Friday, July 11, 2014
রগ কাঁটা রাজনীতির জনক শিবিরের মিনি ক্যান্টনমেন্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৮২-২০১৩)
![]() |
| (ছবি-শহীদ মুকিম, শহীদ রুপম, শহীদ রতন) |
ইসলামের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে কত ধরনের নৃশংসতা, অধার্মিকতা, কূটকৌশল আর স্বাধীনতার চেতনা বিরোধী কার্যকলাপ যে করে চলেছে জামায়াতের অঙ্গসংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির, তা অনেকেই জানেন না। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামাতের তৎকালীন ছাত্র সংস্থার নাম ছিল ইসলামী ছাত্র সংঘ। জেনারেল জিয়ার আমলে ১৯৭৭ সালে পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তারা ইসলামী ছাত্র শিবির নামে আত্মপ্রকাশ করে এবং রাজনীতি করার সুযোগ পায়। জিয়ার শাসনামল এবং পরবর্তীতে স্বৈরশাসক এরশাদের ছত্রছায়ায় লালিত পালিত ইসলামী ছাত্র সংঘের বাংলাদেশী ভার্সন ছাত্র শিবির আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে নামে তাদের শক্তি প্রদর্শনে। প্রাথমিকভাবে তাদের টার্গেট হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় গত তিন দশকে নিহত হয়েছে প্রায় ৩০ জন ছাত্র। তাদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি শিক্ষক পর্যন্ত। দুইজন শিক্ষককে হত্যা করে শিবির। এই লেখায় শুধু রাবিতে শিবিরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কিছু ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
১৯৮২ সালের ১১ মার্চ শিবির ক্যাম্পাসে প্রকাশ্য কর্মসূচি দিয়ে আয়োজন করে নবীন বরণ অনুষ্ঠান। এদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ৩ বাস বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে এসে শিবির ক্যাডাররা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের উপর হামলা চালায়। এই হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য ছাত্র সংগঠন বাধা দিলে সংঘর্ষে শিবিরের চারজন কর্মী মারা যান। আর শিবিরের হামলায় মারা যান ছাত্রলীগের নেতা মীর মোশতাক এলাহি।
এই ঘটনার পর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দখলের চেষ্টায় কিছুটা ভাটা পড়ে শিবিরের। তবে তারা বসে থাকেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে শিবির চট্টগ্রামের মতো একই কায়দায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্রে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে তাদের শক্তিমত্তা বাড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোকে তারা বানিয়েছে তাদের মিনি ক্যান্টনমেন্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রাম বিনোদপুর, বুধ পাড়া, মেহেরচন্ডী গ্রামে শিবিরের অনেক কর্মী ও ক্যাডার স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করে এসব গ্রামে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে। এছাড়া আত্মীয়তা সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার কারণে শিবিরের এসব কর্মী ও ক্যাডারদের কথায় স্থানীয় অনেকেই জামায়াত শিবিরের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এভাবে একে একে বিশ্ববিদ্যালয় আশে পাশের এলাকার পুরোটাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় তারা বা ঐ এলাকাগুলোতে নিজেদের অবস্থান সংহত করে।
রাবি দখলের পথে বড় ভূমিকা রাখে ছাত্র মৈত্রী রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ শাখার আহ্বায়ক ছাত্রনেতা জামিল আখতার রতন হত্যাকাণ্ড। ১৯৮৮ সালের ৩১ মে মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে অর্ধ শতাধিক শিক্ষকের সামনে হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ চালায় প্রথম রগ কেটে এবং পরে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে ছাত্রনেতা রতনকে। আর এই ঘটনার পর থেকেই শিবির রাজশাহীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোয় দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় নামে। শুরু হয় বর্বরোচিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য সর্বস্তরে নিন্দিত এই ছাত্র সংগঠনটির রগ কাটার রাজনীতি। হত্যা, সংঘর্ষ আর রগ কাটার মধ্য দিয়ে ছাত্রশিবির রাজশাহী মেডিকেল কলেজে আধিপত্য বিস্তার করে।
