.

Sunday, June 29, 2014

মেহেরপুরে দলীয় প্রত্যয়ন, জামিন

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/198538/%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B9%E0%A7%87%E0%A6%B0%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%87_%E0%A6%A6%E0%A6%B2%E0%A7%80%E0%A7%9F_%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%9F%E0%A6%A8_%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A8
মাহবুব আলম ও তুহিন আরন্য, মেহেরপুর থেকে ফিরে |  এপ্রিল ২২, ২০১৪
মেহেরপুরে গণমামলায় পুলিশের ‘আটক-বাণিজ্যের’ পাশাপাশি সরকারদলীয় নেতাদের ‘প্রত্যয়ন-বাণিজ্য’ আলোচিত হচ্ছে। টাকার বিনিময়ে বিএনপি-জামায়াতের কর্মীদের নিজ দলের নেতা বলে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন এসব নেতা। আর আদালত তা আমলে নিয়ে আসামিদের জামিন দিয়েছেন।
এমনই পাঁচটি ঘটনা অনুসন্ধান করে প্রথম আলো এর সত্যতা পেয়েছে।
সংসদ নির্বাচনের আগে মেহেরপুরেও বিএনপি-জামায়াত সহিংসতার ঘটনা ঘটায়। একটি গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া তথ্যমতে, ওই সব ঘটনায় গত বছরের ১ মার্চ থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেহেরপুরে ২৪টি মামলায় ১৫ হাজার ৯৮৬ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত ৮৫৩ জন এবং অজ্ঞাতনামা ১৫ হাজার ১৩৩ জন। প্রতিটি মামলায় সব আসামিকে বিএনপি, জামায়াতের নেতা-কর্মী ও সমর্থক বলা হলেও পুলিশ অনেক সাধারণ ব্যক্তিকেও গ্রেপ্তার করে। এ নিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে আটক-বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। আর জামিনে মুক্তির জন্য ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ‘সনদ-বাণিজ্য’ শুরু করেন।
১৯ জেলার ‘১০১ পুলিশের আটক-বাণিজ্য, আয় দেড় কোটি টাকা’ শিরোনামে ২৭ মার্চ প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে মেহেরপুরে সবচেয়ে বেশি আটক-বাণিজ্য হয়েছে। ওই সব পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দিয়েছে। তবে সনদ-বাণিজ্যের জন্য দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য এখনো জানা যায়নি।
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা আওয়ামী লীগ সরকারকে হটাতে রাজপথে সহিংসতা, ভাঙচুর, পুলিশের ওপর হামলাসহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিয়েছেন। তবে ‘তাঁরা জননেত্রী শেখ হাসিনার ডাকে সাড়া দিয়ে রাজপথের বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন’ বলে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাদের প্রত্যয়নপত্র পেয়েছেন। মেহেরপুরের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের দেওয়া পাঁচটি জামিন আদেশে এমন প্রত্যয়নের উল্লেখ আছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এঁদের মধ্যে বিএনপি-জামায়াতের তিনজনকে দলীয় নেতা-কর্মী হিসেবে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন মেহেরপুর কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক ওয়াসিম সাজ্জাদ, মেহেরপুর পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম ও মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার সাধারণ সম্পাদক মো. আ. ছাত্তার।
ওয়াসিম ও ছাত্তার প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার কথা প্রথম আলোর কাছে স্বীকার করেছেন। তাঁরা এও স্বীকার করেছেন, তাঁদের সংগঠনের নেতা বলে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া দুই আসামি আসলে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
