Tuesday, August 5, 2025
জুলাই ঘোষণাপত্র
১। যেহেতু উপনিবেশ বিরোধী লড়াইয়ের সুদীর্ঘকালের ধারাবাহিকতায় এই ভূখণ্ডের মানুষ দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল এবং নির্বিচার গণহত্যার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করে জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল;
এবং
২। যেহেতু, বাংলাদেশের আপামর জনগণ দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই ভূখণ্ডে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বিবৃত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতে উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে;
এবং
৩। যেহেতু স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন পদ্ধতি, এর কাঠামোগত দুর্বলতা ও অপপ্রয়োগের ফলে স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধের জন আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল এবং গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন করেছিল;
এবং
৪। যেহেতু স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীনতার মূলমন্ত্র গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিপরীতে বাকশালের নামে সাংবিধানিকভাবে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করে এবং মতপ্রকাশ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ করে, যার প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশে সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লব সংঘটিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে একদলীয় বাকশাল পদ্ধতির পরিবর্তে বহুদলীয় গণতন্ত্র, মতপ্রকাশ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রবর্তনের পথ সুগম হয়,
এবং
৫। যেহেতু আশির দশকে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় বছর ছাত্র-জনতার অবিরাম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং ১৯৯১ ইং সনে পুনরায় সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।
এবং
৬। যেহেতু দেশি-বিদেশি চক্রান্তে সরকার পরিবর্তনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় ১ / ১১-এর ষড়যন্ত্রমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার একচ্ছত্র ক্ষমতা, আধিপত্য ও ফ্যাসিবাদের পথ সুগম করা হয়;
এবং
৭। যেহেতু গত দীর্ঘ ষোলো বছরের ফ্যাসিবাদী, অগণতান্ত্রিক এবং গণবিরোধী শাসনব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে এবং একদলীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অতি উগ্র বাসনা চরিতার্থ করার অভিপ্রায়ে সংবিধানের অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক পরিবর্তন করা হয় এবং যার ফলে একদলীয় একচ্ছত্র ক্ষমতা ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়;
এবং
৮। যেহেতু শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসন, গুম-খুন, আইন-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং একদলীয় স্বার্থে সংবিধান সংশোধন ও পরিবর্তন বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে ধ্বংস করে;
এবং
৯। যেহেতু, হাসিনা সরকারের আমলে তারই নেতৃত্বে একটি চরম গণবিরোধী, একনায়কতান্ত্রিক, ও মানবাধিকার হরণকারী শক্তি বাংলাদেশকে একটি ফ্যাসিবাদী, মাফিয়া এবং ব্যর্থ রাষ্ট্রের রূপ দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে;
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। আজ মঙ্গলবার (৫ আগস্ট, ২০২৫) রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। আজ মঙ্গলবার (৫ আগস্ট, ২০২৫) রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেছবি: দীপু মালাকার
এবং
১০। যেহেতু, তথাকথিত উন্নয়নের নামে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী নেতৃত্বে সীমাহীন দুর্নীতি, ব্যাংক লুট, অর্থ পাচার ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের মধ্য দিয়ে বিগত পতিত দুর্নীতিবাজ আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশ ও এর অমিত অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং এর পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য ও জলবায়ুকে বিপন্ন করে;
এবং
১১। যেহেতু শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দল, ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনসহ সমাজের সর্বস্তরের জনগণ গত প্রায় ষোলো বছর যাবৎ নিরন্তর গণতান্ত্রিক সংগ্রাম করে জেল-জুলুম, হামলা-মামলা, গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়;
এবং
১২। যেহেতু বাংলাদেশে বিদেশি রাষ্ট্রের অন্যায় প্রভুত্ব, শোষণ ও খবরদারিত্বের বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষের ন্যায়সংগত আন্দোলনকে বহিঃশক্তির তাঁবেদার আওয়ামী লীগ সরকার নিষ্ঠুর শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে দমন করে;
এবং
১৩। যেহেতু অবৈধভাবে ক্ষমতা অব্যাহত রাখতে আওয়ামী লীগ সরকার তিনটি প্রহসনের নির্বাচনে (২০১৪,২০১৮ ও ২০২৪ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন) এ দেশের মানুষকে ভোটাধিকার ও প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত করে;
এবং
১৪। যেহেতু, আওয়ামী লীগ আমলে ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, শিক্ষার্থী ও তরুণদের নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করা হয় এবং সরকারি চাকরিতে একচেটিয়া দলীয় নিয়োগ ও কোটাভিত্তিক বৈষম্যের কারণে ছাত্র, চাকরি প্রত্যাশী ও নাগরিকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম হয়;
এবং
১৫। যেহেতু বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের ওপর চরম নিপীড়নের ফলে দীর্ঘদিন ধরে জনরোষের সৃষ্টি হয় এবং জনগণ সকল বৈধ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই চালিয়ে যায়;
এবং
১৬। যেহেতু, সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থার বিলোপ ও দুর্নীতি প্রতিরোধে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ব্যাপক দমন-পীড়ন, বর্বর অত্যাচার ও মানবতাবিরোধী হত্যাকাণ্ড চালানো হয়, যার ফলে সারা দেশে দল-মত নির্বিশেষে ছাত্র-জনতার উত্তাল গণবিক্ষোভ গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়;
এবং
১৭। যেহেতু ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে অদম্য ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক দল, ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী, শ্রমিক সংগঠনসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষ যোগদান করে এবং আওয়ামী ফ্যাসিবাদী বাহিনী রাজপথে নারী-শিশুসহ প্রায় এক হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে, অগণিত মানুষ পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্ব বরণ করে এবং আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে সামরিক বাহিনীর সদস্যগণ জনগণের গণতান্ত্রিক লড়াইকে সমর্থন প্রদান করে;
এবং
১৮। যেহেতু, অবৈধ শেখ হাসিনা সরকারের পতন, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের লক্ষ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে জনগণ অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে, পরবর্তী সময়ে ৫ আগস্ট ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ পরিচালনা করে এবং ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনরত সকল রাজনৈতিক দল, ছাত্র-জনতা তথা সর্বস্তরের সকল শ্রেণি, পেশার আপামর জনসাধারণের তীব্র আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে গণভবনমুখী জনতার উত্তাল যাত্রার মুখে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়;
এবং
১৯। যেহেতু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলায় গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ব্যক্ত জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রত্যয় ও প্রয়োগ রাজনৈতিক ও আইনি উভয় দিক থেকে যুক্তিসংগত, বৈধ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত;
এবং
২০। যেহেতু জনগণের দাবি অনুযায়ী এরপর অবৈধ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের মতামতের আলোকে সাংবিধানিকভাবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়;
এবং
২১। যেহেতু, বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণের ফ্যাসিবাদবিরোধী তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদ, বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের অভিপ্রায় প্রকাশিত হয়;
এবং
২২। সেহেতু, বাংলাদেশের জনগণ সুশাসন ও সুষ্ঠু নির্বাচন, ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ, আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বিদ্যমান সংবিধান ও সকল রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক সংস্কার সাধনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে;
এবং
২৩। সেহেতু, বাংলাদেশের জনগণ বিগত ষোলো বছরের দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম কালে এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালীন সময়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক সংঘটিত গুম-খুন, হত্যা, গণহত্যা, মানবতা বিরোধী অপরাধ ও সকল ধরনের নির্যাতন, নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি লুণ্ঠনের অপরাধসমূহের দ্রুত উপযুক্ত বিচারের দৃঢ় অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে;
এবং
২৪। সেহেতু, বাংলাদেশের জনগণ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সকল শহীদদের জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণা করে শহীদদের পরিবার, আহত যোদ্ধা এবং আন্দোলনকারী ছাত্রজনতাকে প্রয়োজনীয় সকল আইনি সুরক্ষা দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে।
এবং
২৫। সেহেতু, বাংলাদেশের জনগণ যুক্তিসংগত সময়ে আয়োজিতব্য অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদে প্রতিশ্রুত প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশের মানুষের প্রত্যাশা, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আইনের শাসন ও মানবাধিকার, দুর্নীতি, শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে।এবং
২৬। সেহেতু বাংলাদেশের জনগণ এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছে যে একটি পরিবেশ ও জলবায়ু সহিষ্ণু অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন কৌশলের মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার সংরক্ষিত হবে।
এবং
২৭। বাংলাদেশের জনগণ এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে যে, ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪-এর উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হবে এবং পরবর্তী নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের সংস্কারকৃত সংবিধানের তফসিলে এ ঘোষণাপত্র সন্নিবেশিত থাকবে।
এবং
২৮। ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে বিজয়ী বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে এই ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হলো।
Wednesday, March 23, 2022
ধর্ষণের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আকিফ
২১ মার্চ ২০২২, ০৭ চৈত্র ১৪২৮, ১৭ শাবান ১৪৪৩, নয়া দিগন্ত
ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে সংগঠন থেকে বহিষ্কার হয়েছেন ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আকিফ আহমেদ।
গত ২০ মার্চ দায়ের অভিযোগ ও অভিযুক্তের স্বীকারোক্তিমূলক পদত্যাগপত্রের ভিত্তিতে সোমবার অভিযুক্তের বিরুদ্ধে এ বহিষ্কারাদেশ দেন সংগঠনটির উর্ধ্বতন নেতারা।
অভিযুক্তের বিরুদ্ধে লিখিত বহিষ্কারাদেশে অভিযোগ এবং স্বীকারোক্তি বিবেচনায় ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের ৩৪তম কার্যনির্বাহী পরিষদের দ্বিতীয় সভায় গঠনতন্ত্রের ধারা মোতাবেক অভিযুক্ত আকিফ আহমেদকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সিদ্ধান্ত মোতাবেক, সংগঠনের যেকোনো স্তরের যেকোনো কার্যক্রমের সাথে অভিযুক্ত আকিফ আহমেদের সংশ্লিষ্টতা অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
অভিযোগকারী আগামীতে যেকোনো (আইনি) পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চাইলে ছাত্র ইউনিয়ন সর্বোচ্চ সহযোগিতামূলক আচরণ প্রদর্শন করবে বলেও জানানো হয়।
বিষয়টি সম্পর্কে অভিযুক্ত আকিফ আহমেদ বলেন, এক বছর আগে তার সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক থাকাকালে এমন কিছু হয়েছিল। পরবর্তীতে আমরা আবার রিলেশনে যাই এবং দু’জনের মাঝে বনাবনি না হওয়ায় ২ মাস আগে আবার সম্পর্কচ্ছেদ হয়। এখন তার অন্য একটা ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে যার সাথে আমার ছাত্র ইউনিয়ন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের বিরোধ রয়েছে। তাই বলা যায়, ছাত্র ইউনিয়নে আমার দায়িত্ব গ্রহণের এ সময়ে এক বছরের পুরনো বিষয়ে অভিযোগ আনার পেছনে কোনো তৃতীয় ব্যক্তির স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখলে অনেক কিছুই বের হয়ে আসবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক আদনান বলেন, এক বছরের পুরনো হোক আর ১০ বছর হোক, ভুক্তভোগী যেকোনো সময় চাইলে অভিযোগ করতে পারে। এখন এ বিষয়ে আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ এসেছে এবং একইসাথে অভিযুক্তের লিখিত পদত্যাগপত্রও এসেছে। এ দু’য়ের সমন্বয়ে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, অভিযুক্ত আসলেই অপরাধী। তাই সাংগঠনিক জায়গা থেকে তাকে বহিষ্কার করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি শিমুল কুম্বকার বলেন, আমরা একটা অভিযোগ পেয়েছি এবং অভিযুক্ত তার দায় স্বীকার করেছেন। অভিযোগ ও অভিযুক্তর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আমরা সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় তাকে বহিষ্কার করেছি।
এক বছরের পুরনো ঘটনা টেনে এনে অন্য কেউ এখানে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হ্যাঁ, এখানে এমন কিছু থাকতেই পারে। তবে অভিযুক্তের স্বীকারোক্তির কারণে আমাদের সেই বিষয়ে তদন্তের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ফলে আমরা আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে বাধ্য হই।
উল্লেখ্য যে : আকিফ আহমেদ মেহেরপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ অরুন এর ভাই মেহেরপুর সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এবং মেহেরপুর সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মারুফ হোসেন বিজনের একমাত্র ছেলে
Friday, September 24, 2021
বিশ্বখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট শহীদ অধ্যাপক ডাঃ ফজলে রাব্বি।
লেখক : Dr. Zafrullah Chowdhury স্যার এর ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া
এই ফজলে রাব্বি তিনি, সমগ্র পাকিস্তানকে সাত বার আটি দরে বিক্রি করলেও তাঁর মস্তিষ্কের দাম উঠবে না৷ সেই ফজলে রাব্বি তিনি যিনি হতে পারতেন বাংলাদেশের প্রথম নোবেলজয়ী চিকিৎসা বিজ্ঞানী।তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিকেলের এমবিবিএস চূড়ান্ত পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অধিকারী ছাত্র। মাত্র ৩২ বছর বয়সে ১৯৬৪ সালে মেডিসিনের উপর তাঁর বিখ্যাত কেস স্টাডি 'A case of congenital hyperbilirubinaemia ( DUBIN-JOHNSON SYNDROME) in Pakistan' প্রকাশিত হয়েছিলে বিশ্বখ্যাত গবেষণা জার্নাল 'জার্নাল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন হাইজিন' এ।
মাত্র ৩৮ বছর বয়সে ১৯৭০ সালে তাঁর বিশ্বখ্যাত গবেষণা Spirometry in tropical pulmonary eosinophilia প্রকাশিত হয়েছিলো ব্রিটিশ জার্নাল অফ দা ডিসিস অফ চেস্ট ও ল্যান্সেট এ।
১৯৭০ সালে মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই ডাঃ ফজলে রাব্বি মনোনীত হয়েছিলেন পাকিস্তানের সেরা অধ্যাপক পুরস্কারের জন্য। কিন্তু তাঁর আত্মায় ছিলো বাংলার অসহায়র্ত মানুষ। ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছিলেন তিনি সেই পুরুষ্কার।
মাত্র ৩৯ বছর বয়সী ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রফেসর অব ক্লিনিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড কার্ডিওলজিস্ট। আজকের দিনে কল্পনা করা যায়?
মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় তিনি আহত মানুষদের সেবা দিয়েছেন মেডিকেলে বসে। বেশ কয়েকদফা নিজের সাধ্যের চেয়ে বেশী ঔষধ আর অর্থ সহায়তা দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় গোপন রেখে দিয়েছিলেন চিকিৎসাও।
মুক্তিযুদ্ধের ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর ডাঃ ফজলে রাব্বির স্ত্রী জাহানারা রাব্বী একই স্বপ্ন দুবার দেখলেন। স্বপ্নটা এমন একটা সাদা সুতির চাদর গায়ে তিনি তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে জিয়ারত করছেন এমন একটা জায়গায়, যেখানে চারটা কালো থামের মাঝখানে সাদা চাদরে ঘেরা কী যেন।
১৫ই ডিসেম্বর সকালে জাহানারা রাব্বী এ স্বপ্নের কথা বললেন ফজলে রাব্বিকে। রাব্বি বললেন, ‘তুমি বোধ হয় আমার কবর দেখেছ’। ভয় পেলেন জাহানারা রাব্বি। টেলিফোন টেনে পরিচিত অধ্যাপকদের বাড়িতে ফোন করতে বললেন।
ফজলে রাব্বি ফোন করলেন, কিন্তু কাউকেও লাইনে পাওয়া যাচ্ছেনা।
আকাশে তখন ভারতীয় যুদ্ধবিমান। রকেট, শেলের শব্দে কান ঝালাপালা। সকাল ১০টায় ২ ঘন্টার জন্য কারফিউ উঠলো। ফজলে রাব্বি স্ত্রীকে বললেন, 'একজন অবাঙালি রোগী দেখতে যাবো পুরান ঢাকায়।' যেতে মানা করলেন জাহানারা রাব্বি।
ফজলে রাব্বি কথার এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন ‘ভুলে যেয়ো না, ওরাও মানুষ।’
সেদিন তিনি ফিরেছিলেন কারফিউ শুরু হওয়ার আগেই।
দুপুরের খাবার ছিলো আগের দিনের বাসি তরকারি। কিন্তু ফজলে রাব্বি উল্টো বলেছিলেন, ‘আজকের দিনে এত ভালো খাবার খেলাম।’
জাহানারা রাব্বি দেখলেন এখানে থাকা বিপজ্জনক। তিনি বললেন, চলো চলে যাই। ফজলে রাব্বি বলেছিলেন 'আচ্ছা, দুপুরটা একটু গড়িয়ে নিই।’
কিছুক্ষণ পর বাবুর্চি এসে বললো ‘সাহেব, বাড়ি ঘিরে ফেলেছে ওরা।’
বাইরে তখন কাদালেপা মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে। মাইক্রোবাসের সামনে রাজাকার, আলবদর আর হানাদারেরা।
খুব হালকা স্বরে ফজলে রাব্বি জাহানারা রাব্বিকে বলেছিলেন, ‘আমাকে নিতে এসেছে।’ এরপর
দারোয়ানকে গেট খুলে দিতে বলেছিলেন তিনি। যখন মাইক্রোবাসে তিনি উঠলেন তখন সময় ঘড়িতে বিকেল চারটা।
১৮ই ডিসেম্বর ডাঃ ফজলে রাব্বির লাশটি পাওয়া গিয়েছিলো রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। দুই চোখ উপড়ানো। সমগ্র শরীরে জুড়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আঘাতের চিহ্ন। দু হাত পিছনে গামছা দিয়ে বাঁধা। লুঙ্গিটা উরুর উপরে আটকানো। তাঁর হৃদপিন্ড আর কলিজাটা ছিঁড়ে ফেলেছে হানাদার ও নিকৃষ্ট আলবদরেরা।
এই সেই ডাঃ ফজলে রাব্বি, যাঁর গোটা হৃদয় জুড়ে ছিলো বাংলাদেশ আর অসহায়র্ত মানুষ। যার হৃদয় জুড়ে ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন। হানাদার ও আল বদরের ঘৃণ্য নরপিশাচেরা সেই হৃদয়কে ছিঁড়ে ফেললেই কি সমগ্র বাংলার মানুষের হৃদয় থেকে কি তাঁকে বিছিন্ন করা যায়। যায়না। হাজার বছর পরেও ডাঃ ফজলে রাব্বি থাকবেন আমাদের প্রাণে, হৃদয়ের গহীনে।
আজ কিংবদন্তি চিকিৎসক ও বুদ্ধিজীবি শহীদ অধ্যাপক ডাঃ ফজলে রাব্বির জন্মদিন। জন্মদিনে নতচিত্তে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই কিংবদন্তি চিকিৎসককে। আমাদের ফজলে রাব্বিকে আল্লাহ যেন বেহেশত নসীব করেন - আমীন
Thursday, February 18, 2021
দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবি
জানুয়ারি ৬৯ এ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করে। এই ধর্মঘটে পুলিশ বাধা দেয় এবং ছাত্রদের ওপর চরম নির্যাতন চালায়। এর প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে আসে। ছাত্রদের রাজপথের এই মিছিলে গুলি চলে। পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান ( শহীদ আসাদ ) আহত হন এবং হাসপাতালে নেয়ার পথেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে সমগ্র দেশে সূচিত হয় দুর্বার আন্দোলন, স্বাধীনতার আন্দোলন ।
এর মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলার মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি অবস্থায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গুলি করে হত্যা করে।
সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার প্রতিবাদে সারা দেশের মত রাজশাহীর মানুষও ক্ষোভে ফেটে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য স্থানীয় প্রশাসন রাজশাহী শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী সেদিন ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে পড়ে। এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে শুরু হয় সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষে বেশ কিছু ছাত্র আহত হন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে খবরটি প্রচারিত হলে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জোহা স্যার খবরটি পাওয়ামাত্র এস এম হলের প্রভোস্ট ড. মাযহারুল ইসলাম স্যারকে সঙ্গে নিয়ে গাড়িতে করে তাত্ক্ষণিক ঘটনাস্থলে চলে আসেন। আহত ছাত্রদের ভ্যানে তুলে চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেদিন আহত ছাত্রদের রক্তে তার জামা ভিজে গিয়েছিল। তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে তিনি বলেছিলেন,
"কাল আবার এসে তোমাদের দেখে যাব"।
ঐদিন সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে চলছিল একুশের অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তিনি তাঁর শার্টে ছাত্রদের রক্তের দাগ দেখিয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেন,
"আহত ছাত্রদের রক্তের স্পর্শে আজ আমি গৌরবান্বিত। এরপর থেকে শুধু ছাত্রদের রক্ত নয় প্রয়োজনবোধে আমাদেরও রক্ত দিতে হবে। এরপর আর যদি কোনো গুলি করা হয়, কোনো ছাত্রের গায়ে লাগার আগে যেন সেই গুলি আমার বুকে এসে লাগে।"
১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯। আনুমানিক বেলা তখন সাড়ে ৯টা, ছাত্রদের সঙ্গে পাকিস্তানি সৈন্যদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিয়ে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তাঁর প্রিয় ছাত্রদের রক্ষায় জোহা স্যার আবার ছুটে এলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে, নাটোর রোডের ওপারে যেখানে প্রতিবাদী ছাত্রদের গুলি করার জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জোয়ানরা রাইফেল তাক করে ছিল।
ড. শামসুজ্জোহা ( জোহা স্যার ) তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। তিনি কর্মরত সামরিক কর্মকর্তাকে বলেন,
"প্লিজ ডোন্ট ফায়ার। আমার ছেলেরা এখনই ক্যাম্পাসের মধ্যে ফিরে যাবে।"
ছাত্ররা তখন তাঁদের প্রিয় স্যারের আদেশে ক্যাম্পাসে ফিরে যাচ্ছে, এমন সময় হঠাত্ গুলি। কেঁপে উঠল সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়। পিছনে ফিরে তাকাতেই সবাই দেখল তাদের স্যার মাটিতে পড়ে চিৎকার করছেন -
"বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাকে গুলি করেছে।"
যে স্যার মাত্র গতকাল তার ছাত্রদের কথা দিয়েছিলেন, তিনি তার আহত ছাত্রদের আজ হাসপাতালে দেখতে যাবেন, তিনি তার সেই কথা রাখতে পারেন নি। তবে দ্বিতীয় গুলিটা যেন তার প্রিয় ছাত্রের গায়ে না লেগে তার গায়ে লাগে, সেই কথাটা কিন্তু তিনি ঠিকই রাখতে পেরেছিলেন। দেশের জন্য জীবন দিয়ে তিনি স্বাধীতার অনির্বাণ শিখায় রক্তাক্ত পলাশের নৈবেদ্য দিয়ে গেলেন।
এই দেশ, লাল সবুজের এই পতাকা, এই স্বাধীনতা - এ দেশের ছাত্র শিক্ষক কৃষাণ মজুর শ্রমিক সর্বস্তরের জনগণের ঘামে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। আমরা সশ্রদ্ধ সালাম জানাই সেই সব মহান শহীদদের। বঞ্চনা, অশিক্ষা, অপসংস্কৃতি, অবিচার ও গনতন্ত্রহীনতায় এই স্বাধীনতা যেন কোনোভাবে কলুষিত বা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা দেখা এবং রক্ষার দায়িত্বও দেশের আপামর জনগণ এবং বর্তমান প্রজন্মেরই।
শহীদ শামসুজ্জোহা হলের একজন প্রাক্তন আবাসিক ছাত্র হিসাবে আজকের এই স্মরণীয় ঐতিহাসিক দিনে নিজেকে গৌরান্বিত বোধ করছি। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা আমাদের প্রিয় জোহা স্যারকে আপনি বেহেস্তের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করুন।
লেখক : জিয়াউর রহমান খান লিটন , সাবেক যুগ্ম সচিব, শিল্প মন্ত্রণালয়
Saturday, October 31, 2020
‘সিলিকন ভ্যালি’ এখন হতাশার নাম
কথা ছিল যশোর শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক হবে বাংলাদেশের সিলিকন ভ্যালি। মেধাভিত্তিক অর্থনীতির দ্বার উন্মোচিত হবে পার্কটি চালুর মাধ্যমে। তিন বছর পর সেটি এখন হতাশার নাম।
কেন হতাশা? কারণ, বিনিয়োগ ততটা হয়নি, যতটা প্রত্যাশিত ছিল। বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি বললেই চলে। বর্তমান বিনিয়োগকারীদের বেশির ভাগ প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল মার্কেটিং, কল সেন্টার পরিচালনা ও গ্রাফিকস ডিজাইনিংয়ের কাজ করেন। কর্মসংস্থানের লক্ষ্য পূরণের ধারেকাছেও যেতে পারেনি পার্কটি। বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ পার্কটি ছেড়েছেন। বিপুল ব্যয়ে নির্মিত ডরমিটরি বা আবাসনসুবিধা খালিই থাকছে। সম্মেলনকেন্দ্র বা অ্যাম্ফিথিয়েটার বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়।
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক উদ্বোধন করা হয়। যশোর শহরের নাজির শঙ্করপুর এলাকায় ১২ একরের কিছু বেশি জমিতে পার্কটি করতে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৩০৫ কোটি টাকা। এটি চালুর আগে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ গণমাধ্যমে বলেছিলেন, যশোর হাইটেক পার্ক হবে বাংলাদেশের সিলিকন ভ্যালি। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি বহু প্রযুক্তি কোম্পানির আঁতুড়ঘর। গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সেটি অদ্বিতীয়।
যশোর শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে বক্তব্য জানতে নানাভাবে চেষ্টা করেও প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তাঁকে এ-সংক্রান্ত প্রশ্নও লিখে পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি কোনো জবাব দেননি।
বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসনে আরা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, কিছু সমস্যা আছে। বিনিয়োগকারীদের নানা চাহিদা আছে। ভাড়া মওকুফ, বিদ্যুৎ বিল মওকুফসহ অনেক কিছুই তাঁরা চাইতে পারেন। কিন্তু এটা তো কোনো সংস্থা করতে পারে না। বিনিয়োগকারীদের সব চাওয়া সঠিক নয়।
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে না পারার বিষয়ে হোসনে আরা বলেন, ‘বড় প্রতিষ্ঠান আসার চেয়ে সফটওয়্যারের কাজ হবে, তেমনটাই কথা ছিল। বড় প্রতিষ্ঠান এলে তাদের আমরা উৎসাহ দেব। বড় প্রতিষ্ঠান না আসায় সে উৎসাহের বিষয়টি হয়নি।’
বিনিয়োগ মাত্র ৬০ কোটি টাকা
হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ জানায়, এখন পর্যন্ত যশোর হাইটেক পার্কে বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। পার্কটি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান টেক সিটি জানিয়েছে, সেখানে ৫০টি প্রতিষ্ঠান জায়গা বরাদ্দ নিয়েছে। এর মধ্যে কার্যক্রমে রয়েছে ৩৮টি। অবশ্য সরেজমিনে ৩২টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পাওয়া যায়।
পার্কটির মূল ১৫ তলা ভবনে ১ লাখ ৩৭ হাজার বর্গফুট জায়গা ইজারাযোগ্য। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া প্রায় ৯৫ হাজার বর্গফুট। ৩টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১০ হাজার বর্গফুট জায়গা নিয়ে ফেলে রেখেছে। ফলে ৩৮ শতাংশ জায়গা এখনো খালি রয়েছে। আশানুরূপ বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থানও হয়নি। মোট ১ হাজার ৪০০ কর্মী সেখানে কাজ করেন। তবে প্রতিষ্ঠার সময় পাঁচ হাজার কর্মীর কাজ পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
