অস্বীকার করলে শুধু নিজের জীবন বিপণ্ণ হতে পারে। মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেন পিতা। লাশের দিকে ভাল করে তাকান। তারপর মেজরের চোখের দিকে নিস্পলক, নিষ্কম্প চোখে তাকিয়ে উত্তর দেন এ তার ছেলে নয়। কে জানে, কেন সেই মেজর আর কোন জিজ্ঞাসাবাদ করে না। পৌরসভার একটি কাজ হলো বেওয়ারিশ লাশের দাফনের ব্যবস্থা করা। সেই রাতে কয়েজন কর্মচারিকে নিয়ে ওয়াহীদ সাহেব তার আদরের ধন, দশ পুত্র-কন্যার মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী মুফতীর লাশ গোসল করিয়ে সাদা কাপড়ে মুড়ে কালীবাড়ির সরকারী কবরস্থানে সমাহিত করেন। তার পরনে ছোপ ছোপ রক্তে ভেজা হলুদ রঙের মোটা খদ্দরের হাফশার্টটি ধুয়ে তিনি রেখে দেন পরম যত্নে। এই শার্টতো তার বড় চেনা।
৭০-এর ডিসেম্বরে তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মুফতী এসেছে বাসায়। বাবা তাকে নিয়ে গেলেন শহরের অভিজাত গৌরহরি বস্ত্রালয়ে। আর মাত্র এক বছর পর ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বেরোবে পুত্র। একটা স্যুট বানিয়ে দেবেন তাকে। নানা রঙের থান দেখানো হচ্ছে মুফতীকে। মুফতী বললো ওই হলুদ রঙের মোটা খদ্দরের থানটি নামাতে। সে কাপড়ে একটি হাফ শার্ট বানাতে দিল মুফতি। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে এই শার্টে বড় বড় পকেট লাগিয়ে নিল মুফতী যাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেলের কয়েকটি ম্যাগাজিন রাখা যায়। ১৪ জুন পাইথল গ্রামে যখন শত্রু পক্ষের গুলি মুফতীকে বিদ্ধ করছে, তখন তার গায়ে ছিল এই হলুদ শার্ট। মা ছেলের লাশ দেখেননি, মৃত্যু অবধি মুফতীর এই হলুদ শার্টটি বার বার বুকে চেপে ধরেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুফতীর বন্ধুরা তার কবরে লিখেছেন ‘হে পথিক ক্ষণিক থামো, তারপরে নাও পথ! এ মাটির প্রেমে দিয়েছে যে প্রাণ – এখানেই থেমেছে তার জীবন রথ।’
এবারে কিছু কঠিন সত্যের মুখোমুখি আমাদের দাঁড়াতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকেই মুফতী মোহাম্মদ কাসেদের শহীদ হওয়া বিষয়ে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বহুজনেরা জানতেন। গফরগাঁও অঞ্চলের এমপি অধ্যাপক শামসুল হুদার শ্বশুর বৃদ্ধ সামাদ দফতরিকে শত্রু বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত করতে মুফতী একা এগিয়ে গিয়েছিলেন। মুক্ত করেছিলেন তাকে। কিন্তু নিজের জীবন উৎসর্গ করে। এমপি শামসুল হুদা তো তা জানতেন। বাংলাদেশ হওয়ার পর সামাদ দফতরির পুত্র গফরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। অন্তত জয়ধর খালী পাড়ায় মুফতীর প্রথম কবরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ করতে পারতেন। কিছুই করেননি তারা। ফুলপূর-তারাকান্দা অঞ্চলের মুফতীর আত্মীয় এমপি শামসুল হকের নেতৃত্বে মুফতী মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। মুফতীর শহীদ হওয়ার খবরতো তারও জানা। ময়মনসিংহ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড জানতো সে তথ্য। ময়মনসিংহের গৌরীপুর এলাকার বর্তমান আওয়ামী লীগ এমপি নাজিমুদ্দিন আহমেদ। সব জানেন মুফতীর শহীদ হওয়া সম্পর্কে। রাজাকার, আলবদর, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানদের নাম উঠেছে মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদের তালিকায়। মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদের তালিকায় মুফতীর নামটি যুক্ত করতে এদের বড়ই অনীহা।
ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্র ও স্বনামধন্য দাবা খেলোয়াড় হিসেবে মুফতীর পরিচয় তো অজানা ছিল না। তারপর ও কেন শহীদের তালিকায় এই বীরের নাম নেই। ছোট ভাই ও সহযোদ্ধা হাদীর ক্ষোভ ও আক্ষেপ সেখানে। বলছিলেন তিনি, “সারা পৃথিবীর মানুষ যারা মুক্তিযুদ্ধকালে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন, সরকার তাঁদের যথাযোগ্য সম্মান জানিয়েছে। সে জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু নিজ দেশে মুফতীর মত এমন একজন উৎসর্গিত মুক্তিযোদ্ধার নাম কেন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায়, শহীদের তালিকায় নেই? কেন তার সরকারী স্বীকৃতি থাকবে না।”
অধ্যাপক কামরুলের কাছে জানলাম বুয়েটে মুফতীর নাম শহীদের তালিকায় আছে। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ কর্তৃপক্ষ ভুলে যায়নি মুফতী কাসেদকে। কিন্তু সরকার, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কী করেছেন? প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এবং তিতুমীর হলে শহীদের তালিকায় মুফতীর নাম আছে। তারপরও বলবো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যাপকরা বিশেষ করে মুফতীর সহপাঠী যারা সেখানে অধ্যাপনা করেছেন, তাদের আরো কিছু কর্তব্য আছে। মুফতীর পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানলাম, মুফতীর ছবি, অ্যালবাম, ব্যবহার্য দ্রব্যাদি বুয়েটের একজন অধ্যাপককে তারা দিয়েছিলেন। তিনি চলে গেছেন আমেরিকায়। মুফতীর ব্যাপারে কোন উদ্যোগও নেননি। মহা মূল্যবান মুফতীর স্মৃতি যা কিছু নিয়েছিলেন তার কোন কিছু আর ফেরতও দেননি তিনি। মুফতীর নামে যে দাবা প্রতিযোগিতা হত, তাও নেই। ‘বুয়েট চেস ক্লাব’ আছে। শহীদ মুফতীর নামে যে এই ক্লাবটি হতে পারে এমন কোন বোধ এই স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কারও কি নেই?
এই লেখা যখন শেষ করে এনেছি, তখন গতরাতে হাতে এলো এক গুচ্ছ দুর্লভ চিঠির ফটো কপি। হাদী হাসান পাঠিয়েছেন। জানিয়েছেন মুফতীর ডায়রি ও আরো বহু চিঠি ছিল। সেগুলো উদ্ধার করা যায়নি। বেশিরভাগ নিয়েছেন গুণীজনেরা, ফেরত দেননি। বাকি সব উঁইপোকার পেটে গেছে। ফৌজদারহাট কলেজে পড়বার সময় মুফতী লিখেছে বাবা-মা-ভাই-বোনদের। মুফতীকে লেখা তাদের চিঠিও আছে। ক্লাস সিক্স থেকে শুরু করে ক্লাস টেন পর্যন্ত মুফতী সবচেয়ে বেশি লিখেছে বাবাকে। সব চিঠি ইংরেজিতে। বাবাও দীর্ঘ চিঠি লিখেছেন পুত্রকে। ইংরেজিতে। ছোট বেলা থেকে ছেলে-মেয়েদের ইংরেজি শিখিয়েছেন। তার ছাপ পাওয়া গেল ক্লাস সিক্সে পড়বার সময়ে মুফতীর ইংরেজিতে লেখা চিঠি দেখে।
শুরুতে ছোট বোন সুলতানার রুমাল গুছিয়ে দেওয়ার কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। ভাইকে লেখা তার চিঠিও আছে। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাকে লেখা মুফতীর একটি চিঠি, তারিখ বিহীন। মুফতীর আঁকা কার্টুন আছে। সবার ছোট ছেলে আমেরিকা প্রবাসী প্রকৌশলী পুত্র তোফাকে লেখা বাবার চিঠিটি ইংরেজিতে টাইপ করা। বয়স তখন তার ৮৫। তাই হয়তো হাতে লিখতে অপারগ হয়েছেন। গভীর অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন এক দার্শনিকের পত্র যেন পাঠ করলাম। পত্রের শেষ কটি লাইন, “So pray for me – for your mother & our forefathers who have preceded us to the Great unknown. It is immaterial in whichever part of this planet we live & die – because we must leave it – our stay here is very insignificant in the boundless canvas of eternity.”