মেহেরপুর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক বারিকুল ইসলাম রাজনৈতিক পরিচয় জানা যায়নি এমন এক আসামিকে সংগঠনের নেতা বলে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন। এক আসামিকে তাঁর আইনজীবীই দলীয় প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতা উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন মামলার শতাধিক আসামি বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীদের নিজেদের নেতা-কর্মী বলে প্রত্যয়ন করেছেন। এর জন্য জনপ্রতি অন্তত ১৫ হাজার টাকা করে নিয়েছেন।
তবে কথিত দলীয় প্রত্যয়নে জামিন পাওয়ায় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনসহ গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে সরকারের পক্ষে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ জামিনের জন্য যে কারণ হতে পারে, সেটা জানা ছিল না। এটি নিঃসন্দেহ, এ ধরনের কারণে জামিন দেওয়াটা অস্বাভাবিক এবং এই ধরনের জামিন বিচারব্যবস্থায় আস্থাহীনতা তৈরি হওয়ার কারণ জোগায়।’
জামায়াত নেতা হয়ে গেলেন কৃষক লীগ নেতা: আসামি মো. নজরুল ইসলামের বাড়ি মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ধানখোলা ইউনিয়নের জুগিন্দা গ্রামে। তিনিসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা ৩০০-৪০০ জনের বিরুদ্ধে গত বছরের ১ ডিসেম্বর গাংনী থানায় মামলা করে পুলিশ।
আসামি নজরুলের জামিনের আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন।’ আর জামিন আদেশে বলা হয়েছে, ‘আসামি গাংনী ধানখোলা ইউনিয়ন শাখা বাংলাদেশ কৃষক লীগের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করে আসছেন, পাশাপাশি জননেত্রী শেখ হাসিনার ডাকে বিগত দিনে সাড়া দিয়ে রাজপথের বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে আসছেন মর্মে বাংলাদেশ কৃষক লীগের জেলা শাখা মেহেরপুরের সাধারণ সম্পাদক মো. ওয়াসিম সাজ্জাদ (লিখন) প্যাডে লিখিত প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন।’ আদেশে আরও বলা হয়, ‘দরখাস্তকারী মেহেরপুর জেলার গাংনী থানাধীন জুগিন্দা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন লাইব্রেরিয়ান। তিনি আটক থাকায় স্কুলে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হইতেছে মর্মে প্রধান শিক্ষক প্রত্যয়ন করিয়াছেন।...এই আসামি অপর একটি জিআর মামলায় অত্র আদালত হইতে জামিন লাভ করিয়াছে। এমতাবস্থায় সার্বিক বিষয় বিবেচনা করিয়া আসামির জামিনের আবেদন মঞ্জুর হয়।’
নজরুল ইসলামকে সনদ দেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে কৃষক লীগের নেতা ওয়াসিম সাজ্জাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘নজরুল ইসলামকে চিনি। তিনি জামায়াত করেন। তবে কালচারাল মাইন্ডের। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে থেকে মানুষের উপকার করার চেষ্টা করি। সেই বিবেচনায় সনদ দিয়েছি।’
ওয়াসিম দাবি করেন, তিনি কোনো অর্থ না নিয়েই জামিন পাওয়ার সুবিধার্থে শতাধিক ব্যক্তিকে এমন সনদ দিয়েছেন।
ধানখোলা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুর রাজ্জাক জানান, নজরুল ইসলাম পারিবারিকভাবে জামায়াতের রাজনীতি করেন। নজরুলসহ বিভিন্নজনকে জামিনের জন্য দলীয় সনদ দেওয়ার বিনিময়ে এবার ব্যাপক বাণিজ্য হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
বিএনপির লোক শ্রমিক লীগের কর্মী: একই মামলার আরেক আসামি মো. আসাদুল ইসলাম ওরফে আশা তাঁর জামিন আবেদনে বলেন, গাংনী বাজারে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। পুলিশ সন্দেহ করে তাঁকে এই মামলায় জড়িয়েছে।