বিনিয়োগের ধরনও খুব বেশি আশাজাগানিয়া নয়। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই প্রশিক্ষণধর্মী। তারা বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে প্রশিক্ষণের কাজ করে। সফটওয়্যার তৈরি করে, এমন প্রতিষ্ঠান রয়েছে মাত্র ছয়টি, যা হলো মাইক্রো ড্রিম আইটি, টেকনোসফট বাংলাদেশ, সফট এক্স টেকনোলজি, ডেসটিনি আইএনসি ডট, সেমিকোলন আইটি ও অংশ ইন্টারন্যাশনাল। কিছু প্রতিষ্ঠান কল সেন্টার পরিচালনা, ডিজিটাল বিপণন, গ্রাফিকস ডিজাইনসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করে। সূত্র জানায়, পার্কটিতে বিদেশি কোনো বিনিয়োগ নেই। ডেসটিনি আইএনসি ডট নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে জাপানি বিনিয়োগকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আসলে প্রতিষ্ঠানটির মালিক বাংলাদেশি, যিনি জাপানে থাকেন।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবদুস সাত্তারের এন সল্যুশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে যশোর হাইটেক পার্কে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভেবেছিলাম বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো যশোর হাইটেক পার্কে বিনিয়োগ করবে। তাদের মাধ্যমে আমরাও শিখব। কিন্তু কিছুই হয়নি।’ এখন নিজের প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়েই শঙ্কার কথা জানান তিনি।
পার্ক ছেড়েছে ১৭টি প্রতিষ্ঠান
৩ বছরে ১৭টি প্রতিষ্ঠান যশোর হাইটেক পার্ক ছেড়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা যেসব প্রত্যাশা নিয়ে গিয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। এর মধ্যে একটি বড় সমস্যা দক্ষ জনবল না পাওয়া। ইজারামূল্য নিয়ে বিরোধ, উন্নত বিদ্যুৎ সেবা না থাকা এবং বিভিন্ন দাবিদাওয়াকেও সমস্যার তালিকায় যুক্ত করছেন বিনিয়োগকারীরা।
বিনিয়োগকারীরা বলছেন, সরকারের যেসব স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেয়, তাতে কোনো দক্ষ কর্মী তৈরি হয় না। ২০১৭ সালে যশোর পার্কে বেশ আয়োজন করে চাকরি মেলা করা হয়েছিল। চাকরিপ্রার্থীদের প্রচুর আবেদন জমা পড়ে। কিন্তু সেখান থেকে জনবল তৈরি হয়নি।
সে সময়ে যশোর পার্কের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন যুগ্ম সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম (বর্তমানে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক তরুণ সাড়া দিয়েছিল। কিন্তু যেহেতু এটা তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ের, তাই সবার আবেদন নেওয়া যায়নি।’
একটি ডেটা সেন্টার করতে চেয়েও যশোর হাইটেক পার্কে তা করতে পারেনি ঢাকাকোলো লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ডেটা সেন্টারের জন্য বিদ্যুতের একাধিক বিকল্প উৎস থাকতে হয়। অন্তত দুটি জেনারেটর থাকতে হবে। কিন্তু হাইটেক পার্কে জেনারেটর বসানোর মতো কোনো জায়গা নেই। বিদ্যুতের বিকল্প উৎসও পাওয়া যায়নি।
যশোর হাইটেক পার্কটিকে ১৫ বছরের জন্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে টেকসিটি বাংলাদেশ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে। তাদের নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নানা অভিযোগ রয়েছে। একটি হলো ইজারামূল্য। কোনো প্রতিষ্ঠানের বর্গফুটপ্রতি ১৮ টাকা, কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২২ টাকা ভাড়া নেওয়া হয় বলে অভিযোগ। সূত্র জানিয়েছে, ছয়টি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের ভাড়া তিন মাসের বেশি বকেয়া রয়েছে। অবশ্য যারা হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ইজারা নিয়েছিল, তাদের ভাড়া পড়েছে বর্গফুটপ্রতি ১৪ টাকা।
টেকসিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওয়াহিদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এখানে নীতিগত কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেটা ভেবে হাইটেক পার্কের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তবতার অনেক পার্থক্য। এত বড় একটা অবকাঠামোর ব্যবস্থাপনার খরচ অনেক। অনেক কিছু হিসাব না করেই সরকার সেখানে ভাড়া নির্ধারণ করেছিল। তিনি পাল্টা অভিযোগ করেন, বিনিয়োগকারীদের অনেকে ভাড়া দিচ্ছেন না। তাঁদের কাছে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা ভাড়া বাকি।
‘সিলিকন ভ্যালি’ এখন হতাশার নাম
অ্যাম্ফিথিয়েটারে বিয়ে, ডরমিটরি খালি
যশোর হাইটেক পার্কে ডরমিটরিটি তিন তারকা মানের। মোট কক্ষ ৯০টি। ভিআইপি সুইট কক্ষ ১২টি, ফ্যামিলি ডিলাক্স কক্ষ ৩৬টি ও দুই বিছানার কক্ষ ৩০টি। ১৪০ জনের মতো থাকার সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। ভিআইপি কক্ষে থাকার জন্য প্রতি রাতের ভাড়া ৭ হাজার ৬০০ টাকা ও অপর দুই ধরনের কক্ষের ভাড়া ৩ হাজার ৮০০ টাকা করে। তবে পার্কে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ভাড়া নির্ধারিত আছে ৮০০ টাকা।
কথা ছিল দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, ক্রেতা ও কর্মীরা গেলে ডরমিটরিতে থাকবেন। যদিও এখন বেশির ভাগ কক্ষ সব সময় খালি থাকে। ২২ অক্টোবর গিয়ে দেখা গেছে, মাত্র ১২ জন অতিথি আছেন। পুরো সেপ্টেম্বর মাসে ডরমিটরিটিতে ১৬২ জন অতিথি ছিলেন।
সম্মেলন কেন্দ্র বা অ্যাম্ফিথিয়েটার করা হয়েছিল সম্মেলন, সভা-সেমিনার করার জন্য। এখন বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্যও ভাড়া দেওয়া হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে যশোরের একজন পরিবহন ব্যবসায়ীর ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল অ্যাম্ফিথিয়েটারে। সেখানে অতিথি ছিলেন প্রায় আড়াই হাজার মানুষ।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত ততটা বড় হয়নি। এমন তো নয় যে দেশে হাজার হাজার কোম্পানি তৈরি হচ্ছে। কোম্পানি যদি তৈরি না হয়, হাইটেক পার্কে কারা যাবে? তিনি বলেন, দেশে বেশির ভাগ কোম্পানির জনবল ২০ থেকে ৩০ জন। এত কম লোক নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের ঢাকার বাইরের পার্কে যাওয়া পোষাবে না।
ফাহিম মাশরুরের মতে, শুধু পার্ক বানালেই হবে না, প্রযুক্তি খাত যাতে বড় হয়, চাহিদা তৈরি হয়, সে ব্যাপারে সরকারকে কাজ করতে হবে। এসব পার্ক নির্মাণের আগে দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিষয়েও মনোযোগী হতে হবে।
‘করার জন্যই করা হয়’
তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার লক্ষ্যে সরকার ২৮টি হাইটেক পার্ক করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। পরে ৬৪টি জেলায় হাইটেক পার্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে। বিগত পাঁচ বছরে ঢাকায় জনতা টাওয়ার সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, যশোরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটি, নাটোরে শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার এবং রাজশাহীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাইটেক পার্ক চালু হয়েছে।
এ বিষয়ে বৃহৎ প্রকল্প বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের প্রকল্প করার আগে সম্ভাব্যতা যাচাই এবং দক্ষ জনবল থেকে শুরু করে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হয়। নিয়ম হচ্ছে, পাইলট (পরীক্ষামূলক) প্রকল্প করা। তার সফলতার ভিত্তিতে বাকিগুলো করতে হয়। এতে আগের ভুল বা সমস্যাগুলো যাচাইয়ের সুযোগ থাকে। আমাদের এখানে সেটা হচ্ছে না। প্রকল্প করতে হবে, তাই করা হয়।’
সুহাদা আফরিন
সুহাদা আফরিনমনিরুল ইসলামঢাকা ও যশোর
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২০, ১০:২৮
Friday, September 25, 2020
নিমতলা কোর্ট চত্বর মেহেরপুর
Wednesday, August 12, 2020
সাবেক জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি এর নামে মামলা
মেহেরপুর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বারিকুল ইসলাম লিজন ও সদর থানার ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আনন্দর নামে আদালাতে মামলা ও সদর থানায় এজহার করেছে খোকন নামে এক ব্যক্তি। অজ্ঞাতনামা রয়েছে ৬/৭ জনের বিরুদ্ধে।
বুধবার দুপুরে এ মামলা করা হয়েছে মেহেরপুর আদালাতে। মামলা নং ১৯৯/২০। মামলা তদন্তের জন্য জেলা গোয়েন্দা পুলিশের(ডিবি) কাছে দিয়েছে আদালত। লিজন আমদাহ ইউপি চেয়ারম্যান আনারুল ইসলামের ছেলে। আনন্দ শহরের গোরস্থান পাড়ার আব্দুল বারি ছেলে।
মামলার বিবরণে জানা গেছে, মেহেরপুর সদর উপজেলা আশরাফপুর গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমান হবির ছেলে খোকন কে মারপিট করেছে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বারিকুল ইসলাম লিজন ও সদর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আনন্দ।
গত ১ আগস্ট ঈদের দিন বিকালে আশরাফপুর গ্রামের সোহাগ ও আশরাফুল নামে দুই যুবক সজিবকে এলোপাতাড়ি ভাবে কুপিয়ে জখম করলে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।
গ্রামের ছেলে হিসেবে সজীবকে হাসপাতালে দেখতে যায় খোকনসহ কয়েকজন। পরে লিজন ও আনন্দ সহ অজ্ঞাতনামা ৬/৭ জন হাসপাতালের ভিতরে গিয়ে খোকনকে বলে এই তোরা এখানে কি করতে এসেছিস এই বলে হত্যার করার উদ্দেশ্যে এলোপাতাড়ী মারপিট করে খোকনকে। পরে পুলিশ গেলে জখম করে তাকে ফেলে পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় হত্যার হুমকি দিয়ে বলে পরে দেখে নেব।
এই বিষয়ে বারিকুল ইসলাম লিজন ও আনন্দের সাথে কথা বললে-তারা জানায় এই শব ভুয়া ও মিথ্যা সাজানো নাটক। সঠিক ভাবে তদন্ত করা হলে আসল ঘটনা বের হয়ে আসবে।
Friday, July 11, 2014
রগ কাঁটা রাজনীতির জনক শিবিরের মিনি ক্যান্টনমেন্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৮২-২০১৩)
![]() |
| (ছবি-শহীদ মুকিম, শহীদ রুপম, শহীদ রতন) |
১৯৮২ সালের ১১ মার্চ শিবির ক্যাম্পাসে প্রকাশ্য কর্মসূচি দিয়ে আয়োজন করে নবীন বরণ অনুষ্ঠান। এদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ৩ বাস বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে এসে শিবির ক্যাডাররা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের উপর হামলা চালায়। এই হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য ছাত্র সংগঠন বাধা দিলে সংঘর্ষে শিবিরের চারজন কর্মী মারা যান। আর শিবিরের হামলায় মারা যান ছাত্রলীগের নেতা মীর মোশতাক এলাহি।
এই ঘটনার পর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দখলের চেষ্টায় কিছুটা ভাটা পড়ে শিবিরের। তবে তারা বসে থাকেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে শিবির চট্টগ্রামের মতো একই কায়দায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্রে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে তাদের শক্তিমত্তা বাড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোকে তারা বানিয়েছে তাদের মিনি ক্যান্টনমেন্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রাম বিনোদপুর, বুধ পাড়া, মেহেরচন্ডী গ্রামে শিবিরের অনেক কর্মী ও ক্যাডার স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করে এসব গ্রামে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে। এছাড়া আত্মীয়তা সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার কারণে শিবিরের এসব কর্মী ও ক্যাডারদের কথায় স্থানীয় অনেকেই জামায়াত শিবিরের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এভাবে একে একে বিশ্ববিদ্যালয় আশে পাশের এলাকার পুরোটাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় তারা বা ঐ এলাকাগুলোতে নিজেদের অবস্থান সংহত করে।
রাবি দখলের পথে বড় ভূমিকা রাখে ছাত্র মৈত্রী রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ শাখার আহ্বায়ক ছাত্রনেতা জামিল আখতার রতন হত্যাকাণ্ড। ১৯৮৮ সালের ৩১ মে মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে অর্ধ শতাধিক শিক্ষকের সামনে হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ চালায় প্রথম রগ কেটে এবং পরে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে ছাত্রনেতা রতনকে। আর এই ঘটনার পর থেকেই শিবির রাজশাহীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোয় দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় নামে। শুরু হয় বর্বরোচিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য সর্বস্তরে নিন্দিত এই ছাত্র সংগঠনটির রগ কাটার রাজনীতি। হত্যা, সংঘর্ষ আর রগ কাটার মধ্য দিয়ে ছাত্রশিবির রাজশাহী মেডিকেল কলেজে আধিপত্য বিস্তার করে।
![]() |
| (ছবি-ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম তৌহিদ) |
![]() |
| (ছবি - শহীদ জোবায়ের চৌধুরী রিমু) |
![]() |
| ( ছবি - ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারীর ঘটনায় আহত কয়েকজন) |
![]() |
| (ছবি-শহীদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস) |
এই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৮ সালের ১৭ নভেম্বর তিন হল এলাকায় মারা যান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসলাম হোসেন। পরদিন ১৮ নভেম্বর সংঘর্ষে মারা যান আজগর আলী। ১৯৮৯ সালের ১৮ এপ্রিল মারা যান শফিকুল ইসলাম। ১৯৯০ সালের ২২ জুন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে শিবিরের সংঘর্ষে নিহত হন খলিলুর রহমান। এভাবেই একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও নব্বই এর গন অভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় দখলের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয় শিবিরের।