১৯৮২ সালের ১১ মার্চ শিবির ক্যাম্পাসে প্রকাশ্য কর্মসূচি দিয়ে আয়োজন করে নবীন বরণ অনুষ্ঠান। এদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ৩ বাস বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে এসে শিবির ক্যাডাররা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের উপর হামলা চালায়। এই হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য ছাত্র সংগঠন বাধা দিলে সংঘর্ষে শিবিরের চারজন কর্মী মারা যান। আর শিবিরের হামলায় মারা যান ছাত্রলীগের নেতা মীর মোশতাক এলাহি।
এই ঘটনার পর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দখলের চেষ্টায় কিছুটা ভাটা পড়ে শিবিরের। তবে তারা বসে থাকেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে শিবির চট্টগ্রামের মতো একই কায়দায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্রে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে তাদের শক্তিমত্তা বাড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোকে তারা বানিয়েছে তাদের মিনি ক্যান্টনমেন্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রাম বিনোদপুর, বুধ পাড়া, মেহেরচন্ডী গ্রামে শিবিরের অনেক কর্মী ও ক্যাডার স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করে এসব গ্রামে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে। এছাড়া আত্মীয়তা সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার কারণে শিবিরের এসব কর্মী ও ক্যাডারদের কথায় স্থানীয় অনেকেই জামায়াত শিবিরের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এভাবে একে একে বিশ্ববিদ্যালয় আশে পাশের এলাকার পুরোটাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় তারা বা ঐ এলাকাগুলোতে নিজেদের অবস্থান সংহত করে।
রাবি দখলের পথে বড় ভূমিকা রাখে ছাত্র মৈত্রী রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ শাখার আহ্বায়ক ছাত্রনেতা জামিল আখতার রতন হত্যাকাণ্ড। ১৯৮৮ সালের ৩১ মে মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে অর্ধ শতাধিক শিক্ষকের সামনে হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ চালায় প্রথম রগ কেটে এবং পরে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে ছাত্রনেতা রতনকে। আর এই ঘটনার পর থেকেই শিবির রাজশাহীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোয় দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় নামে। শুরু হয় বর্বরোচিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য সর্বস্তরে নিন্দিত এই ছাত্র সংগঠনটির রগ কাটার রাজনীতি। হত্যা, সংঘর্ষ আর রগ কাটার মধ্য দিয়ে ছাত্রশিবির রাজশাহী মেডিকেল কলেজে আধিপত্য বিস্তার করে।
![]() |
| (ছবি-ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম তৌহিদ) |
![]() |
| (ছবি - শহীদ জোবায়ের চৌধুরী রিমু) |
![]() |
| ( ছবি - ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারীর ঘটনায় আহত কয়েকজন) |
![]() |
| (ছবি-শহীদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস) |
তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণ দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে প্রগতিশীল বাম ছাত্র সংগঠনগুলো বিশেষ করে ছাত্র মৈত্রী, জাসদ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কর্মীদের প্রতিরোধের মুখে পরতে হয় তাদের। বেশ কয়েকবার নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় অন্যান্য সংগঠনগুলোর সাথে। ১৯৮৮ জুলাই মাসের একদম শুরুর দিকে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিয়ে শিবির ক্যাডাররা হামলা চালায় জাসদ ছাত্রলীগ নেতা কর্মীদের উপরে। সেদিনের অতর্কিত সেই হামলায় গুরুতর আহত হন আমির আলী হল ছাত্র সংসদের জিএস ও জাসদ ছাত্রলীগ নেতা প্রিন্স সহ ২০-২৫ জন। একই মাসের ১৭ জুলাই ভোরে সবাই যখন গভীর ঘুমে ঠিক সেই সময়ে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিয়ে শিবির ক্যাডাররা জাসদ ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত শাহ্ মখদুম হলে (এস এম হল) আক্রমণ চালিয়ে জাসদ ছাত্রলীগের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতি ও সিনেট সদস্য আইয়ূব আলী খান, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সিনেট সদস্য আহসানুল কবির বাদল এবং হল সংসদের ভিপি নওশাদের হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়।
