.

Sunday, November 8, 2020

শহীদ মুফতী ও এক গুচ্ছ রুমাল

বামদিকের পারিবারিক ছবিতে পেছনের সারির মাঝখানের জন মুফতি মোহাম্মদ কাসেদ। ডান দিকে বন্ধুদের সংগ্রহে থাকা শহীদ মুফতির ছবি।

 মুফতীর ছোট বোন সুলতানা অনেকগুলো রুমাল খুব যত্নে ভাঁজ করে সুটকেসে রাখছিল। ময়মনসিংহ জেলা স্কুল ছেড়ে মুফতী চলে যাচ্ছে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে। তালিকা ধরে সুটকেস গোছানো হচ্ছে। ব্যবহার্য প্রতিটি জিনিসের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা আছে। 

রুমালের সংখ্যাই বেশি। আমি এসেছি নৌমহলে, মুফতীর বাসায়। আগামীকাল সে চলে যাবে। তারপর কেটে গেছে ষাট বছরের কাছাকাছি। বহুদিন ধরে ভেবেছি মুফতীকে নিয়ে লিখবো। আমার জেলা স্কুলের সহপাঠী বর্তমানে নিউ জার্সির বাসিন্দা আমিনুর রশিদ পিন্টু দিনকয় আগে ফেইসবুকে মুফতীর ছোটবেলার একটা ছবি পাঠিয়েছে। যে লেখা হয়ে উঠছিল না, ছবিখানা দেখে মুফতীকে নিয়ে সে লেখা লিখতে বসেছি। কেন জানি না ভাইয়ের জন্য ছোট বোন  রুমাল গুছিয়ে সুটকেসে রাখছে – এই দৃশ্যটি প্রথমে মনে এল।

১৯৬১ সাল। আমার স্টেশন মাস্টার বাবা জামালপুরের কাছে বাউশি স্টেশন থেকে বদলি হয়ে ময়মনসিংহ রোড স্টেশনে এসেছেন। এর আগে বিভিন্ন স্টেশনে গ্রামের স্কুলে পড়েছি। এবারে আমাকে ভর্তি করা হয়েছে ময়মনসিংহ শহরের নামকরা জেলা স্কুলে। ক্লাস সিক্সে। বছরের মাঝখানে ভর্তি হয়েছি। লাল ইটের বিশাল ভবনে সারি সারি ক্লাস। হেড স্যারের অফিস থেকে একজন দপ্তরি দেখতে ছোটখাট নতুন এক ছাত্রকে সিক্স বি ক্লাসে নিয়ে এলো। স্যার এবং সারা ক্লাসের দৃষ্টি এই নবাগতের দিকে। উচ্চতায় খাট বলেই হয়তো স্যার আমাকে একেবারে প্রথম সারিতে বসতে বললেন। সেই প্রথম দিনেই পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়ে গেল মুফতীর সাথে। বেঞ্চে তার পাশেই আমি বসেছিলাম।  

অল্প কয়দিনেই জমিয়ে বন্ধুত্ব। আমি চুপচাপ প্রকৃতির। মুফতী সপ্রতিভ। ক্লাসের বাইরের বই প্রচুর পড়ে। “গোয়েন্দা গল্প  বা অ্যাডভেঞ্চার– এসব পড়?” মুফতীর প্রশ্নের উত্তরে জানাই, আমাদের বাসায় মোহন সিরিজের বই আছে। শুনেতো মুফতী উত্তেজিত। “আজই স্কুল শেষে তোমার সাথে বাসায় গিয়ে বই নিয়ে আসবো।” 

বললাম, আমার বাসাতো তিন মাইল দূরে, হেঁটে যেতে হবে। কোনও পরোয়া নেই মুফতীর। রেললাইন ধরে হেঁটে আমি স্কুলে আসা-যাওয়া করি। আমার প্রতিদিন ছয় মাইল হাঁটার সংবাদ মুফতী জানে। সেদিনই মুফতী চলল আমার সাথে। শীতের বিকেলে বাসায় পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যা। মোহন সিরিজের একটি বই নিয়ে মুফতী ফিরে গেল একা নৌমহলে তাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।

ময়মনসিংহ শহরের পূর্ব পাশ ঘেঁষে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। শনিবার স্কুল আগে ছুটি হয়। মুফতী ও আমি চলে যাই ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। নদীর পানি টলটলে স্বচ্ছ। শরতে কাশফুলে ঢাকা চর।  নদী পাড়ের বেঞ্চে বসে থাকি আমরা। শুভ্র কাশের রূপ দেখি। মুফতী বললো, “ওপারে শম্ভুগঞ্জে আমার এক আত্মীয়ের বাড়ি আছে। শীতে নদীর পানি এত কমে যায়, হেঁটেই পার হওয়া যায়। আমরা একবার সে বাড়িতে যাব।”

তারপর শীত এলো। এক বিকেলে স্কুল শেষে আমরা দু’জন নদী পার হলাম। আমরা তখন হাফপ্যান্ট পরতাম। শহরের ছেলেরা জুতো পড়লেও আমি খালি পায়েই স্কুলে আসতাম। অন্যরা তা তেমন নজরও করতো না। তো হাফপ্যান্ট ও খালি পা থাকায় নদী পার হতে কোনও ঝামেলা হলো না। ছোট একটু জায়গা সাঁতরাতে হলো। মুফতীর   আক্ষেপ কেন আজ জুতো পরে এলো! হাতে নিতে হলো জুতো। শম্ভুগঞ্জ থেকে শহরে ফিরতে সন্ধ্যা পার। তারপর আরো তিন মাইল হেঁটে ময়মনসিংহ রোড স্টেশনের বাসায় পৌঁছাতে বেশ রাত। সবাই চিন্তায় পড়েছিলেন। সব বৃত্তান্ত শুনে কোনও বকাঝকা করলেন না আম্মা-আব্বা। ওই বয়সে বড় একটা অ্যাডভেঞ্চার করেছি, এমনটা ভেবে তারা হয়তো ভেতরে ভেতরে খুশিই হয়েছিলেন।

জেলা স্কুলের মাঠে অ্যাসেম্বলি হত। কিছুটা শরীর চর্চাও। তারপর মার্চ করে আমরা ক্লাসে যেতাম। গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানাবার থাকলে আমাদের হেডমাস্টার ফসিহ স্যার অ্যাসেম্বলিতে তা জানাতেন। একদিন বজ্রপাতের মত তেমন একটা ঘোষনা আমরা শুনলাম স্যারের কণ্ঠে। আমাদের ক্লাসের কয়েকজন ছাত্রকে টিসি দেওয়া হবে। নাম ডেকে অ্যাসেম্বলির সামনে জনা ছয়েককে দাঁড়াতে বলা হলো।  

স্যার বললেন, “এরা সবাই ভাল ছাত্র, কিন্তু গুরুতর শৃঙ্খলা ভঙ্গের সাথে এরা যুক্ত।” স্যার আরো জানালেন, দুটো গোপন প্রতিদ্বন্দ্বী দল এরা গঠন করেছে। ‘বজ্রমুষ্টি’ ও ‘ব্ল্যাক টাইগার’। 

বহু বছর আগে ময়মনসিংহ শহরের এক প্রান্তে  নন্দীবাড়ি ছিল সমৃদ্ধ জনপদ। সেসব গত হয়েছে বহু আগে। এখন নন্দী পরিবারের বিশাল অট্টালিকা, বাগান  সবই  ঘন জঙ্গলে ঢাকা। ওই পোড়োবাড়িতে দিনের বেলায় যেতেও মানুষ ভয় পায়।  নন্দীবাড়ির জঙ্গলে ‘বজ্রমুষ্টি’ গোপনে আস্তানা গেড়েছে। ‘ব্ল্যাক টাইগার’ আরেক জায়গায়।  পরষ্পরকে হুমকি দিয়ে পাঠানো এদের গোপন চিঠি স্কুল কর্তৃপক্ষের হাতে এসেছে। অভিভাবকদের এ বিষয়ে জানানো হয়েছে। গভীর বিস্ময়ে জানলাম- আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুফতী ‘বজ্রমুষ্টি’ দলের নেতা। চকিতে মনে পড়লো স্কুলে ভর্তির পরপরই মুফতীর অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীর প্রতি গভীর নেশার কথা। আসা-যাওয়া মিলিয়ে ছয় মাইল পথ হেঁটে আমার বাসা থেকে মোহন সিরিজের বই সংগ্রহের কথা। শেষ পর্যন্ত অভিভাবকদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে এই খুদে রবিনহুডদের আর টিসি দেয়নি স্কুল কর্তৃপক্ষ। 

মুফতীর পক্ষ থেকে অবশ্য কোনও মুচলেকা এলো না। স্কুলে আসাও বন্ধ করলো সে। বাসায় গিয়ে জানলাম জেলা স্কুলে সে আর পড়বে না। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য সে বাসায় থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে পরীক্ষায় পাশ করে মুফতী চলে গেল ক্যাডেট কলেজে। ক্লাস সেভেনে। মনের গহীনে তার কি কোন স্বপ্ন ছিল? জেলা স্কুলে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে সে। এবারে ক্যাডেট কলেজের কঠিন শৃঙ্খলায় নিজেকে তৈরি করবে সামনে অনেক বড় কোনও অ্যাডভেঞ্চারে অংশ নেওয়ার জন্যে। সে মাহেন্দ্রক্ষণ এসেছিল ১৯৭১ সালে। সে সম্পর্কে বলবার আগে মুফতী ও তার পরিবার নিয়ে দুটো কথা বলবো। তার আগে শুধু জানাই যে ক্লাস সিক্সের রবিনহুডদের সবাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল।

আমার সে সময়কার আরেক সহপাঠী ইঞ্জিনিয়ার আমিনুল ইসলাম। তার স্মরণশক্তি প্রখর। ষাট বছর আগের ঘটনা, স্থান, বিভিন্ন জনের নাম তার পরিষ্কার মনে আছে। মুফতীর সাথেতো আমার বন্ধুত্ব বেশিদিনের নয়। কিন্তু আমিনুল ময়মনসিংহ শহরের বাসিন্দা হওয়াতে মুফতী ও তার পরিবারের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। তার শরণাপন্ন হই, মুফতী সম্পর্কে ওইসব কথা জানতে যা আমার জানা নেই। 