আহা, এই বাবা শেষ পর্যন্ত দেখে যেতে পারেননি তার সবচাইতে যোগ্য পুত্র মুফতীর নামটি শহীদের তালিকায় উঠেছে!
শেষ করবো কয়েকটি প্রস্তাব করে:
১. মুক্তিযোদ্ধা তালিকা এবং মুক্তিযুদ্ধে মহান শহীদদের তালিকায় মুফতী মোহাম্মদ কাসেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হোক। সে লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম মোজাম্মেল হক এবং সচিব জনাব তপন কান্তি ঘোষের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
২. মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করে দখলদার বাহিনীর হাত থেকে বৃদ্ধ সামাদ দফতরিকে উদ্ধার এবং বিনিময়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করার যে মহত্তম দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তার জন্য মুফতী মোহাম্মদ কাসেদকে মরণোত্তর বীরত্বসূচক খেতাব দেওয়া হোক। আশা করি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।
৩. ময়মনসিংহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ কোনও স্থানে তার একটি আবক্ষ ভাস্কর্য স্থাপন করা হোক। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ পৌরসভা ও জেলা প্রশাসকের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
৪. বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কোন হল বা স্থাপনার নাম মুফতী মোহাম্মদ কাসেদের নামে করা হোক। খুব আশা করছি মাননীয় উপাচার্য এবং সিন্ডিকেট এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। শহীদ মুফতীর নামে হোক ‘বুয়েট চেস’ ক্লাবটি। দাবা টুর্নামেন্ট আবার চালু হোক তার নামে।
৫. ১৯৭১ সালের ১৪ জুন গফরগাঁও থানায় কর্মরত যে পুলিশ সদস্যরা মুফতীর হত্যাকাণ্ডে জড়িত তাদের খুঁজে বের করা হোক। কেউ জীবিত থাকলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচারের সম্মুখীন করা হোক। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মহামান্য বিচারকদের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
২৩ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিয়েছিল মুফতী। আমার বয়স এখন ৭১। দীর্ঘদিন বেঁচে আছি। মৃত্যুর আগে যদি উপরের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হয়, তবে নিজের জীবনকে ধন্য মনে করবো। ভাইয়ের জন্য পরম মমতায় যে ছোট বোন সুলতানা রুমাল গুছিয়ে দিয়েছিল, মুফতীর সহযোদ্ধা ছোটভাই হাদী যে তার সাথে বেহালা বাজাতো সে ও মুফতীর পরিবারের বাকি সদস্যরা তাতে হয়তো কিছুটা শান্তি পাবে।
(ড. মো. আনোয়ার হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও শহীদ মুফতী মোহাম্মদ কাসেদের স্কুল জীবনের বন্ধু।)
Monday, October 19, 2020
বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ বীরপ্রতীক
Friday, September 25, 2020
নিমতলা কোর্ট চত্বর মেহেরপুর
Thursday, September 24, 2020
নিয়ন আলোয় ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে বাংলার প্রথম নারী শহীদ
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পাহাড়বেষ্টিত ভূখণ্ড কর্ণফুলী নদীর উত্তাল স্রোত এসে যেখানে বঙ্গোপসাগরে মিশে গেছে সেই পটিয়ার ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আমাদের অগ্নিযুগের অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা। কন্যাসন্তান তার ওপরে গায়ের রঙ কালো। সে সময়ে এমনিতেই কন্যাসন্তানের জন্ম খুব স্বাভাবিকভাবে নিতে পারত না সব পরিবার। প্রীতিলতার বাবা জগদ্বন্ধু ওয়েদ্দেদার ছিলেন মিউনিসিপাল অফিসের হেড কেরানি।