এই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৮ সালের ১৭ নভেম্বর তিন হল এলাকায় মারা যান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসলাম হোসেন। পরদিন ১৮ নভেম্বর সংঘর্ষে মারা যান আজগর আলী। ১৯৮৯ সালের ১৮ এপ্রিল মারা যান শফিকুল ইসলাম। ১৯৯০ সালের ২২ জুন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে শিবিরের সংঘর্ষে নিহত হন খলিলুর রহমান। এভাবেই একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও নব্বই এর গন অভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় দখলের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয় শিবিরের।
অতঃপর ১৯৯১ সালে জামায়াতের সমর্থনে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয় বিএনপি। একের পর এক দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে সরকারী ছাত্র সংগঠন ও ছাত্র শিবির। এখানে একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, তা হচ্ছে শিবির শুধু হল বা ক্যাম্পাস দখল করেই ক্ষান্ত থাকেনি, তাদের লক্ষ্য ছিল সুদূর প্রসারী, তাই নিজেদের টার্গেট করা প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক পদগুলোতেও নিজেদের সমর্থকদের অবস্থান নিশ্চিত করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভিসি থেকে একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী পর্যন্ত সকল স্তরে নিজেদের দলীয় সমর্থকদের বসিয়ে রাবি দখলের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে শিবির।
১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ জন নেতা কর্মীর নামে শিবির কর্তৃক দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে জাসদ সমর্থিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (না-শ), ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র ইউনিয়নসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠন রাজশাহী শহরের সাহেব বাজার বড় রাস্তায় প্রতীক অনশন কর্মসূচীর ডাক দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতা কর্মীরা যখন ঐ অনশন কর্মসূচীতে তখন বেলা ১১ টার সময় চট্টগ্রামের কুখ্যাত সিরাজুস সালেহীন বাহিনীসহ কয়েক হাজার সশস্ত্র বহিরাগত শিবির সন্ত্রাসী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অতর্কিত হামলা চালিয়ে সকল আবাসিক হল ও ফাঁকা ক্যাম্পাসের দখল নেয় ছাত্র শিবির। আর এই কাজে তাদের সহযোগিতা করে তখনকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এম এ মতিনের পুলিশ বাহিনী এবং জামাত সমর্থিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পবিত্র রমজান মাসে এই হামলায় বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসীর আরাফাত পিটু। বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন জাসদ ছাত্রলীগের তৎকালীন রাজশাহী মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ও সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র মনোয়ার আলী রুশো। এছাড়াও জাসদ ছাত্রলীগের আইভি, নির্মল, লেমন, রুশো, জাফু, ফারুক এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের রাজেশ সহ প্রায় দেড় শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী আহত হয়। এদের অধিকাংশেরই হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়া হয় এবং রাজেশের কব্জি কেটে ফেলা হয়। এই হামলার সময় শিবির ক্যাডাররা এস এম হল, আমির আলী হল এবং লতিফ হল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ব্যাপক আকারে গান পাউডারের ব্যবহার করায় হলের জানালার কাঁচগুলো গলে গিয়েছিলে। লতিফ হলের অনেকগুলো কক্ষ দীর্ঘ দিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। এই হামলার তীব্রতা এতই ছিল যে, বেলা ১১টায় শুরু হওয়া হামলা বিডিআর নামানোর আগ পর্যন্ত বন্ধ হয়নি। এই ঘটনার পরে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়।
(ছবি - শহীদ ইয়াসীর আরাফাত পিটু)
উল্লেখ্য, এই পরিকল্পিত হামলা রাবিতে শিবিরের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক ধাপ সম্পন্ন করে। এছাড়া এই হামলা সংঘটিত হয় ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক গন আদালত গঠন করে গোলাম আজমের বিচারের সপ্তাহ খানেক আগে। এর পর থেকেই গন আদালতের রায় বাস্তবায়নের দাবীতে গড়ে ওঠে আন্দোলন। এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯ জুন তারিখে রাজশাহীতে হরতাল কর্মসূচির সমর্থনে জাসদের মিছিল চলাকালে শিবিরের সশস্ত্র হামলায় বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বুধ পাড়া এলাকার জাসদ নেতা মুকিমকে হত্যা করে (চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ২৪ জুন) শিবির সন্ত্রাসীরা।