মুফতীর বাবা মোহাম্মদ ওয়াহীদ ছিলেন ময়মনসিংহ পৌরসভার সচিব। নৌমহলে তার নিজের বাড়ি। ছয় পুত্র ও চার কন্যার মধ্যে প্রথম পুত্র ছোট বেলায় মারা যায়। তারপর কন্যা। আমরা ডাকতাম সাকী আপা বলে। তারপরেই মুফতি। আমিনুল বলছিল বাবা ওয়াহীদ সাহেবের কথা। স্বল্পবাক এই মানুষটি অবসরে গভীর মনোযোগে বই পড়তেন। বই পড়ার এই অভ্যাসটি পেয়েছিল মুফতি। তবে পাঠ্য বইয়ের বাইরের বই পড়ার নেশা ছিল তার। ওয়াহীদ সাহেব তাতে আপত্তি করতেন না। ছেলে-মেয়েরা কে কী পড়ছে তা নিয়ে মাথাও ঘামাতেন না। তবে তাদের ইংরেজি শেখাবার একটা চেষ্টা তার ছিল। ঘরে রাখা হতো ইংরেজি অবজারভার পত্রিকা। ছেলে-মেয়েরা পড়াশুনা করছে। বাবা বললেন, “মা শাহানা আজকের প্রধান খবরগুলো পড়ে শোনাওতো।” আরেকটি হবি ছিল ওয়াহীদ সাহেবের। ডায়েরি লিখতেন তিনি। নিয়মিত ডায়রি লেখার জন্য মনের একটা শৃঙ্খলা দরকার হয়। ভাবনারও প্রয়োজন পড়ে। মুফতী ছোটবেলা থেকেই বাবার এই বৈশিষ্ট্যগুলো পেয়েছিল। বেহালা বাজানো ও দাবা খেলার প্রতি ঝোঁক তার ছেলে বেলা থেকেই। দুটোর জন্যেই প্রয়োজন ছিল শৃঙ্খলা, চিন্তার গভীরতা ও নিষ্ঠা। আমিনুল বলছিল সেসবের কথা।


নৌমহলে মুফতিদের বাসার কাছেই সমীর চন্দ্র চন্দের বাসা। সবাই কটন-দা বলে ডাকে। সঙ্গীত নিয়েই তিনি ও তার গোটা পরিবার। বেহালা ও গিটার শেখান তিনি। মুফতী ও তার ছোট ভাই হাদীর বেহালায় হাতেখড়ি তার কাছেই। দাবা কোথায় শিখলো? আমিনুল বলতে পারেনি। বললো, “হয়তো নিজে নিজেই শিখছে।” তবে মজার কথাও একটা জানালো আমিনুল। ময়মনসিংহ শহরের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মির্জা আজাদ বখত ওপার বাংলা থেকে এসে এ শহরে বসতি করেছেন। তিনি দাবা খেলতেন মুফতীর সাথে। কখনো মুফতীকে হারাতে পারতেন না। তাতে তার কোন খেদ ছিল না। বলতেন, “বুঝলে মুফতি, কাঠ ঘষলেও ধার হয়, কিন্তু ইস্পাতের মত নয় কখনো। আমি কাঠ আর তুমি হচ্ছো ইস্পাত।” 

মুফতীর বাবা ময়মনসিংহ শহরে ১৯৫৫ সালে একটি আধুনিক কাঠের আসবাবপত্র তৈরির কারখানা শুরু করেছিলেন। সেই কারখানায় মুফতী দাবা খেলার বিশাল সব গুটি তৈরি করেছিল। বাসার মেঝেতে দাবার ছক কেটে বড় বড় দাবার গুটি দিয়ে ভাই-বোন বন্ধু-বান্ধব মিলে দাবা খেলার আসর বসাতো মুফতি। নিজের চোখ বেঁধে মুফতী অনেকের বিরুদ্ধে একা খেলতো। কেউ জিততে পারতো না। ফোনে কথা হয় ময়মনসিংহের নজিব আশরাফ হোসেনের সাথে। মুফতীর  চাচার ছেলে। মুফতীর প্রতি অন্তপ্রাণ নজিব বলছিল, “মুফতী ভাই নিজের চোখ বেঁধে এক সাথে ৭ জন দাবাড়ুকে হারিয়েছিলেন। এমন কৃতিত্ব সে সময়ে আর কারও ছিল না।” 

মুফতীর সব কাজ একা একা। এমনি একদিন থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে একদম একা মুফতী চলে গিয়েছিল ঘাতক পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে বৃদ্ধ সামাদ দফতরিকে বাঁচাতে। ১৯৭১-এর ১৪ জুন তারিখে। সে বিষয়ে বলবো পরে।  

কলেজ শেষ করে আমি ভর্তি হয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োক্যামেস্ট্রি বিভাগে। মুফতী ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে। মুফতী মোহাম্মদ কাসেদ। একের পর এক বিভিন্ন টুর্নামেন্টে বিজয়ী হয়ে চলেছে ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মুফতি। জেলা স্কুলে আমাদের আরেক সহপাঠী কামরুল। ক্লাসে তৃতীয়। নৌমহলে মুফতীর বাসার পাশেই তার বাসা। পরে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মেকানিক্যালে মুফতীর সাথে পড়েছে। বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কৃতি অধ্যাপক মো. কামরুল ইসলামের সাথে ফোনে কথা হয়। “মুফতী থাকতো কায়দে আজম হলের (বর্তমান তিতুমির হল) ২০৭ নম্বর (উত্তর) কক্ষে। দাবায় এত সময় দিত যে তৃতীয় বর্ষে তার ক্লাস উপস্থিতি কম থাকায় বিভাগীয় প্রধান মাদ্রাজি অধ্যাপক ভি জি দেসা তাকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে দেবেন না বলে জানিয়ে দিলেন। তৎকালীন পাকিস্তান শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্রের (বর্তমান বিটাক) পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন অধ্যাপক দেসার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার  অনুরোধে অধ্যাপক দেসা মুফতীকে পরীক্ষায় বসতে দিতে রাজি হলেন। সংযোগটি হলো দাবা খেলা। মুফতীর সাথে বড় আনন্দে দাবা খেলেন মোশাররফ হোসেন। অনুমতি দিলেও মুফতীর উপর বিশাল অ্যাসাইনমেন্টের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিলেন অধ্যাপক দেসা।” 

এত বছর পর কথাগুলো বলতে গিয়ে অধ্যাপক কামরুলের কণ্ঠে ঝরে পড়ছিল শুধুই ভালবাসা। “জানো, পড়াশুনা না করলে কি হবে, পরীক্ষার আগে আগে আমাদের কাছ থেকে নোট নিয়ে অল্প সময়ে সব রপ্ত করে নিত মুফতী। অ্যাসাইনমেন্টও ঠিক সময়ে জমা দিতে পেরেছে। আমরা একটু সাহায্য করেছি মাত্র। যথারীতি পরীক্ষায় ভাল করেছে মুফতী।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন। মুফতীকে বড় ভালবাসেন তিনি। সূত্রটা হচ্ছে দাবা খেলা। 

মজার এক তথ্য জানালো বন্ধু আমিনুল। ছুটি শেষে মুফতী বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ফিরবে।। মাকে বললো, একটা বালিশ আর কম্বল লাগবে। মা তো অবাক। গত ছুটি শেষে নতুন বালিশ ও কম্বল তো সে নিয়ে গিয়েছিল। মুফতী কুণ্ঠার সাথে মাকে জানায় বালিশ-কম্বল নিয়ে দাবা খেলতে গিয়েছিল। সারা রাত ধরে খেলা। দূর সেই জায়গা থেকে ফেরার সময় বালিশ-কম্বল নিতে ভুলে গিয়েছে। মা তার এই আত্মভোলা ছেলেটিকে বড় বেশি ভালবাসেন। সবার বড় ছেলেটিকে হারিয়েছিলেন যখন তার বয়স চার। তারপর মুফতি। মা মুফতীকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “বালিশ-কম্বলের দরকার নেই বাবা, আমার ছেলে ফিরে আসলেই হলো।” 

কত অজানা যায়গায় মুফতী চলে গেছে, কিন্তু প্রতিবারই ফিরে এসেছে। কিন্তু ৭১-এর ১৪ জুনে সেই যে গেল মায়ের ‘আদরের পুতলা’ মুফতী, আর তো ফিরে এলো না! 

১৯৭১। আমাদের প্রজন্মের হিরন্ময় সময়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর অমর ভাষণের পর থেকে ২৫শে মার্চের কালোরাতে পাকিস্তানি  হানাদার বাহিনীর গণহত্যা শুরু পর্যন্ত সময়টি বাঙালির জীবনে দুনিয়া কাঁপানো ১৮ দিন। এ সময়েই বাঙালি জনগণ মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুদ্ধবিদ্যা শেখা ও সামরিক প্রস্তুতির কাজ শুরু করে দেয় এ সময়ে। 

মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য পয়লা মার্চ তারিখে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে আমরা গঠন করি ‘সূর্যসেন স্কোয়াড’। ২৭ মার্চ ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের পথে আমাদের কয়েক জনের যাত্রা শুরু হল। প্রধানত, হেঁটে মুক্তাগাছায় আমরা পৌঁছে যাই এপ্রিলের শুরুতে। ময়মনসিংহ শহর তখনো মুক্ত। পুলিশ লাইন এবং ইপিআর ক্যাম্পের বাঙালি সদস্য এবং ২য় বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানির সৈন্যরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে। জানতে পারলাম এদের  সাথে যুক্ত হয়েছে ছাত্র স্বেচ্ছাসেবকেরা। প্রতিরোধ রচনা করছে টাঙ্গাইল-মধুপুর হয়ে ময়মনসিংহের পথে আগুয়ান হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে। মুক্তাগাছায় গড়ে উঠেছে একটি ঘাঁটি। আমরাও যুক্ত হয়ে গেলাম সেখানে।

ভাই মুফতীর কাছে বোন সুলতানার চিঠি

ভাই মুফতীর কাছে বোন সুলতানার চিঠি

বহু বছর পর মুফতীর  যুদ্ধদিনের কথা বিস্তারিত শুনি মুফতীর ছোট ভাই ও মুক্তিযুদ্ধের সাথী হাদী হাসানের কাছ থেকে। ক্যাডেট কলেজে মুফতীর সহপাঠী জেনারেল (অব) মোহাম্মদ সাঈদের সাথে ফোনে কথা হয়। বলছিলেন, ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনেই মুফতী বললো, “বার্তা পেয়ে গেছি। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে। ময়মনসিংহ চলে গেল মুফতী। অসহযোগের দিনগুলোতে যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করে দিল।” 

২৭ মার্চ ফুলপূর-তারাকান্দা অঞ্চলের এমপি শামসুল হকের নেতৃত্বে তৎকালীন ইপিআর-এর আঞ্চলিক হেডকোয়ার্টার এবং পুলিশ লাইন থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে মুফতী ও তার সঙ্গীরা। মধুপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে বীরের মত লড়াই করে মুফতী ও তার দল। ১০ এপ্রিল ময়মনসিংহ শহরের পতনের পূর্ব পর্যন্ত মুফতী ও তার ভাই হাদী সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকে প্রতিরোধ সংগ্রামে। পাকিস্তানি গোলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। হয়তো আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হানাদার বাহিনী প্রবেশ করবে শহরে। আমার বড় সাঈদ ভাই এবং সাথী তাজুল ইসলাম বেবি ভাই ও আমি শহরের মিশন রোডের পাশে একটি চার্চ থেকে সংগ্রহ করেছি একটি  ফোর্ড করটিনা গাড়ি। শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি জামালপুরের দিকে। সাথে কয়েকটি হাল্কা অস্ত্র ও পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট থেকে নেয়া একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন। হাদী বর্ণনা করছিলেন ঠিক একই সময়ে একটি ল্যান্ড রোভার জিপ ও একটি ট্রাকে করে মুফতীর  নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধার দল শহর ছেড়ে গফরগাঁয়ে  তাদের গ্রামের দিকে যাত্রা করেছে। কত কাছে থেকেও আমাদের দেখা হয়নি। আহা, সে সময় মুফতীর সাথে দেখা হলে হয়তো আমরা একসাথেই যুদ্ধ করতাম!  