৫ মে যখন প্রীতিলতার জন্ম হয় তার বাবা খুশি হতে পারেননি। তার ওপর প্রীতিলতার গায়ের রঙ ছিল কালো। মায়ের নাম ছিল প্রতিভা দেবী। পরিবারের ৬ ভাই বোনের মধ্যে প্রীতিলতা ছিল দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকে অন্তর্মুখী, লাজুক ও মুখ চোরা ছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি নম্রতা, বদান্যতা, রক্ষণশীলতা লালন করেছিলেন। প্রীতিলতার ডাকনাম ছিল রানী।
প্রীতিলতার পড়াশোনার হাতেখড়ি মা-বাবার কাছে। তার স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। জগদ্বন্ধু ওয়েদ্দেদার মেয়েকে ড. খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে সরাসরি তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করান। অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পান তিনি। ওই স্কুল থেকে ১৯১৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন প্রীতিলতা। তারপর ভর্তি হন ঢাকার ইডেন কলেজে। কলেজে পড়া অবস্থায় লীনা নাগের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। লীনা নাগ ওই সময়ে দীপালি সংঘের নেতৃত্বে ছিলেন। শিক্ষা জীবনে প্রীতিলতা সফলতা অর্জন করেন। ১৯৩০ সালে সবার মধ্যে পঞ্চম ও মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে আইএ পাস করেন। বিএ পাস করে তিনি চট্টগ্রামের নন্দন কানন অর্পনাচরন ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন। ইডেন কলেজে পড়ার সময় বিপ্লবী সংগঠন 'দীপালি সংঘ' ও বেথুন কলেজে থাকতে 'ছাত্রী সংঘের সক্রিয় কর্মী হলেও মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি স্কুলের শিক্ষকতায় যোগদানের পর।
প্রীতিলতা যখন চট্টগ্রামের ড. খাস্তগীর স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী তখন দেখলেন যে মাস্টারদা সূর্যসেন ও আম্বিকা চক্রবর্তীকে রেলওয়ের টাকা ডাকাতির অপরাধে মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছে।১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল বিপ্লবী নেতা মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে অস্ত্র লুট, রেললাইন উপড়ে ফেলা, টেলিগ্রাফ-টেলিফোন বিকল করে দেয়াসহ ব্যাপক আক্রমণ হয়। এ আক্রমন চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ নামে পরিচিতি পায়।এ আন্দোলন সারাদেশের ছাত্রসমাজকে উদ্দীপ্ত করে।
চাঁদপুরে হামলার ঘটনায় বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসির আদেশ হয়। এবং তিনি আলীপুর জেলে বন্দি হন। প্রীতিলতা রামকৃষ্ণের বোন পরিচয় দিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতেন। রামকৃষ্ণের প্রেরণায় প্রীতিলতা বিপ্লবী কাজে আরো বেশি সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৩১ সালে ৪ আগস্ট রামকৃষ্ণের ফাঁসি হওয়ার পর প্রীতিলতা আরো বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। ওই সময়ের আরেক বিপ্লবী কন্যা কল্পনা দত্তের সঙ্গে পরিচয় হয় প্রীতিলতার। বিপ্লবী কল্পনা দত্তের মাধ্যমে মাস্টারদার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন প্রীতিলতা।