এর আগে ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চের সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকাকালীন ০৭ মে বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ্ববর্তী নতুন বুধপাড়ায় শিবির ক্যাডার মোজাম্মেলের বাড়ীতে বোমা বানানোর সময় সন্ত্রাসী শিবির ক্যাডার আজিবর সহ অজ্ঞাতনামা অন্তত আরো তিন জন নিহত হয়। পরবর্তীতে পুলিশ মহল্লার একটি ডোবা থেকে অনেকগুলো খন্ডিত হাত পা উদ্ধার করে। যদিও সন্ত্রাসী শিবির আজিবর ছাড়া আর কারো মৃতু্র কথা স্বীকার করেনি।
দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকার পরে বিশ্ববিদ্যালয় খুললে প্রতিটি হলে এবং ক্যাম্পাসে নতুন রূপে আবির্ভূত হয় শিবির। পালটে যায় তাদের আচরণ। প্রতিটি হলের গেটে অবস্থান নেয়া, অন্যান্য সংগঠনের নেতা কর্মীদের ভয় ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে একটা ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করে তারা। ১৯৯৩ সালের ১৭ জানুয়ারী রাত এগারোটার দিকে সোহরাওয়ার্দী হল এবং শিবির নিয়ন্ত্রিত জোহা হল এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় মুহাম্মদ ইয়াহিয়া নামে একজনের মৃত্যু হয়। দুই সপ্তাহ পরেই ১৯৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর শিবির সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র হামলা চালায় শিবির। ভয়াবহ এই সংঘর্ষে ছাত্রদল নেতা বিশ্বজিৎ, নতুন এবং ছাত্র ইউনিয়নের তপন এবং শিবিরের মুস্তাফিজুর রহমান ও রবিউল ইসলাম নিহত হয়। আবারও অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়।
মূলত ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ এবং ৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারীতে শিবির পরিকল্পিত সন্ত্রাস বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রাখে। ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হতে থাকেন প্রগতিশীল সংগঠনের নেতা কর্মীরা। এমন অবস্থায় একই বছর ১৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শেরেবাংলা হলে বহিরাগত সশস্ত্র শিবির ক্যাডাররা হামলা চালিয়ে ছাত্র মৈত্রী নেতা বিশ্ববিদ্যালয় টিমের মেধাবী ক্রিকেটার জুবায়ের চৌধুরী রিমুকে হাত-পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করার মধ্য দিয়েই ক্যাম্পাসে তাদের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। কারণ ততোদিনে প্রগতিশীল সংগঠনগুলো ক্যাম্পাস ছাড়া।
(ছবি - শহীদ জোবায়ের চৌধুরী রিমু)
১৯৯৪ সালে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত ছাত্র মৈত্রী নেতা প্রদ্যুৎ রুদ্র চৈতী পরীক্ষা দিতে ক্যাম্পাসে আসার পথে তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনের সামনের রাস্তায় তার হাতের কব্জি কেটে নেয় শিবির কর্মীরা। ১৯৯৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ্ববর্তী চৌদ্দপাই নামক স্থানে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী সকাল-সন্ধ্যা বাসে হামলা চালিয়ে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী নেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য রুপমকে বাসের মধ্যে যাত্রীদের সামনে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির সন্ত্রাসীরা। হত্যার আগে বর্বর শিবির ক্যাডাররা তার হাত ও পায়ের রগ কেটে নেয়। একই বছর জুলাই মাসে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের ওপর সশস্ত্র শিবির কর্মীরা হামলা করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছাত্রনেতা ফরহাদের হাতের কব্জি কেটে নেয়। এ হামলায় প্রায় ২৫ জন ছাত্রদল নেতা-কর্মীর হাত পায়ের রগ কেটে নেয় শিবির ক্যাডাররা।
পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে জাসাস বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আমানউল্লাহ আমানকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। ১৯৯৭ সালে গভীর রাতে রাবি ক্যাম্পাসে বহিরাগত শিবির সন্ত্রাসীদের হামলায় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা আহত হয়। রাবি জিমনেসিয়াম পুলিশ ক্যাম্পেও বোমা হামলা করে সন্ত্রাসী শিবির।