মুফতীর আঁকা কার্টুন। ছোটবোন সুলতানার সংগ্রহ থেকে নেওয়া

মুফতী ও তার দল গ্রামের বাড়ি চলে যায় প্রতিরোধ সংগ্রামকে সংগঠিত করার জন্য। ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারে সে গ্রাম। সেখানে পাকিস্তানিদের পৌঁছানো সহজ ছিল না। এপ্রিল মাসের মধ্যেই হানাদার বাহিনী দখল করে নিয়েছিল জেলা শহরগুলো। মে মাস পার হয়ে জুন থেকে গ্রামের দিকে হানাদার বাহিনী এগুতে থাকে। তাদের পথ চিনিয়ে নেবার জন্যে রাজাকার, আলবদর ও অনুগত বাঙালি পুলিশ তখন তৎপর।  

এখন বলবো ১৪ জুনের কথা। একদিন খবর আসে গফরগাঁওয়ের এমপি অধ্যাপক শামসুল হুদার শ্বশুর সামাদ দফতরি গফরগাঁও থানার পুলিশের একটি দল ধরে নিয়ে যাচ্ছে। মুফতী তড়িৎ সিদ্ধান্ত নেয় বৃদ্ধ সামাদ দফতরিকে উদ্ধার করতে হবে। সে মুহূর্তে তার সাথে কোন মুক্তিযোদ্ধা ছিল না। একমাত্র সম্বল তার থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে মুফতী একাই এগিয়ে গেল। কাউরাইদ স্টেশনের কাছে পাইথল গ্রামের এক ধানক্ষেতের সেচ দেয়ার ড্রেনের আড়ালে অবস্থান নিয়ে একটি ফাঁকা গুলি করলো মুফতী। অল্প দূরে পুলিশ বাহিনী। চিৎকার করে মুফতী বললো দফতরিকে ছেড়ে দিতে। তা না হলে তাদের উপর গুলি করবে মুক্তিযোদ্ধারা। ভয় পেয়ে সামাদ দফতরিকে ছেড়ে দিয়ে উর্ধ্বশ্বাসে পালায় পুলিশ। বৃদ্ধ সামাদ দপ্তরী জীবন ফিরে পেয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে এসেছেন। মুফতীর মিশন সফল। পলায়মান পুলিশের অবস্থান জানতে মাথা একটু উঁচু করেছিল মুফতী। 

ঘাতক বাহিনীর একজন তাকে দেখে ফেলে। বুঝে ফেলে মাত্র একজন মুক্তিযোদ্ধা আছে এখানে। তার ছোড়া গুলি সরাসরি আঘাত করে মুফতীর মাথায়। লুটিয়ে পড়ে মুফতি। এবার ঘাতকেরা এগিয়ে আসে। মুফতীর উপর আরো গুলিবর্ষণ করে তারা চলে যায়। সেই জলমগ্ন ধানক্ষেতে পড়ে থাকে শহীদ মুফতী মোহাম্মদ কাসেদের নিথর দেহ। পরদিন ১৫ জুন তারিখে গ্রামবাসী পরম মমতায় শহীদ মুফতীকে   দাফন করে পাইথল গ্রামের জয়ধর খালী পাড়ায়। ১৭ জুন ময়মনসিংহ শহর হেডকোয়ার্টার থেকে পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামে হানা দিয়ে কবর খুঁড়ে লাশ নিয়ে যায় ময়মনসিংহ শহরে। ময়না তদন্ত হয় সে লাশের। তারপর তার স্বজনদের খোঁজ শুরু করে। দালালরা জানিয়ে ছিল এর বাবা ময়মনসিংহ পৌরসভা অফিসের সচিব।

মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় বহু শোকগাঁথার একটি রচিত হয় পৌরসভা অফিসে। একটি লাশ নিয়ে এসেছে হানাদার বাহিনী। পাকিস্তানি এক মেজর মুফতীর বাবা ওয়াহীদ সাহেবকে নির্দেশ দেয় তার ছেলেকে শনাক্ত করতে। পিতার সামনে পুত্রের লাশ। কী করবেন পিতা? যদি স্বীকার করেন এই লাশ তার পুত্রের, তা হলে তিনি ও তার পরিবার শুধু নয়, মুফতীর সহযোদ্ধাদের সমূহ বিপদ। অস্বীকার করলে শুধু নিজের জীবন বিপণ্ণ হতে পারে।  মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেন পিতা। লাশের দিকে ভাল করে তাকান। তারপর মেজরের চোখের দিকে নিস্পলক, নিষ্কম্প চোখে তাকিয়ে উত্তর দেন এ তার ছেলে নয়। কে জানে, কেন সেই মেজর আর কোন জিজ্ঞাসাবাদ করে না। পৌরসভার একটি কাজ হলো বেওয়ারিশ লাশের দাফনের ব্যবস্থা করা। সেই রাতে কয়েজন কর্মচারিকে নিয়ে ওয়াহীদ সাহেব তার আদরের ধন, দশ পুত্র-কন্যার মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী মুফতীর লাশ গোসল করিয়ে সাদা কাপড়ে মুড়ে কালীবাড়ির সরকারী কবরস্থানে সমাহিত  করেন। তার পরনে ছোপ ছোপ রক্তে ভেজা হলুদ রঙের মোটা খদ্দরের হাফশার্টটি ধুয়ে তিনি রেখে দেন পরম যত্নে। এই শার্টতো তার বড় চেনা। 

৭০-এর ডিসেম্বরে তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মুফতী এসেছে বাসায়। বাবা তাকে নিয়ে গেলেন শহরের অভিজাত গৌরহরি বস্ত্রালয়ে। আর মাত্র এক বছর পর ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বেরোবে পুত্র। একটা স্যুট বানিয়ে দেবেন তাকে। নানা রঙের থান দেখানো হচ্ছে মুফতীকে। মুফতী বললো ওই হলুদ রঙের মোটা খদ্দরের থানটি নামাতে। সে কাপড়ে একটি হাফ শার্ট বানাতে দিল মুফতি। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে এই শার্টে বড় বড় পকেট লাগিয়ে নিল মুফতী যাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেলের কয়েকটি ম্যাগাজিন রাখা যায়।  ১৪ জুন পাইথল গ্রামে যখন শত্রু পক্ষের গুলি মুফতীকে বিদ্ধ করছে, তখন তার গায়ে ছিল এই হলুদ শার্ট। মা ছেলের লাশ দেখেননি, মৃত্যু অবধি মুফতীর এই হলুদ শার্টটি বার বার বুকে চেপে ধরেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুফতীর বন্ধুরা তার কবরে লিখেছেন ‘হে পথিক ক্ষণিক থামো, তারপরে নাও পথ! এ মাটির প্রেমে দিয়েছে যে প্রাণ – এখানেই থেমেছে তার জীবন রথ।’

এবারে কিছু কঠিন সত্যের মুখোমুখি আমাদের দাঁড়াতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকেই মুফতী মোহাম্মদ কাসেদের শহীদ হওয়া বিষয়ে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বহুজনেরা জানতেন। গফরগাঁও অঞ্চলের এমপি অধ্যাপক শামসুল হুদার শ্বশুর বৃদ্ধ সামাদ দফতরিকে শত্রু বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত করতে মুফতী একা এগিয়ে গিয়েছিলেন। মুক্ত করেছিলেন তাকে। কিন্তু নিজের জীবন উৎসর্গ করে। এমপি শামসুল হুদা তো তা জানতেন। বাংলাদেশ হওয়ার পর সামাদ দফতরির পুত্র গফরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। অন্তত জয়ধর খালী পাড়ায় মুফতীর প্রথম কবরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ করতে পারতেন। কিছুই করেননি তারা। ফুলপূর-তারাকান্দা অঞ্চলের মুফতীর   আত্মীয় এমপি শামসুল হকের নেতৃত্বে মুফতী মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। মুফতীর   শহীদ হওয়ার খবরতো তারও জানা। ময়মনসিংহ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড জানতো সে তথ্য। ময়মনসিংহের গৌরীপুর এলাকার বর্তমান আওয়ামী লীগ এমপি নাজিমুদ্দিন আহমেদ। সব জানেন মুফতীর   শহীদ হওয়া সম্পর্কে। রাজাকার, আলবদর, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানদের নাম উঠেছে মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদের তালিকায়। মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদের তালিকায় মুফতীর নামটি যুক্ত করতে এদের বড়ই অনীহা।

ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্র ও স্বনামধন্য দাবা খেলোয়াড় হিসেবে মুফতীর  পরিচয় তো অজানা ছিল না। তারপর ও কেন শহীদের তালিকায় এই বীরের নাম নেই। ছোট ভাই ও সহযোদ্ধা হাদীর ক্ষোভ ও আক্ষেপ সেখানে। বলছিলেন তিনি, “সারা পৃথিবীর মানুষ যারা মুক্তিযুদ্ধকালে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন, সরকার তাঁদের যথাযোগ্য সম্মান জানিয়েছে। সে জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু নিজ দেশে মুফতীর মত এমন একজন উৎসর্গিত মুক্তিযোদ্ধার নাম কেন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায়, শহীদের তালিকায় নেই? কেন তার সরকারী স্বীকৃতি থাকবে না।” 

অধ্যাপক কামরুলের কাছে জানলাম বুয়েটে মুফতীর নাম শহীদের তালিকায় আছে। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ কর্তৃপক্ষ ভুলে যায়নি মুফতী কাসেদকে। কিন্তু সরকার, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কী করেছেন? প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এবং তিতুমীর হলে শহীদের তালিকায় মুফতীর   নাম আছে। তারপরও বলবো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যাপকরা বিশেষ করে মুফতীর সহপাঠী যারা সেখানে অধ্যাপনা করেছেন, তাদের আরো কিছু কর্তব্য আছে। মুফতীর পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানলাম, মুফতীর   ছবি, অ্যালবাম, ব্যবহার্য দ্রব্যাদি বুয়েটের একজন অধ্যাপককে তারা দিয়েছিলেন। তিনি চলে গেছেন আমেরিকায়। মুফতীর ব্যাপারে কোন উদ্যোগও নেননি। মহা মূল্যবান মুফতীর স্মৃতি যা কিছু নিয়েছিলেন তার কোন কিছু আর ফেরতও দেননি তিনি। মুফতীর নামে যে দাবা প্রতিযোগিতা হত, তাও নেই। ‘বুয়েট চেস ক্লাব’ আছে। শহীদ মুফতীর   নামে যে এই ক্লাবটি হতে পারে এমন কোন বোধ এই স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কারও কি নেই?