অতঃপর ১৯৯১ সালে জামায়াতের সমর্থনে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয় বিএনপি। একের পর এক দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে সরকারী ছাত্র সংগঠন ও ছাত্র শিবির। এখানে একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, তা হচ্ছে শিবির শুধু হল বা ক্যাম্পাস দখল করেই ক্ষান্ত থাকেনি, তাদের লক্ষ্য ছিল সুদূর প্রসারী, তাই নিজেদের টার্গেট করা প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক পদগুলোতেও নিজেদের সমর্থকদের অবস্থান নিশ্চিত করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভিসি থেকে একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী পর্যন্ত সকল স্তরে নিজেদের দলীয় সমর্থকদের বসিয়ে রাবি দখলের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে শিবির।
১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ জন নেতা কর্মীর নামে শিবির কর্তৃক দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে জাসদ সমর্থিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (না-শ), ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র ইউনিয়নসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠন রাজশাহী শহরের সাহেব বাজার বড় রাস্তায় প্রতীক অনশন কর্মসূচীর ডাক দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতা কর্মীরা যখন ঐ অনশন কর্মসূচীতে তখন বেলা ১১ টার সময় চট্টগ্রামের কুখ্যাত সিরাজুস সালেহীন বাহিনীসহ কয়েক হাজার সশস্ত্র বহিরাগত শিবির সন্ত্রাসী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অতর্কিত হামলা চালিয়ে সকল আবাসিক হল ও ফাঁকা ক্যাম্পাসের দখল নেয় ছাত্র শিবির। আর এই কাজে তাদের সহযোগিতা করে তখনকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এম এ মতিনের পুলিশ বাহিনী এবং জামাত সমর্থিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পবিত্র রমজান মাসে এই হামলায় বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসীর আরাফাত পিটু। বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন জাসদ ছাত্রলীগের তৎকালীন রাজশাহী মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ও সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র মনোয়ার আলী রুশো। এছাড়াও জাসদ ছাত্রলীগের আইভি, নির্মল, লেমন, রুশো, জাফু, ফারুক এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের রাজেশ সহ প্রায় দেড় শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী আহত হয়। এদের অধিকাংশেরই হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়া হয় এবং রাজেশের কব্জি কেটে ফেলা হয়। এই হামলার সময় শিবির ক্যাডাররা এস এম হল, আমির আলী হল এবং লতিফ হল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ব্যাপক আকারে গান পাউডারের ব্যবহার করায় হলের জানালার কাঁচগুলো গলে গিয়েছিলে। লতিফ হলের অনেকগুলো কক্ষ দীর্ঘ দিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। এই হামলার তীব্রতা এতই ছিল যে, বেলা ১১টায় শুরু হওয়া হামলা বিডিআর নামানোর আগ পর্যন্ত বন্ধ হয়নি। এই ঘটনার পরে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়।
(ছবি - শহীদ ইয়াসীর আরাফাত পিটু)
উল্লেখ্য, এই পরিকল্পিত হামলা রাবিতে শিবিরের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক ধাপ সম্পন্ন করে। এছাড়া এই হামলা সংঘটিত হয় ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক গন আদালত গঠন করে গোলাম আজমের বিচারের সপ্তাহ খানেক আগে। এর পর থেকেই গন আদালতের রায় বাস্তবায়নের দাবীতে গড়ে ওঠে আন্দোলন। এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯ জুন তারিখে রাজশাহীতে হরতাল কর্মসূচির সমর্থনে জাসদের মিছিল চলাকালে শিবিরের সশস্ত্র হামলায় বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বুধ পাড়া এলাকার জাসদ নেতা মুকিমকে হত্যা করে (চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ২৪ জুন) শিবির সন্ত্রাসীরা।
এর আগে ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চের সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকাকালীন ০৭ মে বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ্ববর্তী নতুন বুধপাড়ায় শিবির ক্যাডার মোজাম্মেলের বাড়ীতে বোমা বানানোর সময় সন্ত্রাসী শিবির ক্যাডার আজিবর সহ অজ্ঞাতনামা অন্তত আরো তিন জন নিহত হয়। পরবর্তীতে পুলিশ মহল্লার একটি ডোবা থেকে অনেকগুলো খন্ডিত হাত পা উদ্ধার করে। যদিও সন্ত্রাসী শিবির আজিবর ছাড়া আর কারো মৃতু্র কথা স্বীকার করেনি।
দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকার পরে বিশ্ববিদ্যালয় খুললে প্রতিটি হলে এবং ক্যাম্পাসে নতুন রূপে আবির্ভূত হয় শিবির। পালটে যায় তাদের আচরণ। প্রতিটি হলের গেটে অবস্থান নেয়া, অন্যান্য সংগঠনের নেতা কর্মীদের ভয় ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে একটা ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করে তারা। ১৯৯৩ সালের ১৭ জানুয়ারী রাত এগারোটার দিকে সোহরাওয়ার্দী হল এবং শিবির নিয়ন্ত্রিত জোহা হল এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় মুহাম্মদ ইয়াহিয়া নামে একজনের মৃত্যু হয়। দুই সপ্তাহ পরেই ১৯৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর শিবির সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র হামলা চালায় শিবির। ভয়াবহ এই সংঘর্ষে ছাত্রদল নেতা বিশ্বজিৎ, নতুন এবং ছাত্র ইউনিয়নের তপন এবং শিবিরের মুস্তাফিজুর রহমান ও রবিউল ইসলাম নিহত হয়। আবারও অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়।
মূলত ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ এবং ৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারীতে শিবির পরিকল্পিত সন্ত্রাস বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রাখে। ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হতে থাকেন প্রগতিশীল সংগঠনের নেতা কর্মীরা। এমন অবস্থায় একই বছর ১৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শেরেবাংলা হলে বহিরাগত সশস্ত্র শিবির ক্যাডাররা হামলা চালিয়ে ছাত্র মৈত্রী নেতা বিশ্ববিদ্যালয় টিমের মেধাবী ক্রিকেটার জুবায়ের চৌধুরী রিমুকে হাত-পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করার মধ্য দিয়েই ক্যাম্পাসে তাদের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। কারণ ততোদিনে প্রগতিশীল সংগঠনগুলো ক্যাম্পাস ছাড়া।
(ছবি - শহীদ জোবায়ের চৌধুরী রিমু)
১৯৯৪ সালে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত ছাত্র মৈত্রী নেতা প্রদ্যুৎ রুদ্র চৈতী পরীক্ষা দিতে ক্যাম্পাসে আসার পথে তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনের সামনের রাস্তায় তার হাতের কব্জি কেটে নেয় শিবির কর্মীরা। ১৯৯৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ্ববর্তী চৌদ্দপাই নামক স্থানে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী সকাল-সন্ধ্যা বাসে হামলা চালিয়ে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী নেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য রুপমকে বাসের মধ্যে যাত্রীদের সামনে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির সন্ত্রাসীরা। হত্যার আগে বর্বর শিবির ক্যাডাররা তার হাত ও পায়ের রগ কেটে নেয়। একই বছর জুলাই মাসে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের ওপর সশস্ত্র শিবির কর্মীরা হামলা করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছাত্রনেতা ফরহাদের হাতের কব্জি কেটে নেয়। এ হামলায় প্রায় ২৫ জন ছাত্রদল নেতা-কর্মীর হাত পায়ের রগ কেটে নেয় শিবির ক্যাডাররা।
পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে জাসাস বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আমানউল্লাহ আমানকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। ১৯৯৭ সালে গভীর রাতে রাবি ক্যাম্পাসে বহিরাগত শিবির সন্ত্রাসীদের হামলায় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা আহত হয়। রাবি জিমনেসিয়াম পুলিশ ক্যাম্পেও বোমা হামলা করে সন্ত্রাসী শিবির।
একই বছর বঙ্গবন্ধু পরিষদের রাবি শাখার সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল খালেক, জিয়া পরিষদ নেতা হাবিবুর রহমান আকন্দ সহ প্রায় বিশ জন শিক্ষকের বাসায় বোমা হামলা ও অগ্নি সংযোগ করে সন্ত্রাসী ছাত্র শিবির। শিক্ষক সমিতির মিটিং থেকে ফেরার পথে ১৯৯৮ সালে রাবি শহীদ মিনারের সামনে দ্বিতীয় বারের মতো অধ্যাপক মোঃ ইউনুসের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় সন্ত্রাসী ছাত্র শিবির। ছাত্র-কর্মচারীদের প্রতিরোধে অধ্যাপক ইউনুস প্রাণে বেঁচে গেলেও মারাত্মক আহত হন তিনি। পরের বছর রাবিতে অবস্থিত ’৭১ এর গণকবরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য স্থাপিত ভিত্তি প্রস্তর রাতের আঁধারে সন্ত্রাসী ছাত্র শিবির ভাঙ্গতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মচারী বাধা দেন। ফলে সন্ত্রাসী শিবির ক্যাডাররা তাকে কুপিয়ে আহত করে এবং ভিত্তিপ্রস্তর ভেঙ্গে ফেলে। অথচ তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল আওয়ামীলীগ। ২০০১ সালে রাবি অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহাকে শিবির কর্মীরা হাত-পা বেঁধে জবাই করে হত্যার চেষ্টা চালায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের হস্তক্ষেপে ওইদিন তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ফজরের নামাজের ওয়াক্তে প্রাতঃভ্রমণ শেষে বাড়ি ফেরার সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায় নিজ বাসভবনের খুব কাছে ধারালো অস্ত্র হাতে অধ্যাপক ইউনুসের ওপর হামলা চালায় মানবতার শত্রু ও স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবিরের কিলিং স্কোয়াড । পরে তারা কুপিয়ে প্রগতিশীল এই শিক্ষককে হত্যা করে। এর আগে ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে দুই দফায় ছাত্র শিবির অধ্যাপক ইউনুসকে হত্যার চেষ্টা করেছিল।
(ছবি-শহীদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস)
২০০৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াত পন্থী শিক্ষক মহিউদ্দিন এবং ছাত্র শিবির সভাপতি মাহবুব আলম সালেহীসহ আরও দুজন শিবির ক্যাডার একযোগে হামলা চালিয়ে রাবির ভূতত্ত্ব ও খনি বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবু তাহেরকে হত্যা করে।
২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাতের আঁধারে বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করে তার লাশ ম্যানহোলে ফেলে রাখে শিবিরের ক্যাডাররা। এই হত্যাকাণ্ডের পরে কার্যত তারা ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয়।
ফারুক হত্যার পরে তারা ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হলেও থেমে থাকেনি তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। ২০১২ সালের ২১ নভেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের খালেদা জিয়া ও মন্নুজান হলের মাঝামাঝি স্থানে ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সহসভাপতি আখেরুজ্জামান তাকিমের ওপর হামলা চালিয়ে হাত-পায়ের রগ কেটে দেয় শিবির সন্ত্রাসীরা।
( ছবি - ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারীর ঘটনায় আহত কয়েকজন)
এবছরের ২৩ আগস্ট জাতীয় শোক উপলক্ষে সৈয়দ আমীর আলী হলে ছাত্রলীগের আলোচনা সভা শেষ করে রাত ১০টার দিকে পাঁচ-ছয়জন নেতাকর্মীসহ মাদার বখশ হলের দিকে যাওয়ার পথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম তৌহিদ আল হোসেন ওরফে তুহিনের হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয় শিবির সন্ত্রাসীরা। এসময় ছাত্রলীগের সমাজসেবা সম্পাদক শাওনের ডান বাহুতে বিদ্ধ হয়।
(ছবি-ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম তৌহিদ)
এদিকে দীর্ঘ দিন ঘরে ক্যাম্পাসে কোণঠাসা অবস্থায় থাকা শিবির সন্ত্রাসীরা আবারও সক্রিয় হচ্ছে রাবিতে। গত সিটি নির্বাচনে রাজশাহীতে মেয়র পদে চারদলীয় জোটের প্রার্থী জয়ী হওয়ার পর ঐ রাতেই রাবি ক্যাম্পাস তা উদযাপন করে শিবির বোমাবাজি করে। এরপর থেকে ক্যাম্পাস তাদের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেতে থাকে। দীর্ঘ আড়াই বছরের অনুপস্থিতির পরে বর্তমানে ক্যাম্পাসে তারা নিজেদের অবস্থান সংহত করছে।