একই বছর বঙ্গবন্ধু পরিষদের রাবি শাখার সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল খালেক, জিয়া পরিষদ নেতা হাবিবুর রহমান আকন্দ সহ প্রায় বিশ জন শিক্ষকের বাসায় বোমা হামলা ও অগ্নি সংযোগ করে সন্ত্রাসী ছাত্র শিবির। শিক্ষক সমিতির মিটিং থেকে ফেরার পথে ১৯৯৮ সালে রাবি শহীদ মিনারের সামনে দ্বিতীয় বারের মতো অধ্যাপক মোঃ ইউনুসের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় সন্ত্রাসী ছাত্র শিবির। ছাত্র-কর্মচারীদের প্রতিরোধে অধ্যাপক ইউনুস প্রাণে বেঁচে গেলেও মারাত্মক আহত হন তিনি। পরের বছর রাবিতে অবস্থিত ’৭১ এর গণকবরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য স্থাপিত ভিত্তি প্রস্তর রাতের আঁধারে সন্ত্রাসী ছাত্র শিবির ভাঙ্গতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মচারী বাধা দেন। ফলে সন্ত্রাসী শিবির ক্যাডাররা তাকে কুপিয়ে আহত করে এবং ভিত্তিপ্রস্তর ভেঙ্গে ফেলে। অথচ তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল আওয়ামীলীগ। ২০০১ সালে রাবি অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহাকে শিবির কর্মীরা হাত-পা বেঁধে জবাই করে হত্যার চেষ্টা চালায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের হস্তক্ষেপে ওইদিন তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ফজরের নামাজের ওয়াক্তে প্রাতঃভ্রমণ শেষে বাড়ি ফেরার সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায় নিজ বাসভবনের খুব কাছে ধারালো অস্ত্র হাতে অধ্যাপক ইউনুসের ওপর হামলা চালায় মানবতার শত্রু ও স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবিরের কিলিং স্কোয়াড । পরে তারা কুপিয়ে প্রগতিশীল এই শিক্ষককে হত্যা করে। এর আগে ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে দুই দফায় ছাত্র শিবির অধ্যাপক ইউনুসকে হত্যার চেষ্টা করেছিল।
(ছবি-শহীদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস)
২০০৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াত পন্থী শিক্ষক মহিউদ্দিন এবং ছাত্র শিবির সভাপতি মাহবুব আলম সালেহীসহ আরও দুজন শিবির ক্যাডার একযোগে হামলা চালিয়ে রাবির ভূতত্ত্ব ও খনি বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবু তাহেরকে হত্যা করে।
২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাতের আঁধারে বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করে তার লাশ ম্যানহোলে ফেলে রাখে শিবিরের ক্যাডাররা। এই হত্যাকাণ্ডের পরে কার্যত তারা ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয়।
ফারুক হত্যার পরে তারা ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হলেও থেমে থাকেনি তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। ২০১২ সালের ২১ নভেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের খালেদা জিয়া ও মন্নুজান হলের মাঝামাঝি স্থানে ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সহসভাপতি আখেরুজ্জামান তাকিমের ওপর হামলা চালিয়ে হাত-পায়ের রগ কেটে দেয় শিবির সন্ত্রাসীরা।
( ছবি - ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারীর ঘটনায় আহত কয়েকজন)
এবছরের ২৩ আগস্ট জাতীয় শোক উপলক্ষে সৈয়দ আমীর আলী হলে ছাত্রলীগের আলোচনা সভা শেষ করে রাত ১০টার দিকে পাঁচ-ছয়জন নেতাকর্মীসহ মাদার বখশ হলের দিকে যাওয়ার পথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম তৌহিদ আল হোসেন ওরফে তুহিনের হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয় শিবির সন্ত্রাসীরা। এসময় ছাত্রলীগের সমাজসেবা সম্পাদক শাওনের ডান বাহুতে বিদ্ধ হয়।
(ছবি-ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম তৌহিদ)
এদিকে দীর্ঘ দিন ঘরে ক্যাম্পাসে কোণঠাসা অবস্থায় থাকা শিবির সন্ত্রাসীরা আবারও সক্রিয় হচ্ছে রাবিতে। গত সিটি নির্বাচনে রাজশাহীতে মেয়র পদে চারদলীয় জোটের প্রার্থী জয়ী হওয়ার পর ঐ রাতেই রাবি ক্যাম্পাস তা উদযাপন করে শিবির বোমাবাজি করে। এরপর থেকে ক্যাম্পাস তাদের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেতে থাকে। দীর্ঘ আড়াই বছরের অনুপস্থিতির পরে বর্তমানে ক্যাম্পাসে তারা নিজেদের অবস্থান সংহত করছে।
তথ্যসূত্র :
বাংলা নিউজ টুয়েন্টি ফোর ডট কম
দৈনিক যুগান্তর
রাবির সাবেক ছাত্র নেতৃবৃন্দ।