বিশ শতকের শুরু থেকে তিরিশের দশক ছিল বৃটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের অগ্নিযুগ।অনুশীলন, স্বদেশী, খেলাফত, অসহযোগ, কমিউনিস্ট আন্দেোলন, সংগ্রাম, বিপ্লব, প্রবল আকার ধারণ করে।কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, প্রজা সমিতি প্রভৃতি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোও শক্তিশালী হওয়ায় সাধারণ মানুষ সচেতন হয়ে ওঠে। এ সময়ে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু ফাঁসিকাষ্ঠে আত্মদান করেন, প্রফুল্ল চাকীর আত্মহত্যাও নিকটবর্তী সময়ে, ঘটে খ্যাতনামা বিপ্লবী বিনয়, বাদল, দীনেশদের রাইটাস বিল্ডিং এ অলিন্দ যুদ্ধ ও আত্মাহুতি, ১৯৩০ সালে সূর্যসেনের নেতৃত্বে ঘটে ঐতিহাসিক চট্রগ্রামে অস্ত্রগার লুণ্ঠন ।
পূর্ণেন্দু দস্তিদার টেবিলের পাশে বসে রানীর ইতিহাসের বইটি উল্টাচ্ছিলেন। হঠাৎ বইয়ের পৃষ্ঠার মধ্য থেকে একটি ছবি পড়ে গেল। রানী ছবিটি উঠিয়ে দাদাকে দেখিয়ে বলে, "নিশ্চয়ই তুমি এই ছবিটি চেনো? 'ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাই'। এই বই অনেক আগেই পড়ে শেষ করেছি।সিদ্ধান্ত নিয়েছি ঝাঁসির রানী, রানী ভবানীর মতো আমি দেশের জন্য কাজ করবো, লড়বো। প্রয়োজনে এদের মতো জীবন উৎসর্গ করবো। তোমাদের সাথে যুক্ত হব।তাছাড়া তোমরা আমায় 'রানী' বলে ডাক।নাটোরের রানী আর ঝাঁসির রানী যা পেরেছিল, চাটগাঁর রানী নিশ্চয়ই তা পারবে, দাদা?
১৯৩২, ১৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কাট্টলী গ্রামে এক গোপন বৈঠকের উদ্দেশ্যে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত রওনা হন, কিন্তু পথে পাহাড়তলীতে কল্পনা দত্ত ধরা পড়েন। মাষ্টারদা সূর্য সেন পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের নেতৃত্ব প্রীতিলতাকে নিতে বলেন।
২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩২
ইউরোপিয়ান ক্লাব :
পরনে ছিল মালকোঁচা দেওয়া ধুতি আর পাঞ্জাবী, চুল ঢাকার জন্য মাথায় সাদা পাগড়ি এবং পায়ে রাবার সোলের জুতা।
সাথে ছিলেন - কালীকিংকর দে, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, শান্তি চক্রবর্তী (এদের পরনে ছিল- ধুতি আর শার্ট), মহেন্দ্র চৌধুরী, সুশীল দে এবং পান্না সেন (এদের পরনে ছিল- লুঙ্গি আর শার্ট)।রাত আনুমানিক ১০টা ৪৫ এর দিকে ক্লাব আক্রমণ শুরু হয়। সেদিন ছিল শনিবার, তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বিপ্লবীরা ক্লাব আক্রমণ শুরু করেন।প্রীতিলতা হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ শুরুর নির্দেশ দেবার পরেই ঘন ঘন গুলি আর বোমার আঘাতে পুরো ইউরোপিয়ান ক্লাব কেঁপে উঠেছিলো।কয়েক জন ইংরেজ অফিসারের কাছে রিভলবার থাকায় তারা পাল্টা আক্রমণ করে।প্রীতিলতার দেহের বাম পাশে গুলি লাগে।আক্রমণ শেষে পূর্ব সিদ্বান্ত অনুযায়ী প্রীতিলতা পটাসিয়াম সায়ানাইড খান।কারণ ধরা পড়লে বিপ্লবীদের অনেক গোপন তথ্য ব্রিটিশদের নৃসংশ অত্যাচারের ফলে ফাঁস হয়ে যেতে পারে। ক্লাবের পাশে পড়ে থাকা লাশটিকে পুলিশ প্রথমে পুরুষ ভেবে ভুল করে। কিন্তু মাথার পাগড়ি খুলে লম্বা চু্লের মেয়েটিকে দেখে শুধু পুলিশ নয়, গোটা ব্রিটিশ সরকার নড়েচড়ে ওঠে। আলোড়িত আর আন্দোলিত হয় গোটা ভারতবর্ষ আর বাঙালি, দেশভাগের আগের সেই ভারত বর্ষ স্বাধীনতা লাভের সোপানে আরেক পা অগ্রসর হয়, ২১ বছরের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের বাঙালি মেয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জীবন উৎসর্গ করে রচনা করে গেলেন ইতিহাস !