তথ্যসূত্র :
বাংলা নিউজ টুয়েন্টি ফোর ডট কম
দৈনিক যুগান্তর
রাবির সাবেক ছাত্র নেতৃবৃন্দ।
রাবি শিবিরের দুটি কিলিং মিশন থেকে বেঁচে যাওয়া ছাত্র মৈত্রীর চৈতী ও ছাত্রদলের ফরহাদের দেয়া ঘটনার বিরবন লিখেছেন: এএস রিয়াদ
সেই সময়ে অর্থাৎ নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে শিবিরের দুটি নৃশংস-ভয়ঙ্কর কিলিং মিশন থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া দুজন ছাত্রনেতা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মাহবুবুল আলম ফরহাদ ও ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক প্রদ্যুৎ রুদ্র চৈতীর ভাষ্য থেকে ঘটনা দুটির পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরা হল।
মাহবুবুল আলম ফরহাদ : মাহবুবুল আলম ফরহাদ রাবিতে অর্থনীতি বিভাগে তৃতীয় বর্ষে পড়তেন । জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ছিলেন হবিবুর রহমান হল শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক । পরবর্তীতে রাবি শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক। সবশেষে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৯৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী শিবির রাবি ক্যাম্পাস দখল করে নেয়। ছাত্রদলকে তখন ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয়া হয়। ২২ জুলাই ছাত্রদল ক্যাম্পাসে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে নেতৃবৃন্দের বৈঠক হয়। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা জানান, ক্যাম্পাস প্রত্যেকের। প্রত্যেক ছাত্রেরই ক্যাম্পাসে থাকার, রাজনীতি করার অধিকার আছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ আলোচনা সেরে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে ক্ষমতাসীন বিএনপির অঙ্গসংগঠন ছাত্রদলের নেতা কর্মীরা। দীর্ঘদিন পরে হলে ঢুকে সবাই যে যার কক্ষে চলে যায়। হাবিবুর রহমান হলের ৮৮ নং কক্ষে থাকতেন ফরহাদ। ছাত্রদলের ঐতিহ্যবাহী এই কক্ষটিতে ইতোপূর্বে ফজলুর রহমান পটল, হারুনুর রশিদ হারুণসহ অনেক বড় বড় নেতার সিট ছিল।
কক্ষে প্রবেশের কিছুক্ষণ পর হাত মুখ ধুয়ে একটু আরাম করে ফরহাদ যখন বসতে গিয়েছিল তখনই শিবির ক্যাডাররা তার ওপর অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। সেসময় তিনি ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের বড় নেতা না হলেও প্রধান সংগঠকদের একজন ছিলেন তিনি। এজন্য তিনি ছিলেন শিবিরের বিশেষ টার্গেট। ফরহাদ ঘুণাক্ষরেও জানতেন না শিবির ক্যাডাররা সংঘবদ্ধভাবে হলের ভেতর ওত পেতে বসে আছে। হঠাৎ শিবির ক্যাডাররা কক্ষের ভেতর ঢুকে পড়ে। এবং তারা ‘ফরহাদকে পেয়েছি’ বলে উল্লাস ধ্বনি দিতে থাকে। ফরহাদ তখন তার বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আবির্ভূত হন। চেষ্টা করেন সময় পার করার। যাতে তার বন্ধুরা তাকে উদ্ধার করতে আসতে পারে। তিনি তাদের সঙ্গে আলাপ জড়াতে থাকেন। কিন্তু শিবির ক্যাডাররা তার কোনো প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তার ওপর হামলে পড়ে।
প্রথমেই তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথায় কতগুলো আঘাত করে তারা। ফরহাদের মাথায় দেখা গেছে অনেকগুলো গভীর ক্ষতচিহ্ন। মাথায় আঘাতের পরই ফরহাদ চেতনা হারিয়ে ফেলেন। ঠিক এ সময় শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি। শিবির ক্যাডাররা ফরহাদকে হল থেকে বের করে হাবিবুর রহমান হলের পেছনে নিয়ে যায়। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে তার সারা দেহ। সবশেষে তারা ফরহাদের বাম হাতের কব্জি পুরোটা কেটে নিয়ে যায়। তার মুখের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিয়ে তারা পরখ করে সে বেঁচে আছে কি না। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেই তারা নারায়ে তকবির- আল্লাহু আকবর ধ্বনি দিতে দিতে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর বাংলা চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যের মতো সব ঘটনার শেষে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
বিএনপি তখন ক্ষমতাসীন দল। তবু শিবির ক্যাডাররা তাকে হত্যার উদ্যোগ নিতে পিছপা হয়নি। এ ঘটনার পর মামলা করা হয়েছিল ফরহাদের পক্ষ থেকে। মামলা পরিচালনা করা হয়েছিল দলীয়ভাবে। আর সব রাজনৈতিক মামলার মতোই এ মামলারও একই অবস্থা হলো। রাজনৈতিক মামলাগুলো সাধারণত ২-৪ বছর চলে। সাক্ষী হয় না। বাদী থাকে না। অবশেষে এক পর্যায়ে মামলাটির অপমৃত্যু হয়। শাহাদাৎ, জব্বার, সোহরাওয়ার্দী হলের সভাপতি তুষার, রাবি শিবিরের সভাপতি মতিউর রহমান আকন্দ, সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম বুলবুল মাইনুলসহ আরো অনেককেই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই মামলার আসামি করা হয়। যদিও জানা যায় যে, শিবির ক্যাডারদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দাতা, অসংখ্য মামলার আসামী ডাসমারি এলাকার বাসিন্দা কুখ্যাত ক্যাডার জাফর বাবু; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বুধ পাড়া এলাকার বাসিন্দা, শিবিরের কিলার বাহিনীর সদস্য খুশী; মেহেরচণ্ডী এলাকার শিবিরের মেসগুলোর নিয়ন্ত্রক, বর্তমানে জামায়াতের রোকন, রাবি সংলগ্ন বুধ পাড়া এলাকার আলোচিত শিবির ক্যাডার সামাদ; শিবিরের তৎকালীন সাথী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর মসজিদ মিশন একাডেমীর পাশের বাসাটির অধিবাসী কুখ্যাত শিবির ক্যাডার শাহীন; শিবিরের রাবি শাখার সভাপতি জব্বার, মাইনুল (মাইনুল বর্তমানে রাজশাহীর লক্ষ্মীপুর মোড়ে জমজম ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের প্রজেক্ট ডিরেক্টর আর জব্বার বর্তমানে যশোরে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের প্রজেক্ট ডিরেক্টর); বিনোদপুর এলাকার বাসিন্দা শিবির ক্যাডার সালেকীন এবং সাবেক রাবি ছাত্র শিবির সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগিরসহ আরো প্রায় শতাধিক শিবির ক্যাডার সেদিন তার ওপর হামলায় জড়িত ছিল।
তখন শিবিরের তেমন কেউ গ্রেফতার হয়নি। বরং বিএনপি ক্ষমতা ছাড়লে হাবিবুর রহমানের আমলে ফরহাদকেই জেলে যেতে হয়। এমনকি ফরহাদের চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে বরাদ্দ দেয়া ১ লাখ টাকাও তসরূপকৃত বলে অভিযোগ এনে ফরহাদকে অপমানিত করা হয়েছিল। অসুস্থতার সময় বদরুদ্দোজা চৌধুরী, সাদেক হোসেন খোকা, আমানউল্লাহ আমান, ফজলুল হক মিলনসহ অনেকেই তাকে হাসপাতালে দেখতে যান। প্রধানমন্ত্রীর দৈনিক কার্যতালিকাতেও তাকে দেখতে যাওয়ার সময় নির্ধারিত হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পাটির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ডাকা হরতালের কারণে প্রধানমন্ত্রী আর তাকে দেখতে যেতে পারেননি। ফরহাদ আহত হওয়ার পর বিবিসি ও ভয়েজ অব আমেরিকা টানা ৪ দিন ধরে একের পর এক সিরিজ প্রতিবেদন প্রচার করে। অচল এক হাত নিয়ে ফরহাদ এখনো স্বপ্ন দেখেন পরিশুদ্ধ রাজনীতির।
প্রদ্যুৎ রুদ্র চৈতী : দেশ ও জাতির প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা ছিল প্রদ্যুৎ রুদ্র চৈতীর। বেড়ে উঠেছেন খুলনা শহরে। সেই বোধই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা কারীদের প্রতি তার অন্তরে তৈরি করেছিল ব্যাপক ঘৃণা। তাই খুলনা অঞ্চলে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতেন নিয়মিত। কিন্তু জামায়াত-শিবির চক্র সেখানে তাদের শক্তি প্রদর্শন করত। কোনো ধরনের কর্মসূচি তারা সফল হতে দিত না। লাঠি, দা, কুড়াল, কিরিচ, তরবারি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত ঘাতকের দল। ফলে কোনো ধরনের কর্মসূচি নিয়ে এগুতে পারত না নির্মূল কমিটি। চৈতী এর প্রতিবাদ করতেন। কর্মসূচিতে গেলেই তিনি শিবিরের বাধার বিরুদ্ধাচরণ করতেন এবং কখনো কখনো তাদের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়তেন। এরই রেশ ধরে ঘাতক শিবির ক্যাডাররা চৈতীকে চিরদিনের জন্য পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করে। চৈতীকে হত্যার উদ্দেশ্যে দু’দুবার তার ওপর হামলা চালালেও তখন তারা ব্যর্থ হয়।
এরপর চৈতী চলে আসেন রাজশাহীতে। ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে মাস্টার্স কোর্সে। সেখানে এসেই তিনি বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী রাবি শাখার হাল ধরেন। ছাত্র মৈত্রীর কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি এবার শিবিরের আরো বড় শত্রুতে পরিণত হন। ’৯৪ সালের ২০ ডিসেম্বর ছিল রাবিতে চৈতীর শিক্ষাজীবনের শেষ দিন। তখন তিনি ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক। ক্যাম্পাসে তখন শীতকালীন ছুটির মধ্যবর্তী সময়ে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিলেন তিনি। তীব্র শীত। রাজশাহীতে সেদিন তাপমাত্রা ৫/৬ ডিগ্রি। রিকশায় করে তিনি যাচ্ছিলেন। দ্বিতীয় বিজ্ঞান ভবনের সামনে হঠাৎ মাথার পেছনে কিসের যেন ছোঁয়া লাগল। ঘুরে তাকাতেই দেখেন পিস্তল। গুলিও বের হলো সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু ততক্ষণে কিছুটা সরে গেছেন চৈতী। গুলিটা তার কোনো ক্ষতি করতে পারল না। রিকশা থেকে লাফ দিয়ে নেমে তিনি রাস্তার বাঁ দিকে দৌড়াতে শুরু করেন। শিবির ক্যাডাররা তখন আর তাকে গুলি করতে পারছিল না। কারণ সামনে-পেছনে, চতুর্দিকে তাদের নিজেদের লোক। তাছাড়া শিবিরের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, পিস্তল-গুলির চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কুপিয়ে-কুপিয়ে যন্ত্রণা দিয়ে কাউকে মারাটা তাদের কাছে অনেক বেশি পছন্দসই। একই ঘটনা ঘটল চৈতীর বেলায়ও। আগে থেকে প্রস্তুত শিবির ক্যাডাররা তখন চারদিক থেকে বোমা ফাটাতে শুরু করে। যাতে এদিকে কেউ এগিয়ে আসতে সাহস না পায়। পরিকল্পনা মাফিক চতুর্দিক থেকে তারা ঘিরে ফেলে চৈতীকে। তারপর সমস্বরে আল্লাহু আকবর ধ্বনি তুলে তাকে একের পর এক আঘাত করতে থাকে। ইঞ্চি মেপে মেপে তাকে আঘাত করা হয়। তার সারা শরীরে প্রতি এক ইঞ্চি পরপর দেখা গেছে লম্বা-গভীর কোপের দাগ। সারা শরীরে তিনি এই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। শিবির প্রথমে তার পায়ে যে কোপটি দিয়েছিল, তাতে ডান হাঁটুর একটু ওপর থেকে পুরো পা’টিই প্রায় আলাদা হয়ে গিয়েছিল। কোনোমতে এক পাশে একটু চামড়ার সঙ্গে ঝুলেছিল পা’টি। এক সময় কোপাকুপির মধ্যেও কোনো একজন গুলি চালায় তার ওপর। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে সেই গুলিটি না ফোটায় তখনই তাকে মরতে হয়নি। সারা শরীর থেকে তীব্র রক্তের স্রোত বেরিয়ে আসছিল তার। মাথা মুখ থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তে নাকের ছিদ্রটাও প্রায় বুজে গিয়েছিল। চৈতীর কানে যেন দূর পরবাস থেকে তখন ভেসে আসতে থাকে তাদের বাক্য বিনিময়। তার মধ্যে একটি বাক্য এখনো তাকে তাড়া করে ফেরে। যেন খুব দূর থেকে কেউ একজন বলছে, ‘ভালো করে চেক করে দেখ, মারা গেছে কিনা?’ সারা পৃথিবী তখন ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে চৈতীর কাছে। তার পরও সজাগ হয়ে ওঠে মস্তিষ্ক। নিশ্বাস-প্রশ্বাস কিছুক্ষণের জন্য হলেও জোর করে বন্ধ রাখার চেষ্টা চালায় সে। শিবির ক্যাডাররা তাই তখন তার হাল্কা প্রশ্বাস নির্গমনটা ধরতে পারেনি। মৃত্যু নিশ্চিত মনে করে তারা বোমা ফাটাতে ফাটাতে উল্লাস করে আল্লাহু আকবর ধ্বনি তুলে ফিরে গিয়েছিল।
মেহেরচণ্ডী এলাকার শিবিরের মেসগুলোর নিয়ন্ত্রক, বর্তমানে জামায়াতের রোকন, রাবি সংলগ্ন বুধ পাড়া এলাকার আলোচিত শিবির ক্যাডার সামাদ; শিবিরের তৎকালীন সাথী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর মসজিদ মিশন একাডেমীর পাশের বাসাটির অধিবাসী কুখ্যাত শিবির ক্যাডার শাহীন; শিবিরের রাবি শাখার সভাপতি জব্বার, সেক্রেটারি মাইনুল (মাইনুল বর্তমানে রাজশাহীর লক্ষ্মীপুর মোড়ে জমজম ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের প্রজেক্ট ডিরেক্টর আর জব্বার বর্তমানে যশোরে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের প্রজেক্ট ডিরেক্টর); এবং সাবেক রাবি ছাত্র শিবির সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগিরসহ আরো প্রায় শতাধিক শিবির ক্যাডার সেদিন তার ওপর হামলায় জড়িত ছিল।