এই লেখা যখন শেষ করে এনেছি, তখন গতরাতে হাতে এলো এক গুচ্ছ দুর্লভ চিঠির ফটো কপি। হাদী হাসান পাঠিয়েছেন। জানিয়েছেন মুফতীর ডায়রি ও আরো বহু চিঠি ছিল। সেগুলো উদ্ধার করা যায়নি। বেশিরভাগ নিয়েছেন গুণীজনেরা, ফেরত দেননি। বাকি সব উঁইপোকার পেটে গেছে। ফৌজদারহাট কলেজে পড়বার সময় মুফতী লিখেছে বাবা-মা-ভাই-বোনদের। মুফতীকে লেখা তাদের  চিঠিও আছে। ক্লাস সিক্স থেকে শুরু করে ক্লাস টেন পর্যন্ত মুফতী সবচেয়ে বেশি লিখেছে বাবাকে। সব চিঠি ইংরেজিতে। বাবাও দীর্ঘ চিঠি লিখেছেন পুত্রকে। ইংরেজিতে। ছোট বেলা থেকে ছেলে-মেয়েদের ইংরেজি শিখিয়েছেন। তার ছাপ পাওয়া গেল ক্লাস সিক্সে পড়বার সময়ে মুফতীর ইংরেজিতে লেখা চিঠি দেখে। 

শুরুতে ছোট বোন সুলতানার রুমাল গুছিয়ে দেওয়ার কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। ভাইকে লেখা তার চিঠিও আছে। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাকে লেখা মুফতীর একটি চিঠি, তারিখ বিহীন। মুফতীর আঁকা কার্টুন আছে। সবার ছোট ছেলে আমেরিকা প্রবাসী প্রকৌশলী পুত্র তোফাকে লেখা বাবার চিঠিটি ইংরেজিতে টাইপ করা। বয়স তখন তার ৮৫। তাই হয়তো হাতে লিখতে অপারগ হয়েছেন। গভীর অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন এক দার্শনিকের পত্র যেন পাঠ করলাম। পত্রের শেষ কটি লাইন, “So pray for me – for your mother & our forefathers  who have preceded us to the Great unknown. It is immaterial in whichever part of this planet we live & die – because we must leave it – our stay here is very insignificant in the boundless canvas of eternity.”

আহা, এই বাবা শেষ পর্যন্ত দেখে যেতে পারেননি তার সবচাইতে যোগ্য পুত্র মুফতীর নামটি শহীদের তালিকায় উঠেছে! 


শেষ করবো কয়েকটি প্রস্তাব করে:

১. মুক্তিযোদ্ধা তালিকা এবং মুক্তিযুদ্ধে মহান শহীদদের তালিকায় মুফতী মোহাম্মদ কাসেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হোক। সে লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম মোজাম্মেল হক এবং সচিব জনাব তপন কান্তি ঘোষের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

২. মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করে দখলদার বাহিনীর হাত থেকে বৃদ্ধ সামাদ দফতরিকে উদ্ধার এবং বিনিময়ে নিজের  জীবন উৎসর্গ করার যে মহত্তম দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তার জন্য মুফতী মোহাম্মদ কাসেদকে মরণোত্তর বীরত্বসূচক খেতাব দেওয়া হোক। আশা করি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

৩. ময়মনসিংহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ কোনও স্থানে তার একটি আবক্ষ ভাস্কর্য স্থাপন করা হোক। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ পৌরসভা ও জেলা প্রশাসকের সুদৃষ্টি কামনা করছি।  

৪. বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কোন হল বা স্থাপনার নাম মুফতী মোহাম্মদ কাসেদের নামে করা হোক। খুব আশা করছি মাননীয় উপাচার্য এবং সিন্ডিকেট এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। শহীদ মুফতীর   নামে হোক ‘বুয়েট চেস’ ক্লাবটি। দাবা টুর্নামেন্ট আবার চালু হোক তার নামে।

৫. ১৯৭১ সালের ১৪ জুন গফরগাঁও থানায় কর্মরত যে পুলিশ সদস্যরা মুফতীর  হত্যাকাণ্ডে জড়িত তাদের খুঁজে বের করা হোক। কেউ জীবিত থাকলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচারের সম্মুখীন করা হোক। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মহামান্য বিচারকদের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

২৩ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিয়েছিল মুফতী। আমার বয়স এখন ৭১। দীর্ঘদিন বেঁচে আছি। মৃত্যুর আগে যদি উপরের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হয়, তবে নিজের জীবনকে ধন্য মনে করবো। ভাইয়ের জন্য পরম মমতায় যে ছোট বোন সুলতানা রুমাল গুছিয়ে দিয়েছিল, মুফতীর  সহযোদ্ধা ছোটভাই হাদী যে তার সাথে বেহালা বাজাতো সে ও মুফতীর পরিবারের বাকি সদস্যরা তাতে হয়তো কিছুটা শান্তি পাবে।

(ড. মো. আনোয়ার হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও শহীদ মুফতী মোহাম্মদ কাসেদের স্কুল জীবনের বন্ধু।)



Tuesday, November 4, 2014

মেহেরপুরে যুবলীগের বিক্ষোভ মিছিল

০৩ নভেম্বর
বাংলাদেশ আওয়ামী যুব লীগের কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ওমর ফারুকের বাসভবনে ককটেল হামলার প্রতিবাদে মেহেরপুর জেলা যুবলীগের উদ্যোগে এক বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়।
সোমবার বিকালে জেলা যুবলীগের সভাপতি সাজ্জাদুল আনামের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিলটি শহরের শিল্পকলা মোড়ে থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক হয়ে বড় বাজারে এসে শেষ হয়। মিছিলে অন্যান্যদের মধ্যে যুবলীগের সাধারন সম্পাদক সাজ্জাদুল আলম, যুগ্ম সম্পাদক নিশান সাবের, সাংগাঠিনকি সম্পাদক মাহফিুজর রহমান মাহবুব, মিজানুর রহমান হিরন, গাংনী উপজেলা সভাপতি মোশাররফ হোসেন, সদর উপজেলা সম্পাদক আল মামুন, মাসুদ খান লিংকন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

Sunday, November 2, 2014

রাজাকার ও দুর্ণীতি মুক্ত করার লক্ষে আমরা আন্দোলন শুরু করেছি মেহেরপুরে ইমরান এইচ সরকার

 শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর
গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেছেন এদেশকে রাজাকার ও দুর্ণীতি মুক্ত করার লক্ষে আমরা আন্দোলন শুরু করেছি। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও যখন স্বাধীনতা বিরোধীরা গাড়িতে পতাকা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায় তখন খুব কষ্ট লাগে । তিনি আরো বলেন, আমরা যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার চেয়েছি, যারা তাদের পৃষ্টপোষকতা করছে তাদেরও বিচার চেয়েছি।
ডা.ইমরান এইচ সরকার শুক্রবার রাতে মেহেরপুর শহীদ সামসুজ্জোহা নগর উদ্যানে গণজাগরণ মঞ্চ মেহেরপুর শাখা ও প্রজন্ম মুজিবনগর’র উদ্যোগে এক জাগরণ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।
ভাষা সৈনিক ইসমাইল হোসেনের সভাপতিত্বে জাগরণ সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন,গণজাগরণ মঞ্চের নেতা জনাদন দত্ত নান্টু, শ্লোগান কণ্যা লাকি আকতার ,এ্যাড. ইয়ারুল ইসলাম, এ্যাড. আব্দুস সালাম, আব্দুল মান্নান, সাজ্জাদুল আনাম, নিশান সাবের প্রমুখ। এর আগে ডা. ইমরান এইচ সরকার শহীদ বেদিতে পুস্পমাল্য অর্পন করেন।

Monday, October 6, 2014

উন্নয়ন এর জোয়ার এ ভাসছে মেহেরপুর পৌরসভা - ২

 মেহেরপুর শহরের গোরস্থান পাড়ার সড়কে ধানের চারা রোপন করে প্রতিবাদ ,সড়ক সংস্কারের দাবিতে মেহেরপুর শহরের ৯ নং ওয়ার্ড  গোরস্থান পাড়ায় রাস্তার উপরে ধানের চারা রোপন করে প্রতিকি প্রতিবাদ জানিয়েছে এলাকাবাসীরা।
রোববার বিকালের দিকে এলাকাবাসীরা  কর্দমাক্ত রাস্তার উপর ধানের চারা রোপন করে প্রতিবাদ জানায়। এলাকাবাসী অভিযোগ করে বলেন, লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে শহর সৌন্দয্য বৃদ্ধির নামে সু সজ্জিত ফোয়ারা গেট নির্মান করা হচ্ছে, প্রতিকি বাঘ হরিন নিয়ে পৌরসভাকে সাজানো হচ্ছে অথচ জনগনের যাতায়াতের সড়ক নষ্ট হয়ে জনজীবন চলাচলে বিঘ্ন ঘটলেও সেদিকে পৌর কতৃপক্ষের কোনো খেয়াল নেই। যে কারনে বাধ্য তারা এই প্রতিকি প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নেমেছেন বলে জানান ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।




Tuesday, September 30, 2014

সোনার কোট পিন নাকি যাদুর মাদুলি মতুর কৃত্তি - ২

মেহেরপুরে আওয়ামীলীগ  এর বড় কোন নেতা আসলেই তাকে সোনার কোট পিন দিয়ে শ্রদ্ধা জানান মেয়র মতু । তিনি আসলে সোনার পিন দিয়ে কি উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাই তা সবার অজানা । অনেকেই বলেছেন মতু বিভিন্ন সময় নানান

Monday, September 29, 2014

মতু আসলে কোন দলের , ধারাবাহি প্রতিবেদন মতুর কৃত্তি - ১

মেহেরপুর এর মেয়র মতাছিম বিল্লাহ মতু আসলে কোন দল করে তা নিয়ে আছে নানা সংশয় ,সম্প্রতি জাতির  জনকের প্রতিকৃতিতে  পুষ্পমাল্য অর্পণ করাকে কেন্দ্র করে তা আরও প্রকট হয়েছে । সম্প্রতি ২নং ওয়ার্ড কউঞ্চিলর ও যুবলীগ নেতা রিপন হত্যার প্রধান আসামী হয়েও তিনি আবার আওয়ামীলীগ এর সতীর্থ কিভাবে হয় তা কোন ভাবেই বোধগম্য নয় বলে জনান জেলা যুবলীগ এর নেতারা । তারা বলেন মতু এই কাজটি  করে উপর মহল থেকে কোন সুবিধা আদায় করতে চাইছেন। তারা বলেন মতু নিজের জন্য যে কোন কাজ করতে পারে এটা তারই অংশ , তারা আরও জানান   ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি জাতীয় পার্টির (জাপা) এর মনোনয়ন নিয়ে মতু ৫ হাজার ৫৩২ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান লাভ করেন । আরও অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায় যে তিনি আসলে গোল আলু ধরনের লোক ,  যে কোন ঘটনা কি ভাবে ধামা চাপা দিতে হয় তা তার ভালই জানা, তার বিরুদ্ধে কথা বলা মানেই মৃত্যু, সম্প্রতি তিনি আওয়ামীলীগ এর এক অংশকে হাত করে চলছেন বলে জানা যায় ।

অন্যান্য পোস্ট :