জামিন আদেশে বলা হয়, আসামি মো. আসাদুল ইসলাম গাংনী উপজেলা ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করে আসছেন। পাশাপাশি শেখ হাসিনার ডাকে সাড়া দিয়ে শ্রমিকদের ন্যায়সংগত দাবি-দাওয়ার প্রতিটি আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে আসছেন মর্মে জাতীয় শ্রমিক লীগ উপজেলা শাখা, গাংনী মেহেরপুরের সাধারণ সম্পাদক মো. আ. ছাত্তার লিখিত প্রত্যয়ন করেছেন। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে আসামির জামিন মঞ্জুর করেন আদালত।
জানতে চাইলে আ. ছাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আসাদুল বিএনপির সক্রিয় কর্মী। রাজনীতির স্বার্থে অনেক সময় অনেক কিছু করতে হয়। জামিন প্রশ্নে এ রকম ১০ জনকে সনদ দিয়ে উপকার করেছি।’
ছাত্তার বলেন, ‘জেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ওয়াসিম সাজ্জাদের অনুরোধে আসাদুলকে শ্রমিক লীগের ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক বলে সনদ দিয়েছি।’
পরস্পরবিরোধী আবেদন: একই ধরনের আরেকটি মামলার আসামি মো. ইবাদত জামিনের আবেদনে বলেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন।
আদালত জামিন আদেশে বলেন, এজাহারে এই আসামির নাম নেই। আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেছেন, দরখাস্তকারী আসামি আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় সদস্য। এমতাবস্থায় সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে জামিন আবেদন মঞ্জুর করা হয়।
আবেদনে কৃষক লীগ, আদেশে যুবলীগ: একই মামলার আসামি মোমিনুল তাঁর জামিনের আবেদনে বলেন, তিনি বাংলাদেশ কৃষক লীগের একজন সদস্য। তাঁকে সন্দেহ করে এই মামলায় জড়িত করা হয়েছে।
জামিন আদেশে বলা হয়, ‘এজাহারে দরখাস্তকারী আসামির নাম নাই। দরখাস্তকারী যুবলীগের মেহেরপুর শহর শাখার একজন সক্রিয় সদস্য এবং আওয়ামী পরিবারের সন্তান মর্মে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ মেহেরপুর শহর শাখার সাধারণ সম্পাদকের প্যাডে লিখিতভাবে প্রত্যয়ন করিয়াছেন। বিজ্ঞ পিপি সাহেব উক্তরূপ প্রত্যয়ন বিষয়ে কোনো আপত্তি করেন নাই। এমতাবস্থায় সার্বিক বিষয় বিবেচনা করিয়া আসামির জামিন আবেদন মঞ্জুর হয়।’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আসামি মোমিনুলের পুরো নাম মোমিনুল ইসলাম। তিনি মেহেরপুর কারাগার-সংলগ্ন খন্দকারপাড়ার প্রয়াত আবদুল জলিলের ছেলে। খন্দকারপাড়ার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, জামায়াত-সমর্থক মোমিনুলের সঙ্গে তাঁর প্রতিবেশী আওয়ামী লীগের নেতা শহিদুল ইসলামের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। এর জের ধরে শহিদুল তাঁকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার করান।
জানতে চাইলে মেহেরপুর শহর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, তিনি মোমিনুল নামের কাউকে প্রত্যয়নপত্র দেননি। তাঁর স্বাক্ষর জাল করে কেউ প্রত্যয়নপত্র দিতে পারেন।
ভুয়া পদ, ভুয়া সনদ: মেহেরপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা আসামি আ. রশিদ তাঁর জামিনের আবেদনে উল্লেখ করেন, তিনি কথিত ঘটনার সঙ্গে আদৌ জড়িত নন। তাঁকে জিআর ৭৬৪/১৩ নম্বর মামলায় চালান দিলে আদালত গত ৮ ডিসেম্বর তাঁকে জামিন দেন। ওই দিনই জিআর ৫১৯/১৩ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাঁকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখান।
আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. বারিকুল ইসলাম তাঁর প্যাডে লিখিত প্রত্যয়নে বলেছেন, আ. রশিদ মেহেরপুর জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি হিসেবে সম্পৃক্ত থেকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। পিপি ওই প্রত্যয়নের বিষয়ে কোনো আপত্তি উত্থাপন করেননি।
ছাত্রলীগের নেতা বারিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের মাত্র চার সদস্যের কমিটি। আ. রশিদ নামের কোনো সহসভাপতি নেই। রশিদ নামের কাউকে প্রত্যয়ন দিইনি। কেউ আমার সই জাল করে সনদ দিতে পারেন।’