এর কিছুক্ষণ বাদেই বাইরে থেকে রাবিতে আসা একটি ট্যুর গাড়ি এগিয়ে আসতে থাকে ঘটনাস্থলের দিকে। এতক্ষণ বোমার জন্য আটকা পড়ে থাকা গাড়িটি শিবির ক্যাডারদের বেরিয়ে যেতে দেখে দ্রুত তখন এলাকা ছাড়তে চাইছিল। গাড়িতে বসা নারীরা প্রথম লক্ষ্য করে লাশটির দিকে। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তবু তারা চৈতীর অচেতন দেহটি গাড়িতে তুলে রাজশাহী মেডিকেলে নিয়ে যায়। ইতোমধ্যে রাবিতে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে। সাধারণ ছাত্ররা তখন এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিবির সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেয়া হয় অনির্দিষ্টকালের জন্য। রাবির সেই পরীক্ষা বাতিল হয়ে যায়। ছাত্ররা দলে দলে ছুটতে থাকে মেডিকেলের দিকে। শক্তিহীনতার জন্য বর্বরতার বিরুদ্ধে তারা রুখে দাঁড়াতে না পারলেও টাকা-পয়সা যার যা ছিল, নিয়ে ছুটে যায় চৈতীর চিকিৎসার জন্য। রক্ত দেয়ার জন্য সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে থাকে ছাত্ররা। ভাগ্য প্রসন্নই বলা যায়। দিনটি ছিল মঙ্গলবার। অর্থোপেডিক্সের ডাক্তাররা সবাই অপারেশন থিয়েটারে তৈরি ছিল তাদের নিজস্ব রুটিন অনুসারেই। চৈতীকে হাসপাতালে নেয়া মাত্র ডাক্তাররা তার জীবন বাঁচানোর জন্য একযোগে কাজে নেমে পড়ে। রাত ১০টার দিকে একবার ঘোষণা করা হয় মারা গেছে চৈতী। কিন্তু না, নিজের অদম্য প্রাণশক্তির জোরে বেঁচে থাকেন তিনি বুকে দ্রোহের বীজ নিয়ে। দুই দিন পর জ্ঞান ফেরে তার।
রাবির প্রগতিশীল শিক্ষকরা তখন আতঙ্কে কাঁপছেন। অনেক শিক্ষক রাজশাহী মেডিকেলে তাকে দেখতে গিয়েছিলেন চাদর মুড়ি দিয়ে। শিবিরের ভয়ে প্রকাশ্যে অনেকেই তখন তার পাশে দাঁড়াতে পারেননি। পরে তাকে ঢাকায় আনা হলে পান্না কায়সার, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, হায়দার আকবর খান রনো, ভাষা মতিনসহ ভারতে চিকিৎসার সময় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মাদার তেরেসা, জ্যোতি বসু প্রমুখ দেশি-বিদেশি নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাকে হাসপাতালে গিয়ে সমবেদনা জানান।
এদিকে চৈতীকে আর রাজশাহী রাখাটা নিরাপদ মনে হয় না অনেকের কাছে। দ্রুত তাকে সরিয়ে আনা হয় ঢাকার পিজি হাসপাতালে। এরপর একবার তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। বিদেশি ডাক্তারদের একটি দল তার হাড়ে অপারেশন চালায়। ইতোমধ্যে তার শরীরে হাজার খানেক সেলাই করা হয়েছে। শত শত সেলাইবিহীন ব্যান্ডেজ মোড়া ক্ষত ঢেকে ফেলেছে তার সারা দেহ। কৃত্রিম রগ জুড়ে দেয়া হয়েছে শরীরের অনেক জায়গায়। মৃত্যুর মুখামুখি চৈতীকে এরপরও শিবিরের নিয়োগকৃত এজেন্টরা হাসপাতালের মধ্যে বার দুয়েক হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু বন্ধুদের অক্লান্ত রাতজাগা পাহারা তাদের সব প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করে। কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে টানা ২ বছর থাকতে হয় তাকে।
১৭ মার্চ ১৯৯২, রাবি'র ইতিহাসের এক কালো দিবস
![]() |
| (শহীদ ইয়াসীর আরাফাত পিটু) |
![]() |
(গুরুতর আহত আমীর আলী হলের জিএস জাসদ ছাত্রলীগ নেতা প্রিন্স ও লিটন) |
(শহীদ ইয়াসীর আরাফাত পিটু)
শিবিরের তেমনি এক নৃশংসতার সাক্ষী হয়ে আছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণ আদালতে একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচারের দিন যতই এগিয়ে আসছিল ততটাই মরিয়া হয়ে উঠছিল ৭১ এর পরাজিত শক্তি জামাত-শিবির চক্র। তারই অংশ হিসাবে এই সন্ত্রাসী সংগঠন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ধরনের একটা হামলার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি ছিল খুবই উত্তেজনাপূর্ণ। তেমনি এক সময় ১৭ মার্চ ১৯৯২ ইং, ফাকা ক্যাম্পাসে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রগতিশীল ছাত্র ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের উপর পুলিশের সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের বর্বরোতম হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রথম বর্ষের ছাত্র শহীদ ইয়াসীর আরাফাত পিটুকে। আহত করা হয় শতাধিক ছাত্রকে। গান পাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয় বিভিন্ন হল।
যাই হোক বলছিলাম রাবির ইতিহাসের এক কালো দিবসের কথা। সেই প্রসঙ্গে ফিরে যাই। ১৯৯২ এর ১৭ মার্চ জাসদ সমর্থিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (না-শ), ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র ইউনিয়নসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি রাগিব আহসান মুন্না, তৎকালীন জিএস রুহুল কুদ্দুস বাবু, ছাত্র মৈত্রী নেতা সাদাকাত হোসেন বাবুল খান, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ও সিনেট সদস্য আব্রাহাম লিংকনসহ ৬০ জন প্রগতিশীল নেতা কর্মীর নামে শিবির কর্তৃক দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে রাজশাহী শহরের সাহেব বাজার বড় রাস্তায় প্রতীক অনশন কর্মসূচীর ডাক দিয়েছিল। সেই কর্মসূচী সফল করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতা কর্মীরা যখন ক্যাম্পাস থেকে শহরে যায়। শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচী পালন শেষে সবাই মিছিল করে যখন ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন তখন শান্তিপূর্ণ সেই মিছিলের সামনে থাকা মেয়েদের সাথে পরিকল্পিতভাবে অসদাচরণ করে পুলিশ। এতে ছাত্রদের সাথে পুলিশের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের এক পর্যায়ে পুলিশ সেই মিছিলে বেধড়ক লাঠিচার্জ করে। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে মিছিল কারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ফিরতে থাকে। কিন্তু শহরের সেই ঘটনার সাথে সাথেই ফাকা মাঠে বিনা বাঁধায় সকল আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসের দখল নেয় চট্টগ্রামের কুখ্যাত সিরাজুস সালেহীন বাহিনীসহ কয়েক শত সশস্ত্র বহিরাগত শিবির সন্ত্রাসী । আর এই কাজে তাদের সহযোগিতা করে তখনকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এমএ মতিনের পুলিশ বাহিনী। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ কলাভবন থেকে ক্লাস করে বের হওয়া রাষ্ট্র বিজ্ঞান ১ম বর্ষের ছাত্র বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (না-শ) নেতা ইয়াসীর আরাফাত পিটুকে রোজা রাখা অবস্থায় ভিসির বাস ভবনের সামনে বুকে এবং পায়ে গুলী করে হত্যা করে জামাত শিবির চক্র ও তাদের দোসর পুলিশ বাহিনী। এসময় বুকে গুলিবিদ্ধ হন সেই সময়ের রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ক্যাম্পাসের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা নেতা মনোয়ার রুশো (এম এম রুশো, পরে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি)সহ আরও দুই ছাত্রনেতা।
শুধু পিটুকে হত্যাই নয় সেদিন শিবির সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত হন জাসদ ছাত্রলীগের আইভি, নির্মল, লেমন, রুশো, জাফু, ফারুক, আমীর আলী হল ছাত্র সংসদের জি এস প্রিন্স এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের রাজেশ সহ প্রায় দেড় শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী আহত হয়। এদের অধিকাংশেরই হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়া হয় এবং রাজেশের কব্জি কেটে ফেলা হয়। এই হামলার সময় শিবির ক্যাডাররা এস এম হল, আমির আলী হল এবং লতিফ হল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ব্যাপক আকারে গান পাউডারের ব্যবহার করায় হলের জানালার কাঁচগুলো গলে গিয়েছিলে। লতিফ হলের অনেকগুলো কক্ষ দীর্ঘ দিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। পুরো ক্যাম্পাস জুড়েই সেদিন তাণ্ডবলীলা চালায় শিবির সন্ত্রাসীরা। এই হামলার তীব্রতা এতই ছিল যে, বেলা ১১টায় শুরু হওয়া হামলা বিকেলে বিডিআর নামানোর আগ পর্যন্ত বন্ধ হয়নি।
এই ন্যক্কার জনক ঘটনার পরে তৎকালীন পাঁচ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় নেতা হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেননসহ একটা প্রতিনিধি দল রাজশাহী সফর করেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পরে ঢাকায় এসে সাংবাদিকদের কাছে নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে পাঁচ দলের নেতৃবৃন্দ বলেন, স্বাধীনতার ২১ বছর পরে আবারও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে শিবিরের ধ্বংসযজ্ঞ।
১৭ মার্চ ১৯৯২, রাবির ইতিহাসে রচিত হয় এক কালো অধ্যায়। মূলত সেদিনের তাণ্ডবের পর থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কাম্পাসে তাদের একক আধিপত্য বিস্তারের পথ উন্মোচিত হয়। পরে ১৯৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর শিবির সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র হামলায় ছাত্রদল নেতা বিশ্বজিৎ, সাধারণ ছাত্র নতুন এবং ছাত্র ইউনিয়নের তপন সহ ৫ জন ছাত্র নিহত হয়। একই বছর ১৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শেরেবাংলা হলে বহিরাগত সশস্ত্র শিবির ক্যাডাররা হামলা চালিয়ে ছাত্র মৈত্রী নেতা বিশ্ববিদ্যালয় টিমের মেধাবী ক্রিকেটার জুবায়ের চৌধুরী রিমুকে হাত-পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। এভাবেই ধীরে ধীরে রাবি ক্যাম্পাস সম্পূর্ণ শিবিরের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সর্বশেষ ২০১০ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ নেতা ফারুককে হত্যার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উৎখাত হয় তারা। সেই সাথে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে এবং তাদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ গ্রেফতার হলে কোন ঠাসা হয়ে পড়ে সন্ত্রাস নির্ভর সংগঠন ছাত্র শিবির। তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হওয়ার ধারাবাহিকতায় কয়েকজন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের সাজা হওয়ার প্রেক্ষিতে আবারও মরিয়া হয়ে উঠছে শিবির। গত কয়েক মাসে দেশব্যাপী তাদের তাণ্ডব সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নাই। বিশেষ করে সিটি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাঁরা বোমা ও গুলিবর্ষণ করে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে তারা।
যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, যে স্বপ্নের সফল বাস্তবায়নে প্রাণ দিয়েছেন শহীদ পিটু, সেই মৌলবাদী ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা কারীদের বিচার প্রক্রিয়া চলমান। অবশ্যই এই বাংলাদেশে একদিন ঐ সব দালালদের বিচার হবেই। বাংলার মাটিতে রাজাকার, আলবদরদের ঠাই নাই। বর্তমান সরকারের শেষ সময়ে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচার কাজ সম্পন্ন করা হোক।
(গুরুতর আহত আমীর আলী হলের জিএস জাসদ ছাত্রলীগ নেতা প্রিন্স ও লিটন)
পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রত্যাশী সকলকে এই বিচার সম্পর্কে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। যে কোন মূল্যে এই বিচার প্রক্রিয়া বাঁধাগ্রস্ত করার বিশেষ মিশনে আজ মাঠে নেমেছে একাধিক মুখোশ ধারী সুবিধাবাদী দালাল। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারীদের রক্ষায় আজ এমনই বেহায়া ও নগ্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছে যে মুখোশের আর দরকার মনে করছেনা এক “বীর মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডারের স্ত্রী”। অবশ্য এই মুখোশ অনেক আগেই উন্মোচিত হয়েছে এদেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাছে। বিভিন্ন ভাবে দেশকে বিশৃঙ্খল করার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দেশের মুক্তিকামী সচেতন ছাত্র জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সকল ভেদাভেদ ভুলে, সকল অহমিকা ত্যাগ করে প্রগতিশীল শক্তির বৃহত্তর ও কার্যকর ঐক্যই পারে বাংলার মাটি থেকে ইয়াহিয়া, আইয়ুব, রাও ফরমান, নিয়াজীদের প্রেতাত্মাদের সমূলে উচ্ছেদ করতে।
বাঙ্গালী বীরের জাতি। যুগে যুগে ক্ষুদিরাম, সূর্য সেন থেকে চট্টগ্রামের শাহাদাত, রাজশাহী মেডিকেলের শহীদ জামিল আক্তার রতন, সিলেটের শহীদ মুনীর, জুয়েল, তপন, নূতন, রাবির শহীদ পিটু, রিমু, ফারুক, রাজশাহীর মুকিমরা নিজেদের জীবন দিয়ে এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন। আজ জাতির প্রয়োজনে আসুন আরও একবার হাতে হাত রাখি, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করি, ১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৯০ এর চেতনায়। আবারও সংগঠিত হই ইস্পাত দৃঢ় মানসিকতায়, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের শুরু করা কাজ শেষ করার লক্ষে। অবশ্যই এই বাংলায় দালালদের বিচার হবে। “বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাটি, বুঝে নিক দুর্বৃত্ত, বুঝে নিক দালাল আলবদর, রাজাকাররা। বুঝে নিক দালালদের রক্ষায় ব্যস্ত রাজাকার, জামাত, শিবিরের পোষক প্রভুরা। বুঝে নিক ইতিহাসের আস্তাকুড় থেকে তুলে এনে কুখ্যাত রাজাকার শাহ্ আজিককে প্রধান মন্ত্রীর আসনে অধিষ্ঠিত করে যাওয়া সেই সব তথাকথিত 'পাকিস্তান পন্থী মুক্তিযোদ্ধার' বংসদবদেরা”।