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০১ সালের ১ অক্টোবর - See more at: http://express365.blogspot.com/2014/09/blog-post_25.html#sthash.78kNmyRG.dpuf
অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০১ সালের ১ অক্টোবর - See more at: http://express365.blogspot.com/2014/09/blog-post_25.html#sthash.78kNmyRG.dpuf
অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০১ সালের ১ অক্টোবর - See more at: http://express365.blogspot.com/2014/09/blog-post_25.html#sthash.78kNmyRG.dpuf
অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০১ সালের ১ অক্টোবর - See more at: http://express365.blogspot.com/2014/09/blog-post_25.html#sthash.78kNmyRG.dpuf

Friday, September 26, 2014

মেহেরপুরের বধ্যভূমি

মেহেরপুর সকারী কলেজ মাঠ বধ্যভূমি

স্বাধীনতা যুদ্ধকালে গোটা মেহেরপুর ছিল  পাক বাহিনীর নির্যাতন এর কেন্দ্র। স্থানীয় সরকারী কলেজ মাঠ ছিল এ খান কার সব চেয়ে বড় বধ্যভূমি ।এখানে পাকবাহিনীর অধিকাংশ স্বাধীনতা কর্মীদের ধরে এনে হত্যা করত। কলেজ মাঠের  মাঝ খানে একটি বিশাল আম বাগান এর ডালে মুক্তি যোদ্ধাদের প্রথমে পা বেঁধে টাংগানো হতো। এখানে অমানুষিক নির্যাতন  শেষে কলেজ এর একটি বদ্ধ ঘরে বন্দি রেখে এক  হত্যা করা হতো। শাধিনতার পর এই বধ্যভূমি তে মানুস এর মাথার খুলি , হার গড়, মাথার চুল  পওয়া যায় ।

মেহেরপুর  জেলা প্রশাসন কাযালয় বধ্যভূমি

মেহেরপুর  জেলা প্রশাসন কাযালয়  চত্বর ছিল পাক বাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্র ও বধ্যভূমি।এই  বধ্যভূমি তে মেহেরপুর সদর উপজেলার  বুড়িপোতা  ইছাখালি ও গোভীপুর গ্রামের মুক্তি যোদ্ধা দের হত্যা করে পুতে রাখা হয়। যুদ্ধ শেষে এখান থেকে বহু নরকঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।

ওয়াপদা মোড় বধ্যভূমি

মেহেরপুর  ওয়াপদা মোড় ছিল পাক বাহিনীর অন্যতম বধ্যভূমি । শহর এর বিভিন্ন এলাকা  থেকে লকজন ধরে এনে এই বধ্যভূমি হত্যা করা হতো ।  এখানে শহর ও তার আস পাস এলাকার মুক্তি যোদ্ধা জোড় করে হত্যা করে লাস পুতে রাখা হয়।

বাসষ্ট্যান্ড বধ্যভূমি,

মেহেরপুরের বাসষ্ট্যান্ড এলকায় ছিল পাকবাহিনীর একটি বধ্যভূমি। এখানে পাকিস্থানী হানাদাররা বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত বহু যাত্রীদের ধরে নিয়ে হত্যা করে। কিন্তু এই স্থানটির কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। সেই এলাকাতেই এখন বাসষ্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পর এখানে মানুষের মাথার খুলি ও হাড়গোড় পাওয়া যায়।

গোরস্থা পাড়া বধ্যভূমি

একান্তরে যুদ্ধকালীন মেহেরপুরে গোরস্থান পাড়ায় পাকহানাদার বাহিনীর নির্যাতনকে কেন্দ্র ও বধ্যভূমি ছিল। স্বাধীনতার পর এখান থেকে উদ্ধারকৃত মানুষের মাথার খুলি ও হাড়গোড় অন্যান্য গণকবর থেকে উদ্ধারকৃত হাড়গোড়ের সঙ্গে একটি কেন্দ্রীয় গণকবরে রাখা হয়। পৌর কবরস্থানের পাশেই এই গণকবরটি। এখন এখানে নির্মিত হয়েছে কেন্দ্রীয় স্মৃতি সৌধ।

জোড়পুকুরিয়া বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের ২৮ জুলাই মেহেরপুরের গাংনী থানাধীন মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়কের জোড়পুকুরিয়া ষোলটাকা রাস্তার সংযোগস্থল এলাকা তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে গমণকারী শত শত নারী-পুরুষ-শিশুকে পাকহানাদার বাহিনীরা নির্মভাবে গুলি করে হত্যা করে। স্বাধীনতার পর এখান থেকে শতাধিক মাথার খুলি ও হাড় উদ্ধার হয়। কিন্তু এই স্থানটি সংরক্ষণ না করার সেখানে গড়ে উঠেছে  নানান প্রতিস্তান।

মেহেরপুর ভোকেশনাল বধ্যভূমি

স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন মেহেরপুর ভোকেশনাল ট্রেনিং কলেজটি পাকবাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্র ছিল। জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধাদের চোখ বেঁধে ধরে এসে এখানে নির্যাতন করা হত। নির্যাতন শেষে শত শত মুক্তিযোদ্ধা হত্যা করে লাশ ট্রাক বোঝাই করে নিয়ে বিভিন্ন ডোবা ও পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে কিছু লাশ এখানে কবর দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর এখান থেকে শতাধিক মানুষের মাথা ও কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। কিন্তু এই জায়গাটি সংরক্ষণ করা হয়নি।

তেড়ঘরিয়া বধ্যভূমি

মুক্তিযুদ্ধ কালে অনেকেই মেহেরপুর সদর উপজেলার এখানকার সীমান্ত দিয়ে ভারতের আশ্রয়ের জন্য গেছে। এ সময় পাক বাহিনীর হাতে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ নারী-পুরুষ ধরা পড়ে। তেড়ঘরিয়া গ্রামের বিল কুলবর্তী স্থানে জড়ো করে পাক বাহিনীর এদের প্রকাশ্যে গুলি করে। পরে এটি গর্ত করে খুঁড়ে তাদেরকে গণকবর দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের পরে সেখানে অসংখ্য মানুষের হাড় পাওয়া যায়। স্থানটি সংরক্ষিত নেই বলে এখন খুঁজে পাওয়া যায় না।

মেহেরপুর কালাচাঁদপুর বধ্যভূমি

৭১ সালে রাজাকারদের ইন্ধনে এলাকা চাঁদপুরে পাকবাহিনী ধংসযজ্ঞ চালায়। এই এলাকায় অধিকাংশের বাড়ি পাকবাহিনী পুড়িয়ে দেয়। অর্ধশত মুক্তিযোদ্ধাকে ধরিয়ে দেয় রাজাকাররা। পাকবাহিনী এই সমস্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে চোখ বেঁধে একটি ঘরে নিয়ে সেখানে গুলিল করে হত্যা করে। পরে কালাচাঁদপুর সড়ক সংলগ্ন একটি স্থানে গর্থ করে মুক্তিযোদ্ধাদের লাশ পুঁতে ফেলা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর সেখান থেকে অসংখ্য মানুষের হাড় কঙ্কাল উদ্ধার হয়। কিন্তু সংরক্ষিত না থাকায় এখন সেখানে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি।

(তথ্য সূত্র:  মুক্তিযুদ্ধের যাদুঘর সংগৃহীত তথ্য সূত্র: একান্তরের বধ্যভূমি ও গণকবর- সুকুমার বিশ্বাস পৃ-১১২ যুদ্ধাপরাধ গণহত্যা ও বিচারের অন্বেষণ- ডা: এম এ হাসান, পৃ-৪০২। মুক্তিযুদ্ধ কোষ, চতুর্থ খন্ড- মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত, পৃ-১৬২, দৈনিক সংবাদ, ২১ মে ১৯৯২ ,  তোজাম্মেল আযম রচিত- মেহেরপুরের ইতিহাস গ্রন্থ। প্রথম খন্ড, পাতা ১৩৩ পৃ)

Friday, September 19, 2014

সারদা-সাহারা ও দুই বাংলার টানাপড়েন

মাসুম খলিলী

হঠাৎ করে সারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে তোলপাড় হয়ে গেল বাংলাদেশ-ভারতে। অভিযোগ গুরুতর, সারদার কর্ণধার সুদীপ্ত সেন বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটাতে অ্যাম্বুলেন্স মাইক্রোবাসে করে টাকার বস্তা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীকে। আর এ কাজ হয়েছে তৃণমূল নেত্রী ও পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নির্দেশে।

সারদার টাকায় জামায়াত বাংলাদেশের সর্বত্র সরকারবিরোধী নাশকতার তাণ্ডব চালিয়েছে। এর আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ভারত সরকারের সাথে বাংলাদেশের তিস্তা চুক্তি যে হতে দেননি, সেটিও ঘটেছিল জামায়াতের নির্দেশে। আর এ কাজের নির্দেশনামা পৌঁছে দিয়েছেন তৃণমূল দলের সম্প্রতি নির্বাচিত হওয়া রাজ্যসভা সদস্য কলকাতার এক বাংলা দৈনিকের নির্বাহী সম্পাদক আহমদ হাসান ইমরান। এ রিপোর্ট ভারতের এক ইংরেজি দৈনিকের অনলাইন সংস্করণে বেশ ক’দিন আগে প্রথম প্রকাশ হওয়ার পর বাংলাদেশের একটি অনলাইন পত্রিকা ফলাওভাবে তা প্রচার করে। সেই অনলাইনের বরাত দিয়ে ‘চাঞ্চল্যকর’ খবরটি প্রকাশ করে ঢাকার বেশ কয়েকটি দৈনিক।


উপনির্বাচনের উত্তাপ
ভারতের বিগত লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপির সাড়া জাগানো জয়ের পর অতিসম্প্রতি উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বেশ ক’টি রাজ্যে। এসব উপনির্বাচনের বড় অংশ হচ্ছে রাজ্য বিধানসভার। বিধানসভার অনেক সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন লোকসভার সদস্য হিসেবে। সঙ্গত কারণেই তাদের পুরনো আসন ছেড়ে দিতে হচ্ছে। আবার বয়সের কারণে অথবা রোগশোকে মৃত্যুতেও কোনো কোনো আসনে উপনির্বাচন হচ্ছে। এসব উপনির্বাচন রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে ভারতের রাজনীতির জন্য। উত্তরপ্রদেশ রাজস্থান গুজরাট পশ্চিমবঙ্গ ছত্তিশগড় আসাম আর অন্ধ্রপ্রদেশে এসব উপনির্বাচন হয়েছে।

এর মধ্যে উত্তরপ্রদেশ রাজস্থান ও গুজরাটে যেখানে লোকসভা নির্বাচনে একতরফা সাফল্য পেয়েছিল বিজেপি, সেখানে এবারের উপনির্বাচনে ঘটছে তার ব্যতিক্রম। আশাবাদের পাহাড় তৈরি হয়েছিল মোদিকে কেন্দ্র করে লোকসভা নির্বাচনের আগে। হানিমুন সময়ে সেরকম উচ্ছ্বসিত হওয়ার মতো সাফল্য না আসায় অনেক স্থানে জনমতের হয়েছে থমকে যাওয়ার অবস্থা। উপনির্বাচনে ৩২টি বিধানসভা আসনের মধ্যে বিজেপি জয় পেয়েছে মাত্র ১৩টিতে। আর লোকসভার নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও উপনির্বাচনে হেরে গেছে এমন আসনসংখ্যা রয়েছে ১৩টি। এবারের উপনির্বাচনে কংগ্রেস যে সাতটি আসন পেয়েছে, তার মধ্যে পাঁচটিতে আগে বিজেপির জয় হয়েছিল। লোকসভার নির্বাচনে বিজেপি জিতেছিল এমন একটি আসনে এবার তৃণমূল জিতেছে।