এই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৮ সালের ১৭ নভেম্বর তিন হল এলাকায় মারা যান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসলাম হোসেন। পরদিন ১৮ নভেম্বর সংঘর্ষে মারা যান আজগর আলী। ১৯৮৯ সালের ১৮ এপ্রিল মারা যান শফিকুল ইসলাম। ১৯৯০ সালের ২২ জুন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে শিবিরের সংঘর্ষে নিহত হন খলিলুর রহমান। এভাবেই একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও নব্বই এর গন অভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় দখলের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয় শিবিরের।
অতঃপর ১৯৯১ সালে জামায়াতের সমর্থনে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয় বিএনপি। একের পর এক দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে সরকারী ছাত্র সংগঠন ও ছাত্র শিবির। এখানে একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, তা হচ্ছে শিবির শুধু হল বা ক্যাম্পাস দখল করেই ক্ষান্ত থাকেনি, তাদের লক্ষ্য ছিল সুদূর প্রসারী, তাই নিজেদের টার্গেট করা প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক পদগুলোতেও নিজেদের সমর্থকদের অবস্থান নিশ্চিত করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভিসি থেকে একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী পর্যন্ত সকল স্তরে নিজেদের দলীয় সমর্থকদের বসিয়ে রাবি দখলের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে শিবির।
১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ জন নেতা কর্মীর নামে শিবির কর্তৃক দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে জাসদ সমর্থিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (না-শ), ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র ইউনিয়নসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠন রাজশাহী শহরের সাহেব বাজার বড় রাস্তায় প্রতীক অনশন কর্মসূচীর ডাক দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতা কর্মীরা যখন ঐ অনশন কর্মসূচীতে তখন বেলা ১১ টার সময় চট্টগ্রামের কুখ্যাত সিরাজুস সালেহীন বাহিনীসহ কয়েক হাজার সশস্ত্র বহিরাগত শিবির সন্ত্রাসী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অতর্কিত হামলা চালিয়ে সকল আবাসিক হল ও ফাঁকা ক্যাম্পাসের দখল নেয় ছাত্র শিবির। আর এই কাজে তাদের সহযোগিতা করে তখনকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এম এ মতিনের পুলিশ বাহিনী এবং জামাত সমর্থিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পবিত্র রমজান মাসে এই হামলায় বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসীর আরাফাত পিটু। বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন জাসদ ছাত্রলীগের তৎকালীন রাজশাহী মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ও সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র মনোয়ার আলী রুশো। এছাড়াও জাসদ ছাত্রলীগের আইভি, নির্মল, লেমন, রুশো, জাফু, ফারুক এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের রাজেশ সহ প্রায় দেড় শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী আহত হয়। এদের অধিকাংশেরই হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়া হয় এবং রাজেশের কব্জি কেটে ফেলা হয়। এই হামলার সময় শিবির ক্যাডাররা এস এম হল, আমির আলী হল এবং লতিফ হল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ব্যাপক আকারে গান পাউডারের ব্যবহার করায় হলের জানালার কাঁচগুলো গলে গিয়েছিলে। লতিফ হলের অনেকগুলো কক্ষ দীর্ঘ দিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। এই হামলার তীব্রতা এতই ছিল যে, বেলা ১১টায় শুরু হওয়া হামলা বিডিআর নামানোর আগ পর্যন্ত বন্ধ হয়নি। এই ঘটনার পরে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়।
(ছবি - শহীদ ইয়াসীর আরাফাত পিটু)
উল্লেখ্য, এই পরিকল্পিত হামলা রাবিতে শিবিরের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক ধাপ সম্পন্ন করে। এছাড়া এই হামলা সংঘটিত হয় ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক গন আদালত গঠন করে গোলাম আজমের বিচারের সপ্তাহ খানেক আগে। এর পর থেকেই গন আদালতের রায় বাস্তবায়নের দাবীতে গড়ে ওঠে আন্দোলন। এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯ জুন তারিখে রাজশাহীতে হরতাল কর্মসূচির সমর্থনে জাসদের মিছিল চলাকালে শিবিরের সশস্ত্র হামলায় বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বুধ পাড়া এলাকার জাসদ নেতা মুকিমকে হত্যা করে (চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ২৪ জুন) শিবির সন্ত্রাসীরা।