প্রমান করে দিলেন নারী আর পুরুষের
মধ্যে ব্যবধান শুধু প্রকৃতিগত,
সাহসিকতায় তারা এক কাতারে ।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এর আত্মাহুতি দিবসে
সশ্রদ্ধ সালাম.....
Friday, March 6, 2020
শহীদ ড. শামসুজ্জোহা দিবস।
Sunday, January 19, 2020
ভাষা সৈনিক নজির হোসেন আর নেই
Abdullah Al Amin Dhumketu
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
তেজগাঁও, ঢাকা।
যথাবিহীত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক বিনীত নিবেদন এই যে, আমার পিতা শহীদ ফয়েজ উদ্দীন বিশ্বাস একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও দেশপ্রেমিক নাগরিক ছিলেন। তিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। তাঁর বীরোচিত আত্মত্যাগে আমি গর্ব অনুভব করি। সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেও তিনি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন পোস্ট মাস্টারের কাজ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মেহেরপুর জেলার পিরোজপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি দিক-নির্দেশনা প্রদান, খাবার ও অর্থ যোগান করতেন। তার নেতৃত্বে ২০/ ২৫ জনের একটি দল মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে আমার পিতাকে পাকহানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে যায় এবং বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। আমি সেই সময় মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য ভারতের নদীয়া জেলার বেতাই ক্যাম্পে গিয়েছিলাম। বেতাই প্রশিক্ষণ-ক্যাম্পে অবস্থানকালে জানতে পাই যে, পাক-হানাদার বাহিনী আমার পিতাকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। পিতার অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে যাই, পিত্যা-হত্যার প্রতিশোধ নিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ অসমাপ্ত রেখে বাড়ি ফিরে আসি। বাড়ি ফিরে এসে প্রশিক্ষণ ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে শুরু করি। স্বাধীনতার পর আমার পিতার লাশ পাওয়া যায় মেহেরপুর সরকারি কলেজের পিছনের গণকবরে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা, তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমা প্রশাসক ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। এস এম সোবহান ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে দায়িত্ব পালনকালে আমার পিতার লাশের সনাক্ত করেছিলেন। মেহেরপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থে ৪৫ পৃষ্ঠায় শহীদের তালিকায় ১১৪ নং সিরিয়ালে আমার পিতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ১৭ আগস্ট, ১৯৯২ তারিখে মেহেরপুর থেকে প্রকাশিত ”প্রবাহ” নামক বুলেটিনে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের তালিকার ২১ নং সিরিয়ালে আমার পিতার নাম উল্লেখ আছে। আমি নিজে ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেছি, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেও কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাইনি। উল্লেখ্য যে, আমি ১৯৯০-২০০৪ খ্রি. পর্যন্ত ১৪ বছর পিরোজপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ২০০৪-২০১৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছর মেহেরপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে বিএনপি-জামায়াত কর্তৃক উপেক্ষিত ও নিগৃহীত হয়েছি। আমি এখন মারাত্মক অসুস্থ। দীর্ঘ প্রায় ০৭ বছর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী। দীর্ঘদিন রোগশয্যার কারণে পরিবার পরিজনেরাও ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলেছেন। পরিবারে তেমন কোন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি না থাকায় চিকিৎসার টাকা যোগাড় করতে পারছি না। এ কারণে নিজেকে খুবই অসহায় মনে হয়।