বিগত লোকসভা নির্বাচনের জয়ের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় উত্তরপ্রদেশের একমাত্র লোকসভা আসনটি এবং ১১টি বিধানসভা আসনের মধ্যে আটটিতে জয়ী হয়েছে রাজ্যে ক্ষমতাসীন সমাজবাদী দল। মাত্র তিনটি আসনে জয় পেয়েছে বিজেপি। গুজরাটের লোকসভা নির্বাচনে যেখানে সব আসনে বিজেপি জিতেছিল, সেখানে উপনির্বাচনে ছয়টিতে বিজেপি আর তিনটিতে জয় পেয়েছে কংগ্রেস। রাজস্থানের উপনির্বাচনে বিজেপিকে বিপুল ভোটে হারিয়েছে কংগ্রেস। চারটি আসনের মধ্যে একটিতে বিজেপি আর তিনটিতে জয় পেয়েছে কংগ্রেস।
পশ্চিমবঙ্গের চৌরঙ্গি আর বশিরহাট বিধানসভা আসনে অনুষ্ঠিত হয় উপনির্বাচন। বশিরহাটে বিধানসভার এমপি ছিলেন সিপিআইএম-এর। অন্য দিকে চৌরঙ্গি এলাকায় বিগত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী বেশি ভোট পেয়েছিলেন। এই দুই আসনে জেতা হয়ে পড়ে লোকসভায় সর্বভারতে জয়ী বিজেপি আর পশ্চিমবঙ্গে বিজয়ী তৃণমূল কংগ্রেসের মর্যাদার লড়াই। এ নির্বাচনী লড়াইয়ে চৌরঙ্গি আসনে বিরাট ব্যবধানে বিজেপিকে পরাজিত করে তৃণমূল আর বশিরহাট আসনে ১৫ শ’র কিছু বেশি ভোটে তৃণমূলকে হারিয়ে জয় পায় বিজেপি। গত ১৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনের ঠিক আগেই কলকাতার আনন্দবাজার সারদা কেলেঙ্কারির পুরনো খবরটি করে শিরোনাম। সেই গোয়েন্দা সূত্রের খবর আর বাংলাদেশের মহাজোটের দুই এমপির বক্তব্য দিয়ে সাজানো হয় এ প্রতিবেদন। পশ্চিমবঙ্গ শাখার এক বিজেপি নেতার বক্তব্যও ছাপা হয় এ-সংক্রান্ত আনন্দবাজারের খবরে। এ ব্যাপারে ঝড় তোলা হয় আরো কয়েকটি পত্রিকায়।


সারদা তৃণমূল ও ইমরান
প্রথম দিকে সারদা নিয়ে প্রচারণা ধরনের প্রতিবেদনকে উপেক্ষা করে তৃণমূল ও রাজ্যসভার সদস্য আহমদ হাসান ইমরান। আনন্দবাজারের প্রধান খবর করার পর এর প্রতিবাদ আসে তৃণমূল কংগ্রেস, মুসলিম কমিউনিটি ও আহমদ হাসান ইমরানের পক্ষ থেকে। ইমরানের জন্ম বাংলাদেশে এমন তথ্যের প্রতিবাদ করে তার জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ, ভারতীয় স্কুল-কলেজে শিক্ষাগ্রহণ ও ২৬ বছর কলকাতায় সাংবাদিকতা জীবনের কথা উল্লেখ করেন ইমরান। ১৫ কোটি টাকা দিয়ে ইমরানের দৈনিক কলম পত্রিকার শেয়ার সারদা গ্রুপের কাছে বিক্রি করার তথ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই শেয়ার আসলে বিক্রি হয়েছে চার লাখ টাকায়। বাংলাদেশের তিস্তা চুক্তি নিয়ে দৌড়ঝাঁপ যখন শুরু হয়, তখন তিনি তৃণমূলের সদস্য ছিলেন না বলে উল্লেখ করে ইমরান জানান, বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে তার সম্পর্ক নেই। ভারতে বর্তমানে নিষিদ্ধ মুসলিম ছাত্র সংগঠন সিমির সাথে তিনি জড়িত ছিলেন ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত। তখন সেটি ছিল ভারতে বৈধ সংগঠন।এর বহু বছর পরে বিজেপি সরকার নিষিদ্ধ করে এ সংগঠনকে। আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক সময় যে আরএসএসের নেতা ছিলেন, সে সংগঠনকে ভারতে তিনবার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের একটি ফোরামও উল্লেখ করে ইমরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠানো হয়েছে তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক বলে।


মজার ব্যাপার হলো, পশ্চিমবঙ্গের একজন বিজেপি নেতা তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের পতনে সারদার মদদে লঙ্কাকাণ্ড বাধাতে ইমরান শুধু তৃণমূলের সাহায্য পেয়েছেন এমন নয়, কংগ্রেসের সাহায্যও তিনি নিয়েছেন। তা না হলে এত বড় কাণ্ড তার পক্ষে ঘটানো সম্ভব হতো না। এর মাধ্যমে এই বিজেপি নেতা এক সময়ের সিনিয়র কংগ্রেস নেতা ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সাথে ইমরানের সুসম্পর্কের প্রতি হয়তোবা ইঙ্গিত করে থাকতে পারেন।


ইমরানের সারদা সংযোগের বিষয়ে তার পত্রিকার ৮০ শতাংশ শেয়ার কিনে দৈনিকটি চালাতে বিনিয়োগ করা ছাড়া আর কোনো যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে না। তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার পর তিনি পরিণত হন লক্ষ্যবস্তুতে। তৃণমূলের সাথে মুসলিম সমর্থনের যোগসূত্র তৈরিতে ইমরানের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করে তৃণমূলের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।


বিগত লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির কৌশলের প্রধান দিক ছিল তৃণমূল কংগ্রেস ও মমতা ব্যানার্জিকে সারদা গ্রুপের সুবিধাভোগী হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে কুপোকাত করা। এ প্রচারণা চালিয়ে লোকসভা নির্বাচনের সময় খুব বেশি সুবিধা করা যায়নি, তবে বিজেপির ভোট বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এবারের প্রচারণায়ও যে খুব কাজ হয়েছে এমনটি মনে হয়নি। হলে চৌরঙ্গিতে বিজেপির প্রভাব খর্ব করে জয় পেত না তৃণমূল। আর বশিরহাটে সিপিআইএমের সিটে জয়ের কাছাকাছি পৌঁছতে পারত না দলটি।


২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার যে নির্বাচন সেটাকে সামনে রেখে বিজেপি এক দিকে মমতার সরকারকে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রমাণ করতে চাইছে, অন্য দিকে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের সহানুভূতি ও সমর্থন লাভের প্রয়োজন অনুভব করছে। এ ক্ষেত্রে তারা মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে সারদা কেলেঙ্কারিকে। সারদার কারণে পশ্চিমবঙ্গ আসাম ত্রিপুরা উড়িষ্যার বহু মানুষ একেবারে নিঃস্ব হয়েছে। তৃণমূলের মুসলিম সংসদ সদস্য আহমদ হাসান ইমরানকে সারদা কেলেঙ্কারির সাথে যুক্ত করে বিজেপি হয়তোবা মমতা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দুটোকে নিশানা বানাতে চেয়েছে।


সারদা কেলেঙ্কারি কিভাবে হলো?
সারদা গ্রুপের চেয়ারম্যান সুদীপ্ত সেন একসময় ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের নকশাল আন্দোলনের সাথে জড়িত। তখন তার নাম ছিল শঙ্করাদিত্য সেন। ’৯০-এর দশকের মাঝামাঝি শঙ্করাদিত্য প্লাস্টিক সার্জারি করে নিজেকে পাল্টে ফেলেন আর নাম পরিবর্তন করে হয়ে যান সুদীপ্ত সেন। এরপর তিনি দক্ষিণ কলকাতায় জমি উন্নয়নের ব্যবসার সাথে নিজেকে জড়ান। নতুন শতকের শুরুতে অবস্থা রমরমা হয়ে উঠলে তিনি এটাকে রূপান্তর করেন ল্যান্ড ব্যাংকে। এরপর এটাকে পরিবর্তন করেন উচ্চ মুনাফার লোভ দেখিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণের পোঞ্জি স্কিমে। এর পরে বাংলাদেশে ডেসটিনি যুবকের ক্ষেত্রে যেসব ঘটেছে, সেটিই হয়েছে সারদার ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং হিসেবে পরিচিত পোঞ্জি স্কিমের বৈশিষ্ট্য হলো এখানকার অর্থ যেসব খাতে বিনিয়োগ করা হয়, সেখানকার লাভের অংশ বিনিয়োগকারীদের দেয়ার পরিবর্তে প্রতিশ্রুত উচ্চ লাভ দেয়া হয় নতুন বিনিয়োগ থেকে। এতে এক ধরনের মোহ তৈরি হয় অসচেতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।

এভাবে বিনিয়োগ সংগ্রহ করার একপর্যায়ে নতুন বিনিয়োগ আর পাওয়া যায় না। অন্য দিকে আইনি কাঠামোর বাইরে এ ধরনের কাজ চলায় মিডিয়া ও অন্য নিয়ামক সংস্থার চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপ মোকাবেলা করতে ঘুষ উপঢৌকনের মতো অব্যবসায়িক খাতে ব্যয় বেড়ে যায়। একপর্যায়ে পুরো উদ্যোগটি ভেঙে পড়ে।


পশ্চিমবঙ্গ ও এর আশপাশের রাজ্যগুলোতে সারদার ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে। সারদার নেটওয়ার্ক সৃষ্টি ও এর বিকাশ শুরু হয় পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টের সময়। এটি ধীরে ধীরে পার্শ্ববর্তী আসাম ত্রিপুরা সিকিম এবং উড়িষ্যায় বিস্তৃত হয়। সারদার কর্ণধার সুদীপ্ত সেন যখন যে দল যে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে, সেই দলের নেতৃত্বের সাথে যোগসূত্র তৈরি করেছেন। সারদা বামফ্রন্টের আমলে অর্থমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের কার্যক্রম চালায়। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর দলটির সাত নেতার সাথে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। মমতার আঁকা ছবি কিনে নেয় উচ্চ মূল্যে। কংগ্রেস সরকারের অর্থমন্ত্রী চিদাম্বরমের স্ত্রীকে আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেয়। আসামের কংগ্রেস সরকারের একাধিক প্রভাবশালী নেতার সাথে স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা তৈরি করে সারদা।