এর আগে ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চের সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকাকালীন ০৭ মে বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ্ববর্তী নতুন বুধপাড়ায় শিবির ক্যাডার মোজাম্মেলের বাড়ীতে বোমা বানানোর সময় সন্ত্রাসী শিবির ক্যাডার আজিবর সহ অজ্ঞাতনামা অন্তত আরো তিন জন নিহত হয়। পরবর্তীতে পুলিশ মহল্লার একটি ডোবা থেকে অনেকগুলো খন্ডিত হাত পা উদ্ধার করে। যদিও সন্ত্রাসী শিবির আজিবর ছাড়া আর কারো মৃতু্র কথা স্বীকার করেনি।
দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকার পরে বিশ্ববিদ্যালয় খুললে প্রতিটি হলে এবং ক্যাম্পাসে নতুন রূপে আবির্ভূত হয় শিবির। পালটে যায় তাদের আচরণ। প্রতিটি হলের গেটে অবস্থান নেয়া, অন্যান্য সংগঠনের নেতা কর্মীদের ভয় ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে একটা ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করে তারা। ১৯৯৩ সালের ১৭ জানুয়ারী রাত এগারোটার দিকে সোহরাওয়ার্দী হল এবং শিবির নিয়ন্ত্রিত জোহা হল এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় মুহাম্মদ ইয়াহিয়া নামে একজনের মৃত্যু হয়। দুই সপ্তাহ পরেই ১৯৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর শিবির সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র হামলা চালায় শিবির। ভয়াবহ এই সংঘর্ষে ছাত্রদল নেতা বিশ্বজিৎ, নতুন এবং ছাত্র ইউনিয়নের তপন এবং শিবিরের মুস্তাফিজুর রহমান ও রবিউল ইসলাম নিহত হয়। আবারও অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়।
মূলত ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ এবং ৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারীতে শিবির পরিকল্পিত সন্ত্রাস বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রাখে। ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হতে থাকেন প্রগতিশীল সংগঠনের নেতা কর্মীরা। এমন অবস্থায় একই বছর ১৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শেরেবাংলা হলে বহিরাগত সশস্ত্র শিবির ক্যাডাররা হামলা চালিয়ে ছাত্র মৈত্রী নেতা বিশ্ববিদ্যালয় টিমের মেধাবী ক্রিকেটার জুবায়ের চৌধুরী রিমুকে হাত-পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করার মধ্য দিয়েই ক্যাম্পাসে তাদের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। কারণ ততোদিনে প্রগতিশীল সংগঠনগুলো ক্যাম্পাস ছাড়া।
(ছবি - শহীদ জোবায়ের চৌধুরী রিমু)
১৯৯৪ সালে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত ছাত্র মৈত্রী নেতা প্রদ্যুৎ রুদ্র চৈতী পরীক্ষা দিতে ক্যাম্পাসে আসার পথে তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনের সামনের রাস্তায় তার হাতের কব্জি কেটে নেয় শিবির কর্মীরা। ১৯৯৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ্ববর্তী চৌদ্দপাই নামক স্থানে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী সকাল-সন্ধ্যা বাসে হামলা চালিয়ে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী নেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য রুপমকে বাসের মধ্যে যাত্রীদের সামনে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির সন্ত্রাসীরা। হত্যার আগে বর্বর শিবির ক্যাডাররা তার হাত ও পায়ের রগ কেটে নেয়। একই বছর জুলাই মাসে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের ওপর সশস্ত্র শিবির কর্মীরা হামলা করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছাত্রনেতা ফরহাদের হাতের কব্জি কেটে নেয়। এ হামলায় প্রায় ২৫ জন ছাত্রদল নেতা-কর্মীর হাত পায়ের রগ কেটে নেয় শিবির ক্যাডাররা।
পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে জাসাস বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আমানউল্লাহ আমানকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। ১৯৯৭ সালে গভীর রাতে রাবি ক্যাম্পাসে বহিরাগত শিবির সন্ত্রাসীদের হামলায় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা আহত হয়। রাবি জিমনেসিয়াম পুলিশ ক্যাম্পেও বোমা হামলা করে সন্ত্রাসী শিবির।