শিবিরের আমলনামা ৩ ইতিহাসের ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড
গত প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে শিবির যে ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে, তার কিছু চিত্র তুলে ধরার জন্য এ আয়োজন ‘ছাত্র শিবিরের আমলনামা’।
আজ পড়ুন এর তৃতীয় কিস্তি]
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম চট্টগ্রামের ‘বহদ্দারহাট ট্রাজেডি’। শিবির দেশের সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড ঘটায় চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে।
২০০০ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে শিবির চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট মোড়ে একটি মাইক্রোবাসে থাকা ছাত্রলীগের আটজন নেতা-কর্মীকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ড দেখে দেশের মানুষ আবার তাদের বর্বরোচিত নারকীয়তার সাথে নতুন করে পরিচিত হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ অনুসন্ধানে গিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে শিবিরের অবস্থান যখন হুমকির মুখে পড়ে গিয়েছিল, তখনই তারা ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। এরই ধারাবাহিকতায় একেবারে পরিকল্পিতভাবে শিবির ক্যাডাররা গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে ছাত্রলীগের আট নেতাকর্মীকে।
এরপর ২০০১ সালে ২৯ ডিসেম্বর ফতেয়াবাদের ছড়ারকুল এলাকায় শিবির ক্যাডাররা ব্রাশফায়ারে হত্যা করে ছাত্রলীগ নেতা আলী মর্তুজাকে।
২০১০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নগরীর ষোলশহর রেলস্টেশনে কুপিয়ে হত্যা করে রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র এ এম মহিউদ্দিনকে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাওল হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। মহিউদ্দিন খুন হওয়ার পর শিবির মহিউদ্দিনকে নিজেদের কর্মী বলে দাবি করে!
এছাড়া চট্টগ্রামের ইতিহাসে আরেকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী হত্যাকাণ্ড। ২০০১ সালের ১৬ নভেম্বর শিবির ক্যাডাররা গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। দুর্গম এলাকা ফটিকছড়িতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে তারা পর্যায়ক্রমে ছাত্রলীগের বেশ কজন নেতা-কর্মীকে হত্যা করে। তাদের এই হত্যা ও রগকাটা রাজনীতি, সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কার্যকলাপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ইসলামী ছাত্র শিবিরকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অধিভুক্ত ন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম ফর স্টাডি অব টেরোরিজম অ্যান্ড রেসপন্স টু টেরোরিজমের তৈরি ফাইলে ছাত্র শিবিরের ব্যাপারে বলা হয়, ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জঙ্গি তৎপরতা চালানো ছাড়াও শিবির আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাথে নিজেদের একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
রাজশাহী শিবিরের ক্যান্টনমেন্ট?
রাজশাহীতে শিবির বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। গ্রাম থেকে শহরে বিস্তৃত রয়েছে তাদের নেটওয়ার্ক। শিক্ষাঙ্গন দখলের রাজনীতি শুরু করে শিবির তার ধারাবাহিকতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও তাদের কার্যক্রম শুরু করে।
১৯৭৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা চত্বরে এক জনসভার মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শিবির প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরুতেই তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম ছাত্র সংগঠন ছাত্রমৈত্রী আর জাসদ ছাত্রলীগের বাধার মুখে পড়ে। কিন্তু হত্যা আর রগকাটার রাজনীতি শুরু করে শিবির সেই বাধাকেও তুচ্ছ করে ফেলে। একপর্যায়ে শিবির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে শিবির চট্টগ্রামের মতো একই কায়দায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্রে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে তাদের শক্তিমত্তা বাড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোকে তারা বানিয়েছে তাদের মিনি ক্যান্টনমেন্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রাম বিনোদপুর, বুধপাড়া, মেহেরচন্ডী গ্রামে শিবিরের অনেক কর্মী ও ক্যাডার স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করে এসব গ্রামে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে। এছাড়া আত্মীয়তা সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার কারণে শিবিরের এসব কর্মী ও ক্যাডারদের কথায় স্থানীয় অনেকেই জামায়াত শিবিরের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। একে একে শিবির বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরোটাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।
অন্যদিকে গোটা রাজশাহী মহানগরজুড়ে প্রগতিশীল ও বাম সংগঠনগুলোর ব্যর্থতা, অদক্ষতা, কর্মক্ষমহীনতা, অসততা যত বেড়েছে শিবির বিপুল উদ্যোগে সেই ফাঁকা জায়গায় তাদের বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। মহানগরীজুড়ে কোচিং সেন্টার, মেস, ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ নানারকম ক্ষুদ্র ব্যবসায় তারা লগ্নি করেছে। এই অর্থলগ্নির একটা বড় অংশ শিবির সংগঠনের পেছনে খরচ করা হয়েছে। এই আর্থিক প্রণোদনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা গ্রামের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেক সমস্যা লাঘব করেছে। টিউশনি, লজিং ইত্যাদি জুগিয়ে ছাত্রজীবনে আর্থিক সহায়তার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবনে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরির নিশ্চয়তার ধারাবাহিক পথ তৈরি করে জামায়াত তাদের ছাত্র সংগঠনকে মজবুত করার কাজে লাগিয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে যে আর্থিক কর্মকাণ্ড তার অনেকটাই এখনও শিবিরের নিয়ন্ত্রণে। শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন দোকান, বাজার, পার্শ্ববর্তী গ্রামে দীর্ঘদিনের শ্রমে শিবির সমর্থকদের জুটিয়ে জামায়াত তাদের একটি শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করেছে।
রাজশাহীতে শিবিরের তাণ্ডব ও হত্যার খতিয়ান
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে শিবির নৃশংসতার পথ বেছে নেয়। প্রতিষ্ঠার পর রাজধানী ঢাকায় বাধা পেয়ে শিবির মফস্বল, গ্রাম আর শিক্ষাঙ্গন টার্গেট করে যে রাজনীতির পরিকল্পনা করে চট্টগ্রামের পর তারা এই হিংস্র ও খুনের রাজনীতির সফল প্রয়োগ করে রাজশাহীতে।
১৯৮২ সালের ১১ মার্চ প্রথমবারের মতো শিবির ক্যাডাররা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বাসভর্তি বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে এসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের ওপর হামলা চালায়। এই সহিংস ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৮৮ সালের ৩ মে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ মেইন হোস্টেলের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে শিক্ষার্থীদের সামনে ছাত্রমৈত্রী নেতা ডাক্তার জামিল আক্তার রতনকে কুপিয়ে ও হাত পায়ের রগ কেটে হত্যা করে শিবিরের ক্যাডাররা।
১৯৮৮ সালে রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জাসদ নেতা জালালকে তার নিজ বাড়ির সামনে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। ১৯৮৮ সালের ১৭ জুলাই ভোররাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা যখন ঘুমিয়ে, ঠিক সে সময়ে, বহিরাগত শিবির ক্যাডাররা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে জাসদ ছাত্রলীগের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতি ও সিনেট সদস্য আইয়ুব আলী খান, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সিনেট সদস্য আহসানুল কবির বাদল এবং হল সংসদের ভিপি নওশাদের হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়।
একই বছরের আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মো. ইউনুসের বাসভবনে শিবির বোমা হামলা করে।
১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির সন্ত্রাসীদের হাতে জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসির আরাফাত খুন হন। এ দিন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ছাত্র হল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ১৯৯২ সালের ১৯ জুন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে রাজাকারদের অন্যতম প্রধান গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে হরতাল কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যে জাসদের মিছিলে শিবিরের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। শিবিরের হামলায় ওই দিন সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে জাসদ নেতা মুকিম মারাত্মক আহত হন এবং ২৪ জুন তিনি মারা যান। একই বছরের আগস্ট মাসে শিবিরনিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয়-পার্শ্ববর্তী নতুন বুধপাড়া গ্রামে শিবির ক্যাডার মোজাম্মেলের বাড়িতে বোমা বানানোর সময় শিবির ক্যাডার আজিবরসহ অজ্ঞাতনামা অন্তত আরও তিনজন নিহত হয়।
১৯৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে শিবির সবচেয়ে বড় তাণ্ডবলীলা চালায় শিবিরের ক্যাডাররা। শিবিরের সন্ত্রাসীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। ছাত্রদল ও সাবেক ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মিলে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ওপর শিবিরের হামলায় ছাত্রদল নেতা বিশ্বজিৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নতুন এবং ছাত্র ইউনিয়নের তপনসহ ৫ জন ছাত্র নিহত হন। একই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর বহিরাগত সশস্ত্র শিবিরকর্মীরা শেরেবাংলা হলে হামলা চালিয়ে ছাত্রমৈত্রী নেতা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট দলের ক্রিকেটার জুবায়েদ চৌধুরী রিমুকে হাত-পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। ১৯৯৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি শিবিরকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী চৌদ্দপাই নামক স্থানে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী একটি বাসে হামলা চালিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী নেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য রূপমকে বাসের যাত্রীদের সামনে কুপিয়ে হত্যা করে। ১৯৯৬ সালে জাসাস বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আমানউল্লাহ আমানকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। ২০০১ সালে রাবি অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহাকে শিবিরকর্মীরা হাত-পা বেঁধে জবাই করে হত্যার চেষ্টা চালায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের হস্তক্ষেপে ওইদিন তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
২০০৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মো. ইউনুসকে ফজরের নামাজ পড়তে যাবার সময় কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। এর আগে ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে দুই দফায় ছাত্র শিবির অধ্যাপক ইউনুসকে হত্যার চেষ্টা করেছিল।
২০০৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াতপন্থী শিক্ষক মহিউদ্দিন এবং ছাত্র শিবির সভাপতি মাহবুব আলম সালেহীসহ আরও দুজন শিবির ক্যাডার একযোগে হামলা চালিয়ে রাবির ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবু তাহেরকে হত্যা করে। ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাতের আঁধারে বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করে তার লাশ ম্যানহোলে ফেলে রাখে শিবিরের ক্যাডাররা।
আগামী কিস্তিতে পড়ুন : চাঁদাবাজির অপর নাম বায়তুল মাল!