তৃণমূল নেতা কুনাল ঘোষকে মিডিয়া উইংয়ের প্রধান করে ৯৮৮ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়। যার অধীনে পাঁচটি ভাষায় আটটি পত্রিকা এবং তারা বাংলা তারা নিউজসহ ছয়টি টিভি চ্যানেল ও একটি রেডিও রয়েছে। এসব মিডিয়ায় বিনিয়োগ উচ্চমূল্যে নেয়া বিনিয়োগের অর্থের আরো দ্রুত ক্ষয় ঘটায়। ভারতীয় সিকিউরিটি অ্যান্ড একচেঞ্জ বোর্ড (সিইবিআই) ২০১১ সালেই সারদার তহবিল সংগ্রহ চিট ফান্ড কার্যক্রম (নিয়মিত কিস্তি দেয়ার পরে এককালীন প্রাপ্তি) না হয়ে সিআইএস বা তহবিল সংগ্রহ কার্যক্রম বলে সতর্ক করে দেয়। সারদা আড়াই হাজার কোটি টাকার মতো তহবিল সংগ্রহ করে চিট ফান্ডের নামে। ২০১২ সালে এসে সারদার তহবিল সংগ্রহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে আর ২০১৩ সালের শুরুতে বিনিয়োগপ্রাপ্তি নিম্নগামী হয়ে পড়ে। বিনিয়োগের লাভ দেয়ার চাপ বাড়ে অস্বাভাবিকভাবে। সুদীপ্ত সেন ৬ এপ্রিল সিবিআইয়ের কাছে ১৮ পৃষ্ঠার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। আর ১০ এপ্রিল সহযোগী দেবজানি মুখার্জিকে নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। পরে কাশ্মির উপত্যকা থেকে দু’জন একসাথে ধরা পড়েন। এতে পুরো সারদা নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে এজেন্ট ও বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হন।

দক্ষিণ বারাসতসহ পশ্চিমবঙ্গের অনেক এলাকায় দোকানপাট ব্যবসায় বাণিজ্যে অচলাবস্থা নেমে সুনামির মতো বিরান অবস্থা দেখা দেয়। এরপর ভারতীয় গণমাধ্যমে সারদা কেলেঙ্কারি সংবাদের একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। এটিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের খেলাও জমে ওঠে। সারদার ক্ষতি থেকে একেবারে নিম্নবিত্তদের রক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের মমতা সরকার ৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ক্ষতির তুলনায় এটি ছিল একেবারেই অপ্রতুল।


সারদা ও সাহারা
সারদা ও সাহারা কেলেঙ্কারি প্রায় কাছাকাছি সময়ে ঘটেছে ভারতে। সারদার কেলেঙ্কারির সাথে আর্থিক সংশ্লেষ মনে করা হয় আড়াই হাজার কোটি রুপির মতো। অন্য দিকে সাহারাকে দুই হাজার ৪৪০ কোটি টাকা আমানতকারীদের ফেরত দিতে নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। সাহারা গ্রুপের চেয়ারম্যান সুব্রত রায় বাংলাদেশে অনেক পরিচিত ব্যক্তি। গ্রেফতারের কিছু সময় আগে চার দিনের বাংলাদেশ সফরে এসে সুব্রত রায় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের সাথে সাক্ষাৎ করে এখানে হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন।


মজার ব্যাপার হলো, সাহারা চেয়ারম্যান বাংলাদেশে আসার অনেক আগেই সাহারা গ্রুপের কার্যক্রম নিয়ে ভারতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো প্রশ্ন তোলে। সারদা যেভাবে তহবিল সংগ্রহ করেছে, সাহারার তহবিল সংগ্রহের পদ্ধতিও কাছাকাছি। সারদা চিট ফান্ডের নামে টাকা তুলেছে, আর সাহারা পূর্ণ রূপান্তরযোগ্য ডিভেঞ্চারের নামে টাকা তুলেছে। দুটোই প্রধানত ভূমি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে শুরু করা হয়েছে। দুটোই করা হয়েছে পোঞ্জি স্কিম স্টাইলে।


সাহারার প্রতারণা মামলার সূত্রপাত কিন্তু শুরু হয় ২০১০ সাল থেকে। সেই থেকে চলছে এখনো। ২০১০ সালের নভেম্বরে ভারতের সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড সাহারা ইন্ডিয়া রিয়েল এস্টেট করপোরেশন ও সাহারা ইন্ডিয়া হাউজিং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশনের পূর্ণ রূপান্তরযোগ্য ডিভেঞ্চারের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন অবৈধ বলে উল্লেখ করে। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে দিল্লি হাইকোর্ট ২৫ হাজার কোটি টাকার হাউজিং প্রকল্পের ব্যাপারে মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সাহারা চেয়ারম্যান সুব্রত রায় ও অন্য চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। পরের মাসে মামলার কার্যক্রম শুরু করেন আদালত।


পরবর্তী মে মাসে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেন। অক্টোবর ২০১১তে সিকিউরিটি আপিলাত ট্রাইব্যুনাল ছয় সপ্তাহের মধ্যে ১৫ শতাংশ মুনাফাসহ ১৭ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা ফেরতের নির্দেশ দেন সাহারাকে। নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট সেই নির্দেশ বহাল রাখেন। জানুয়ারি ২০১২তে টাকা ফেরত দিতে সুপ্রিম কোর্ট তিন সপ্তাহ সময় বেঁধে দেন। জুন ২০১২তে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে, সাহারার কোনো অধিকার নেই যে ডিভেঞ্চার দিয়ে ২৭ হাজার কোটি টাকার তহবিল তারা গঠন করতে পারে। আগস্ট ২০১২ সালে সুপ্রিম কোর্ট ২৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ফেরত দেয়ার জন্য সাহারা গ্রুপকে নির্দেশ দেন। টাকা ফেরত না দেয়ায় ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুব্রত রায়কে গ্রেফতার করা হয়।


সাহারা গ্রুপের বাংলাদেশ এবং শেখ হাসিনার সরকারের সংশ্লিষ্টতার বিষয় খুব পুরনো নয়। ২০১২ সালের মে মাসে ভারতে মামলায় নাকাল থাকা অবস্থায় সাহারা গ্রুপের চেয়ারম্যান সুব্রত রায় সাহারা চার দিনের বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। সাহারা গ্রুপ ছিল ভারতের ক্রিকেট দলের অফিশিয়াল স্পন্সর। তারা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের চার বছরের জন্য অফিশিয়াল স্পন্সর হতে দরপত্রে অংশ নিয়ে জয়ী হয়। এ জন্য পূর্ববর্তী স্পন্সর গ্রামীণফোন দর দেয় তিন দশমিক চার মিলিয়ন মার্কিন ডলার। রবি দর দেয় চার মিলিয়ন ডলার। আর সাহারা গ্রুপ নয় দশমিক চার মিলিয়ন ডলার দর দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের স্পন্সরশিপ পায় (সূত্র : ইএসপিএন ক্রিকইনফো, ৩১ মে ২০১২)।


এ সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল। তিনি বলেন, ‘সাহারা গ্রুপ বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের জন্য বছরে দুই দশমিক তিন মিলিয়ন ডলার দেবার প্রস্তাব করেছে তাই নয়, আমরা আশা করছি ক্রিকেট অ্যাকাডেমি স্পন্সরশিপ রাইটের জন্য বছরে আরো এক লাখ ৩০ হাজার ডলার করে দেবে সাহারা। কয়েক বছর আগেও এটি ছিল কল্পনার অতীত।’ এর পরের উচ্ছ্বাসটি বেশ উল্লেখযোগ্য। মোস্তফা কামালের মন্তব্য ছিল, ‘সাহারা যদি আমাদের সাথে থাকে এটিই হবে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর টার্নিং পয়েন্ট। ভারতীয় জাতীয় ক্রিকেট দলের জার্সিতে সাহারার যে লোগো শোভা পাচ্ছে, সেই একই লোগো বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের জার্সিতেও শোভা পেতে পারে।’ এ সময়ের বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে এসব বক্তব্য গুরুত্বের সাথে প্রকাশ হয়।


২০১২ সালের ২৫ মে সাহারা চেয়ারম্যানের বাংলাদেশ সফরকালে সাহারা ইন্ডিয়া পরিবার বাংলাদেশের আবাসন ও অবকাঠামো খাতে প্রবেশ করতে বাংলাদেশ সরকারের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। সাহারা মাতৃভূমি উন্নয়ন করপোরেশন লিমিটেড গঠন করা হয় ঢাকার চার পাশে আবাসন ও সমন্বিত শহর তৈরির জন্য। এ জন্য সাহারাকে এক লাখ একর জমি অধিগ্রহণ করে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। তারা এর পরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য খাতে এবং জনকল্যাণমূলক অন্যান্য খাতে প্রবেশের ইচ্ছার কথাও ঘোষণা করে। সমঝোতা স্মারকের এই অনুষ্ঠানে তখনকার পূর্ত প্রতিমন্ত্রী, রাজউক চেয়ারম্যান ও পদস্থ আমলারা উপস্থিত ছিলেন।


বর্তমানে ভারতের কারাগারে বন্দী সাহারা চেয়ারম্যানের সাথে বিনিয়োগ ও অর্থায়ন ইস্যু নিয়ে তখন বাংলাদেশের বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. এস এ সামাদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান ও পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বৈঠক করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথেও সাক্ষাৎ করেন সাহারা চেয়ারম্যান সুব্রত রায়, যার ছবি তখন সংবাদপত্রে প্রকাশিতও হয়।
সাহারা গ্রুপের আবাসন খাতে বিশাল বিনিয়োগ প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে রিহ্যাবের সাথেও বৈঠক করেন সুব্রত রায়। বর্তমানে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সে সময় রিহ্যাবের সভাপতি হিসেবে তার সাথে বৈঠকটি করেন। আবাসন ছাড়াও পাঁচতারা হোটেলসহ আরো বেশ কিছু খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব করে সাহারা গ্রুপ। সে সময় রয়টার্সের খবরে বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয় সাহারা বাংলাদেশের কোন কোন খাতে বিনিয়োগ করবে। তখন বাংলাদেশের প্রধান প্রধান দৈনিকগুলোতে সাহারার বিজ্ঞাপন ছাপানো হয় বড় আকারে। বাংলাদেশের চার দিনের ঘটনাবহুল সফরের পর বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে সাহারা চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে ব্যবসায়িক স্বার্থ বিস্তৃত করতে পেরে আমি গর্বিত। বাংলাদেশ সরকার বিস্ময়কর ধরনের সহায়তা দিচ্ছে এ ব্যাপারে। আর এটি বাংলাদেশকে উন্নয়ন অভিমুখে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।’


 
সরকারের সারদা কৌশল
ভারতের বিজেপির না হয় ভবিষ্যতে নির্বাচনে জেতার একটি কৌশল ছিল। কিন্তু গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে বাংলাদেশের সরকার সারদা মামলায় নিজেকে যুক্ত করে কী অর্জন করতে চাইল। সারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে একাধিক কৌশল থাকতে পারে বাংলাদেশ সরকারের সামনে। প্রথমত, বিজেপি যেহেতু পশ্চিমবঙ্গের এবারের উপনির্বাচন ও আগামী বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে সারদাকে দিয়ে মমতাকে আঘাত করার কৌশল নিয়েছে, সেহেতু তাতে কিছু মরিচ মসলার জোগান দেয়া গেলে বিজেপির সাথে বর্তমান সরকারের কৌশলগত সম্পর্ক নির্মাণে অগ্রগতি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জির সাথে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত যে টানাপড়েন তার একটি প্রতিশোধও এর মাধ্যমে নেয়া যেতে পারে।