একই বছর বঙ্গবন্ধু পরিষদের রাবি শাখার সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল খালেক, জিয়া পরিষদ নেতা হাবিবুর রহমান আকন্দ সহ প্রায় বিশ জন শিক্ষকের বাসায় বোমা হামলা ও অগ্নি সংযোগ করে সন্ত্রাসী ছাত্র শিবির। শিক্ষক সমিতির মিটিং থেকে ফেরার পথে ১৯৯৮ সালে রাবি শহীদ মিনারের সামনে দ্বিতীয় বারের মতো অধ্যাপক মোঃ ইউনুসের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় সন্ত্রাসী ছাত্র শিবির। ছাত্র-কর্মচারীদের প্রতিরোধে অধ্যাপক ইউনুস প্রাণে বেঁচে গেলেও মারাত্মক আহত হন তিনি। পরের বছর রাবিতে অবস্থিত ’৭১ এর গণকবরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য স্থাপিত ভিত্তি প্রস্তর রাতের আঁধারে সন্ত্রাসী ছাত্র শিবির ভাঙ্গতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মচারী বাধা দেন। ফলে সন্ত্রাসী শিবির ক্যাডাররা তাকে কুপিয়ে আহত করে এবং ভিত্তিপ্রস্তর ভেঙ্গে ফেলে। অথচ তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল আওয়ামীলীগ। ২০০১ সালে রাবি অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহাকে শিবির কর্মীরা হাত-পা বেঁধে জবাই করে হত্যার চেষ্টা চালায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের হস্তক্ষেপে ওইদিন তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ফজরের নামাজের ওয়াক্তে প্রাতঃভ্রমণ শেষে বাড়ি ফেরার সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায় নিজ বাসভবনের খুব কাছে ধারালো অস্ত্র হাতে অধ্যাপক ইউনুসের ওপর হামলা চালায় মানবতার শত্রু ও স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবিরের কিলিং স্কোয়াড । পরে তারা কুপিয়ে প্রগতিশীল এই শিক্ষককে হত্যা করে। এর আগে ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে দুই দফায় ছাত্র শিবির অধ্যাপক ইউনুসকে হত্যার চেষ্টা করেছিল।
(ছবি-শহীদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস)
২০০৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াত পন্থী শিক্ষক মহিউদ্দিন এবং ছাত্র শিবির সভাপতি মাহবুব আলম সালেহীসহ আরও দুজন শিবির ক্যাডার একযোগে হামলা চালিয়ে রাবির ভূতত্ত্ব ও খনি বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবু তাহেরকে হত্যা করে।
২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাতের আঁধারে বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করে তার লাশ ম্যানহোলে ফেলে রাখে শিবিরের ক্যাডাররা। এই হত্যাকাণ্ডের পরে কার্যত তারা ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয়।
ফারুক হত্যার পরে তারা ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হলেও থেমে থাকেনি তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। ২০১২ সালের ২১ নভেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের খালেদা জিয়া ও মন্নুজান হলের মাঝামাঝি স্থানে ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সহসভাপতি আখেরুজ্জামান তাকিমের ওপর হামলা চালিয়ে হাত-পায়ের রগ কেটে দেয় শিবির সন্ত্রাসীরা।
( ছবি - ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারীর ঘটনায় আহত কয়েকজন)
এবছরের ২৩ আগস্ট জাতীয় শোক উপলক্ষে সৈয়দ আমীর আলী হলে ছাত্রলীগের আলোচনা সভা শেষ করে রাত ১০টার দিকে পাঁচ-ছয়জন নেতাকর্মীসহ মাদার বখশ হলের দিকে যাওয়ার পথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম তৌহিদ আল হোসেন ওরফে তুহিনের হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয় শিবির সন্ত্রাসীরা। এসময় ছাত্রলীগের সমাজসেবা সম্পাদক শাওনের ডান বাহুতে বিদ্ধ হয়।
(ছবি-ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম তৌহিদ)
এদিকে দীর্ঘ দিন ঘরে ক্যাম্পাসে কোণঠাসা অবস্থায় থাকা শিবির সন্ত্রাসীরা আবারও সক্রিয় হচ্ছে রাবিতে। গত সিটি নির্বাচনে রাজশাহীতে মেয়র পদে চারদলীয় জোটের প্রার্থী জয়ী হওয়ার পর ঐ রাতেই রাবি ক্যাম্পাস তা উদযাপন করে শিবির বোমাবাজি করে। এরপর থেকে ক্যাম্পাস তাদের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেতে থাকে। দীর্ঘ আড়াই বছরের অনুপস্থিতির পরে বর্তমানে ক্যাম্পাসে তারা নিজেদের অবস্থান সংহত করছে।
তথ্যসূত্র :
বাংলা নিউজ টুয়েন্টি ফোর ডট কম
দৈনিক যুগান্তর
রাবির সাবেক ছাত্র নেতৃবৃন্দ।