পিতা- শহীদ ফয়েজ উদ্দীন বিশ্বাস
গ্রাম ও পোস্ট: পিরোজপুর,
উপজেলা ও জেলা : মেহেরপুর।
মোবাইল: ০১৯১৭-২৪১৭৫৮
১। মেহেরপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের প্রত্যয়ন পত্রের ফটোকপি।
২। মেহেরপুর সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের প্রত্যয়নপত্রের ফটোকপি।
৩। পিরোজপুর ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের প্রত্যয়নপত্রের ফটোকপি।
৪। পিরোজপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রত্যয়নপত্রের ফটোকপি।
৫। মেহেরপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রত্যয়নপত্রের ফটোকপি।
৬। শহীদ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের নামফলকের ছবি।
৭। নাগরিকত্ব সনদ।
৮। জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি।
৯। ছবি।
১০। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ প্রদত্ত মেহেরপুর জেলার শহীদের নামের তালিকা সংযোজিত মেহেরপুর জেলার ইতিহাসের বইয়ের
ফটোকপি।
১১। প্রকাশিত প্রবাহ নামে বুলেটিনের ফটোকপি। "
Saturday, December 21, 2019
ছবিতে স্যার ফজলে হাসান আবেদ
![]() |
| ২০১১ সালে কাতারের আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানির কাছ থেকে ‘ওয়ার্ল্ড ইনোভেশন সামিট ফর এডুকেশন (ওয়াইজ)’ পুরস্কার গ্রহণকালে। |
![]() |
| পিতৃস্নেহ |
![]() |
| ব্র্যাক পরিচালিত একটি স্কুল পরিদর্শনকালে স্যার ফজলে হাসান আবেদ। |
![]() |
| ব্র্যাকের কৃষি কর্মসূচি পরিদর্শনে গিয়ে কর্মীদের সুবিধা-অসুবিধার কথা শুনছেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। |
![]() |
| ০০৫ সালে ব্র্যাকের কর্মসূচি পরিদর্শনকালে মাইক্রোসফট করপোরেশনের কর্ণধার বিল গেটস, তাঁর স্ত্রী মেলিন্ডা গেটস এবং গ্রাম সংগঠনের নারীদের সঙ্গে ফজলে হাসান আবেদ। |
![]() |
| ২০০২ সালে ব্র্যাকের মাঠ কার্যক্রম পরিদর্শনকালে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ও তাঁর স্ত্রী চেরি ব্লেয়ারের সঙ্গে ফজলে হাসান আবেদ। |
![]() |
| ২০০৯ সালে তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাইলামার সঙ্গে। |
![]() |
| ২০০১ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। |
![]() |
| ২০১০ সালে নাইটহুড উপাধি গ্রহণ। |
![]() |
| ব্র্যাকের গভর্নিং বডির মিটিংয়ে (বাম থেকে) শাবানা আজমী, ফারুক চৌধুরী, স্যার ফজলে হাসান আবেদ ও হুমায়ুন কবীর। |
![]() |
| ব্র্যাক সেন্টারে স্যার ফজলে হাসান আবেদ। |
![]() |
| সহকর্মীদের সঙ্গে কর্মপরিকল্পনায় ব্যস্ত |
![]() |
| ব্র্যাক স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে |
![]() |
| ব্র্যাক সেন্টারে স্যার ফজলে হাসান আবেদ। |
![]() |
| ১৯৭২ সালে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠাকালে সিলেটের মার্কুলিতে ফজলে হাসান আবেদ। |
![]() |
| ব্র্যাক প্রতিষ্ঠার চার বছর আগে ১৯৬৮ সালে তরুণ ফজলে হাসান আবেদ। |



