তবুও প্রকাশ্যে শিবির (মানবকন্ঠ)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন এ বিষয়ে সরকারকে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মানবকণ্ঠকে তিনি বলেন, শিবিরকে নিষিদ্ধ করলেই সমাধান হবে না। সবদিক থেকে চিন্তুা-ভাবনা করেই ইফেকটিভ কর্মপরিকল্পনা ঠিক করেই সরকারকে এগুতে হবে। এর আগে জেএমবি নিষিদ্ধ করা হলেও সম্প্রতি জেএমবির দণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামিকে ছিনতাই করে নিয়ে যেতে আমরা দেখেছি। এ ধরনের রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে গভীর ভাবনা দরকার।
ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে কিনা এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, এখনই কিছু বলতে পারব না। আগে সংবাদটির (সন্ত্রাসী সংগঠন) সত্যতা নির্ণয় করব। তারপর পরবর্তী করণীয় ঠিক করব। দেশের নিরাপত্তার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা দেশের সবাই জানে শিবির একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আগে দেশের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এখনই তাদের নিষিদ্ধের বিষয়টি সরকারের মাথায় নেই। তবে জনগণ সচেতন হলে তারা হারিয়ে যাবে। বাংলাদেশের জনগণ জঙ্গিবাদকে ঠাঁই দেবে না।
একাত্তরে নিষিদ্ধের পরও এখনো সক্রিয় শিবির। সর্বশেষ বিশ্বের ৩ নম্বর সন্ত্রাসী সংগঠন। তাদের উত্থানের পরিক্রমাটি এরকম :
‘সংঘ’ কেটে ‘শিবির’ যোগ: একাত্তরের ছাত্র সংঘই আজকের ছাত্রশিবির। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকালে প্রণীত ‘১৯৭২ সালের দালাল আইন’টি ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসে বাতিল করে দেন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। দালাল আইন বাতিলের ফলে জেলে আটক প্রায় সাড়ে ১০ হাজার রাজাকার সে সময় মুক্তি পেয়ে যায়।
১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্র“য়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ছাত্র সংঘের নতুন নাম হয় ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির’। শুধু ‘সংঘ’ বাদ দিয়ে ‘শিবির’ যুক্ত করা হয়, আর সবকিছুই একই থাকে। পতাকা, মনোগ্রাম সবই এক। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, এমনকি জেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তৃত নেতৃত্ব-কাঠামো সবই এক থাকে। মীর কাসেম আলীকে সভাপতি ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক করে জামায়াতের এই ছাত্র সংগঠন নতুন কার্যক্রম শুরু করে। দু’জনই মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত।
নতুন করে স্বাধীনতাবিরোধী কার্যকলাপ: নাম পরিবর্তন করে নতুনরূপে এলেও তাদের কার্যকলাপ আগের মতোই থাকে। এক বছরের মধ্যেই শিবির শুরু করে তাদের প্রথম অভিযান। ১৯৭৮ সালে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘অপরাজেয় বাংলা’ ভেঙে ফেলার জন্য স্বাক্ষরও গ্রহণ শুরু করে। এতে ছাত্রসমাজ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে রাতের অন্ধকারে তারা অপরাজেয় ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু সচেতন ছাত্রসমাজের প্রতিরোধের মুখে তারা পিছু হঠে এবং সেদিনের পর থেকে আজ পর্যন্ত তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। এরপর একইভাবে তারা জয়দেবপুরে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে। সেখানেও তারা ব্যর্থ হয়। তারপর ঢাকা ছেড়ে নিজেদের সারাদেশে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করে। শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখলের লড়াই।
ঢাকার বাইরে আস্তানা: ঢাকায় কর্মকাণ্ড চালাতে না পেরে তখন শিবির চট্টগ্রামে চলে যায়। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে শুরু হয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের হত্যার রাজনীতি। শিবিরের হাতে ১৯৮১ সালে প্রথম খুন হন চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ছাত্র সংসদের নির্বাচিত এজিএস ও ছাত্রলীগ নেতা তবারক হোসেন।
১৯৯০ সালের ২২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ এক মিছিল বের করে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্রমৈত্রী। মৌলবাদমুক্ত ক্যাম্পাসের দাবিতেই এই শান্তিপূর্ণ মিছিল। শুরু হয় মিছিলে শিবিরের গুলিবর্ষণ। নিহত হন ছাত্রমৈত্রী নেতা ফারুক। ফারুক হত্যার মধ্য দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের খুনের রাজনীতির শুরু। ১৯৯৩ সালে শিবির ক্যাম্পাসে তাদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এনামুল হকের ছেলে ছাত্রদল নেতা মোহাম্মদ মুছাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ২২ আগস্ট ১৯৯৮ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী সঞ্জয় তলাপাত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তারের পর আশির দশকের মাঝামাঝিতে শিবিরের টার্গেটে পরিণত হয় চট্টগ্রামের খ্যাতনামা কলেজগুলো। তাদের টার্গেটে প্রথম চট্টগ্রাম কলেজ, দ্বিতীয় সরকারি মহসীন কলেজ ও তৃতীয় চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। সন্ত্রাস ও হত্যার রাজনীতির মাধ্যমে চট্টগ্রাম কলেজ ও সরকারি মহসীন কলেজ পুরোপুরি নিজেদের দখলে নিয়ে নেয় ছাত্রশিবির। নিয়মিত মিছিল-মিটিং করে কলেজে আতঙ্ক সৃষ্টি করে শিবির। ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট দখল করার জন্য ছাত্রশিবিরের ক্যাডাররা ছাত্র সংসদের ভিপি মোহাম্মদ জমির ও ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ফরিদউদ্দিনকে গুলি করার পর তাদের হাত-পায়ের রগ কেটে হত্যা করে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম চট্টগ্রামের ‘বহদ্দারহাট ট্যাজেডি’। ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে শিবির চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট মোড়ে একটি মাইক্রোবাসে থাকা ছাত্রলীগের আটজন নেতা-কর্মীকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। এরপর ২০০১ সালে ২৯ ডিসেম্বর ফতেয়াবাদের ছড়ারকুল এলাকায় শিবির ক্যাডাররা ব্রাশফায়ারে হত্যা করে ছাত্রলীগ নেতা আলী মর্তুজাকে।
২০১০ সালের ১১ ফেব্র“য়ারি নগরীর ষোলশহর রেলস্টেশনে কুপিয়ে হত্যা করে রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র এএম মহিউদ্দিনকে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের ইতিহাসে আরেকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড গোপালকৃষ্ণ মুহুরী হত্যাকাণ্ড। ২০০১ সালের ১৬ নভেম্বর শিবির ক্যাডাররা গোপালকৃষ্ণ মুহুরীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। দুর্গম এলাকা ফটিকছড়িতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে তারা পর্যায়ক্রমে ছাত্রলীগের বেশ ক’জন নেতা-কর্মীকে হত্যা করে। তাদের এই হত্যা ও রগকাটা রাজনীতি, সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কার্যকলাপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অধিভুক্ত ন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম ফর স্টাডি অব টেরোরিজম অ্যান্ড রেসপন্স টু টেরোরিজমের তৈরি ফাইলে ছাত্রশিবিরের ব্যাপারে বলা হয়, ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জঙ্গি তৎপরতা চালানো ছাড়াও শিবির আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে নিজেদের একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
রাজশাহীতে শিবিরের তাণ্ডব ও হত্যার খতিয়ান: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে শিবির নৃশংসতার পথ বেছে নেয়। ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ প্রথমবারের মতো শিবির ক্যাডাররা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বাসভর্তি বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে এসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের ওপর হামলা চালায়। এই সহিংস ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৮৮ সালের ৩ মে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে শিক্ষার্থীদের সামনে ছাত্রমৈত্রী নেতা ডাক্তার জামিল আক্তার রতনকে কুপিয়ে ও হাত-পায়ের রগ কেটে হত্যা করে শিবিরের ক্যাডাররা। ১৯৮৮ সালে রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জাসদ নেতা জালালকে তার নিজ বাড়ির সামনে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির। ১৯৮৮ সালের ১৭ জুলাই ভোররাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা যখন ঘুমিয়ে, ঠিক সে সময়ে বহিরাগত শিবির ক্যাডাররা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে জাসদ ছাত্রলীগের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতি ও সিনেট সদস্য আইয়ুব আলী খান, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সিনেট সদস্য আহসানুল কবির বাদল এবং হল সংসদের ভিপি নওশাদের হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়।
একই বছরের আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মো. ইউনুসের বাসভবনে শিবির বোমাহামলা করে।
১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির সন্ত্রাসীদের হাতে জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসির আরাফাত খুন হন। এ দিন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ছাত্র হল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ১৯৯২ সালের ১৯ জুন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে রাজাকারদের অন্যতম প্রধান গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে হরতাল কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যে জাসদের মিছিলে শিবিরের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। শিবিরের হামলায় ওই দিন সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে জাসদ নেতা মুকিম মারাত্মক আহত হন এবং ২৪ জুন তিনি মারা যান। একই বছরের আগস্ট মাসে শিবির নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ্ববর্তী নতুন বুধপাড়া গ্রামে শিবির ক্যাডার মোজাম্মেলের বাড়িতে বোমা বানানোর সময় শিবির ক্যাডার আজিবরসহ অজ্ঞাতনামা অন্তত আরো তিনজন নিহত হয়।
১৯৯৩ সালের ৬ ফেব্র“য়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে শিবির সবচেয়ে বড় তাণ্ডবলীলা চালায় শিবিরের ক্যাডাররা। ছাত্রদল ও সাবেক ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মিলে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ওপর শিবিরের হামলায় ছাত্রদল নেতা বিশ্বজিৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নতুন এবং ছাত্র ইউনিয়নের তপনসহ ৫ জন ছাত্র নিহত হন। একই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর বহিরাগত সশস্ত্র শিবিরকর্মীরা শেরেবাংলা হলে হামলা চালিয়ে ছাত্রমৈত্রী নেতা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট দলের সদস্য জুবায়েদ চৌধুরী রিমুকে হাত-পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। ১৯৯৫ সালের ১৩ ফেব্র“য়ারি শিবিরকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী চৌদ্দপাই নামক স্থানে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী একটি বাসে হামলা চালিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী নেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য রূপমকে বাসের যাত্রীদের সামনে কুপিয়ে হত্যা করে। ১৯৯৬ সালে জাসাস বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আমানউল্লাহ আমানকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। ২০০৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মো. ইউনুসকে ফজরের নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। ২০০৬ সালের ৬ ফেব্র“য়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াতপন্থি শিক্ষক মহিউদ্দিন এবং ছাত্রশিবির সভাপতি মাহবুব আলম সালেহীসহ আরো দু’শিবির ক্যাডার একযোগে হামলা চালিয়ে রাবির ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবু তাহেরকে হত্যা করে। ২০১০ সালের ৮ ফেব্র“য়ারি রাতের আঁধারে বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে ছাত্রলীগকর্মী ফারুক হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করে তার লাশ ম্যানহোলে ফেলে রাখে শিবিরের ক্যাডাররা।




