এ কৌশলে পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগুরু জনমতকে প্রভাবিত করা গেলে তাতে মমতার ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে। তৃতীয়, সারদা কেলেঙ্কারির সাথে বাংলাদেশের সরকারবিরোধী আন্দোলনের যোগসূত্রের বিষয়টি বাজারজাত করা সম্ভব হলে এখনকার সরকার পতনের আন্দোলনকে ষড়যন্ত্রের বহি:প্রকাশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে। চতুর্থত, ভারত-বাংলাদেশের কট্টর ধারার মুসলিমদের যোগসূত্রের ব্যাপারে ধারণা তৈরি করা গেলে আলকায়েদার যে হুমকি সম্প্রতি প্রচারিত হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ভারতের সরকারের সাথে অংশীদারিত্ব সৃষ্টি করতে সক্ষম হতে পারে।


এর পাশাপাশি সারদা খেলা বাংলাদেশ সরকারের জন্য অনেক ঝুঁকির কারণও হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের সরকারের সমর্থন ছাড়া বাংলাদেশ ভারতের সাথে সীমান্ত চুক্তি বা তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারবে না। মমতা ও তার দলের বিরুদ্ধে সারদা কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে যে তিক্ততা সৃষ্টি হলো, তাতে এসব চুক্তিতে সম্মত সহজে আর মমতাকে করানো নাও যেতে পারে। এ ছাড়া তৃণমূল ও মমতার বিরুদ্ধে হাসিনা সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ যেভাবে কামান দাগানো শুরু করেছে, তাতে পাল্টা পদক্ষেপও নিতে পারে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এতে সরকারের বিব্রত হওয়ার মতো অনেক কিছু ফাঁস হয়ে যেতে পারে। কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশের উপরাষ্ট্রদূত আবিদাকে ডেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা তেমন কোনো আভাস দিয়ে থাকতে পারেন বলে অনেকের ধারণা।
 
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ঝুঁকি
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে পছন্দ করেন। এই প্রবণতার কারণে ইতোমধ্যেই বিশ্বের শীর্ষপর্যায়ের অনেক পশ্চিমা দেশের সাথে সরকারের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এর ফল নানাভাবে সরকারকে ভোগও করতে হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের সাথে দীর্ঘ স্থলসীমানায় ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সরকারের সাথে যে ধরনের বিরোধে সরকার জড়িয়ে পড়ছে, তার মূল্য হয়ে দাঁড়াতে পারে অনেক চড়া। সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে যারা কাজ করেন আর প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেন, তারা এসব দিককে কতটা বিবেচনায় এনেছেন তাতে সন্দেহ সৃষ্টি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। প্রশ্ন উঠতেই পারে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে কেন নিজের নাক কাটতে হবে আমাদের?
source : http://www.onnodiganta.com/article/detail/3371#.VBusjFd4DMy

Saturday, September 13, 2014

অরাজনৈতিক সাংসদ "দোদুল" এর যত ভুল

মেহেরপুর-১ (সদর) আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ ফরহাদ হোসেন অরাজনৈতিক ব্যক্তি হওয়ায় দল আজ পথে বসেছে। নেতা-কর্মীরা রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে উৎসাহ হারিয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জাতীয় শোক দিবসের মতো কর্মসূচিতেও সাংসদ যোগ দেননি।
গতকাল শনিবার দুপুর ১২টার দিকে জেলা শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে আয়োজিত জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মিয়াজান আলী এ অভিযোগ করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, মঞ্চে জেলা, মুজিবনগর ও গাংনী উপজেলা আওয়ামী লীগ এবং যুবলীগের নেতা-কর্মীরা থাকলেও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের কোনো নেতা নেই। সভায় শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ইয়ারুল ইসলামের ওপর থেকে (সংসদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায়) বহিষ্কারাদেশ তুলে নেওয়া হয়।
সভায় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক সাংসদ জয়নাল আবেদীন বর্তমান সাংসদের সমালোচনা করে বলেন, ‘সাংসদ ঢাকায় শিক্ষকতা করতেন। এলাকার রাজনীতির সঙ্গে তিনি কখনোই সম্পৃক্ত ছিলেন না। ঢাকায় অবস্থানের কারণে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তিনি ব্যর্থ হচ্ছেন। সবকিছুর নিয়ন্ত্রক বনে গেছেন সাংসদের ঘনিষ্ঠজনেরা।’
এ প্রসঙ্গ টেনে মেহেরপুর শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ইয়ারুল ইসলাম বলেন, অরাজনৈতিক ব্যক্তি হওয়ায় সাংসদ রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি তোয়াক্কা করেন না। তাই টেন্ডারবাজি, হাট-ঘাট-বাজার দখল ও ইজারা, শহরের প্রাণকেন্দ্রে অন্যের ভবন ভেঙে কোটি টাকার জমি দখল, পল্লী বিদ্যুৎ অফিস নিয়ন্ত্রণের নামে প্রতিটি বিদ্যুৎ লাইন সংযোগে ঘুষ গ্রহণ, নিয়োগ-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের পরিচালনা কমিটি ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কমিটি সাংসদের আত্মীয়স্বজন দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। সাংসদের অবর্তমানে এসব কিছুর নিয়ন্ত্রক তাঁর ভগ্নিপতি (জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি) আবদুস সামাদ বাবলু বিশ্বাস।
এদিকে নির্বাহী কমিটির এই সভাকে অগঠনতান্ত্রিক এবং অবৈধ দাবি করে আওয়ামী লীগের একাংশের নেতারা গতকাল সন্ধ্যা ছয়টায় আবদুস সামাদ বাবলু বিশ্বাসের বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় আবদুস সামাদ বাবলু বিশ্বাস বলেন, আগের সাংসদের মতো বর্তমান সাংসদ ও তিনি দলে ক্যাডার, সন্ত্রাসী, দখলবাজ, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজদের প্রশ্রয় দেন না। এ কারণে একটি চক্রটি সাংসদের স্বচ্ছ রাজনীতিকে দুর্নীতির সঙ্গে তুলনা করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম রসুল বলেন, যাঁরা বিগত জাতীয় সংসদ ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিরোধিতা করেছিলেন, আজ তাঁরাই নির্বাহী কমিটির সভা ডেকে আওয়ামী লীগ সাজছে।
এ সময় জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আসকার আলী ও সাংগঠনিক সম্পাদক আনারুল ইসলাম, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাফুয়ান আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক বারিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
সাংসদ ফরহাদ হোসেনের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অরাজনৈতিক লোককে সাংসদ বানানোর কারনে ভরাডুবিতে মেহেরপুর জেলা আওয়ামীলীগ । দলের কোন কর্মকাণ্ডে কর্মীরা অংশ নিচ্ছেন না ঠিকমত । কর্মীরা বলছেন সাংসদ এর কাছে কোন দাবী নিয়ে গেলে সাহায্য তো দুরের কথা তিনি তাদের চিন্তেই পারেন না । তাছাড়া কর্মী সমাবেশ ও হয় নাই তিনি সাংসদ হবার পর থেকে ।
সুত্র ঃ প্রথম আলো

Thursday, August 28, 2014

মতু'র কুকর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা মানেই মৃত্যু

কিলার মতু এবার মারতে চাইলেন  যুবলীগ নেতা ও মেহেরপুর ৭,৮ ও ৯ ওয়ার্ড মহিলা কাউন্সিলর এর ছেলে বাপ্পি খান কে । বাপ্পি খান  এ ব্যাপার এ নিজের মরার জন্য মতুকে দায়ী করে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট ও দিয়েছেন , তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন মতু এর কুকর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা মানেই মৃত্যু । এর আগেও মতু'র কুকর্মের বিরুদ্ধে কথা বলাই তার বলি হতে হয়েছে অনেকে ( যেমন দুই নাম্বার ওয়ার্ড কাউন্সিলর রিপন ) এবং চাকরি হারায়েছেন অনেক লোক । তিনি বলেন সম্প্রতি মতু এর কুকর্মের বিরুদ্ধে কথা বলাই তিনিও পৌরসভার চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়ে আছেন এবং তাকে প্রান নাশের হুমকি ও দিয়েছেন । তিনি আরও বলেন লোক চক্ষু এর অন্তরালে পৌরসভার চলছে রমরমা  ব্যবসা । নিজের লোক দের দিয়ে চলছে সব টিকাদারি কাজ , প্রোজেক্ট এর টাকা এর কোন হিসাব নেই , যন্ত্রাংশ কেনার জন্য হাতিয়েছেন অনেক টাকা , তার ভাই মুন্তাসুর পৌরসভার অনেক কাজ সমাপ্ত না করেই তুলে নিয়েছেন সব টাকা । তিনি বলেন পৌরসভায় তার এই কার্যকলাপ সবাই জানে কিন্তু মৃত্যু ভয়ে কেউ কিছুই বলে না , সম্প্রতি নয় জন কাউন্সিলর মিলে তার বিরুদ্ধে শক্ত  অবস্থান নিয়েছেন বলে তাদের বিরুদ্ধে ও মামলা দিয়ে তাদের দাবানোর চেষ্টা করছেন এবং এই জন্য উপর মহল এ নিয়মিত যাতায়াত ও করছেন মতু ।

Thursday, June 26, 2014

এক যুগ ধরে মেহেরপুর জেলা শিবির এর সাবেক সভাপতি একই মাথে দুই কলেজে অধ্যক্ষ পদে চাকুরীতে বহাল

এক যুগ ধরে মেহেরপুর জেলা শিবির এর সাবেক সভাপতি ও মেহেরপুরের এক জামায়াত নেতা একই মাথে দুই কলেজে অধ্যক্ষ পদে চাকুরীতে বহাল রয়েছে। আওয়ামীলীগ সরকার পতন করার মেহেরপুরের আবরোধের রূপকার কয়েক টি মামলার আসামী হলে ও   এক আওয়ামী লীগ নেতার আর্শিবাদে জামীনে  বহাল তবহিতে রয়েছে এবং একই মাথে দুই কলেজে অধ্যক্ষ পদে চাকুরীতে করে যাচ্ছে।গত বিএনপি সরকার আমলের প্রথম দিকে মেহেরপুর জেলা জামায়াত ইসলামের উদ্দ্যোগে  মেহেরপুর শহরের প্রান কেন্দ্রে জিনিয়াস ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজ এবং মুজিবনগর উপজেলার রতনপুরে  আল নুর টেকনিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই প্রতিষ্টালগ্নে থেকে মেহেরপুর জেলা শিবির এর সাবেক সভাপতি ও মেহেরপুর জামায়াত ইসলামের সূরা সদস্য আল আমীন ইসলাম বকুল  একই মাথে