.

Friday, September 24, 2021

বিশ্বখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট শহীদ অধ্যাপক ডাঃ ফজলে রাব্বি।

লেখক : Dr. Zafrullah Chowdhury  স্যার এর ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া 

এই ফজলে রাব্বি তিনি,  সমগ্র পাকিস্তানকে সাত বার আটি দরে বিক্রি করলেও তাঁর মস্তিষ্কের দাম  উঠবে না৷ সেই ফজলে রাব্বি তিনি যিনি হতে পারতেন বাংলাদেশের  প্রথম  নোবেলজয়ী চিকিৎসা বিজ্ঞানী।

তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিকেলের এমবিবিএস  চূড়ান্ত পরীক্ষায়  শীর্ষস্থান অধিকারী ছাত্র।   মাত্র ৩২ বছর বয়সে  ১৯৬৪ সালে  মেডিসিনের উপর তাঁর বিখ্যাত  কেস স্টাডি   'A case of congenital hyperbilirubinaemia ( DUBIN-JOHNSON SYNDROME) in Pakistan' প্রকাশিত হয়েছিলে  বিশ্বখ্যাত  গবেষণা জার্নাল 'জার্নাল অব ট্রপিক্যাল  মেডিসিন হাইজিন'  এ। 

মাত্র ৩৮ বছর বয়সে ১৯৭০ সালে তাঁর  বিশ্বখ্যাত  গবেষণা Spirometry in tropical pulmonary eosinophilia প্রকাশিত হয়েছিলো  ব্রিটিশ জার্নাল অফ দা ডিসিস অফ চেস্ট  ও ল্যান্সেট এ। 

১৯৭০ সালে মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই ডাঃ ফজলে রাব্বি মনোনীত হয়েছিলেন পাকিস্তানের সেরা অধ্যাপক পুরস্কারের জন্য। কিন্তু  তাঁর আত্মায় ছিলো বাংলার অসহায়র্ত মানুষ। ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছিলেন তিনি সেই পুরুষ্কার। 

মাত্র ৩৯ বছর বয়সী ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রফেসর অব ক্লিনিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড কার্ডিওলজিস্ট। আজকের দিনে কল্পনা করা যায়? 

মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় তিনি আহত মানুষদের  সেবা দিয়েছেন মেডিকেলে বসে। বেশ কয়েকদফা নিজের সাধ্যের চেয়ে বেশী ঔষধ আর অর্থ সহায়তা দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের  পরিচয় গোপন রেখে দিয়েছিলেন চিকিৎসাও। 

মুক্তিযুদ্ধের  ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর ডাঃ ফজলে রাব্বির স্ত্রী জাহানারা রাব্বী  একই স্বপ্ন দুবার  দেখলেন। স্বপ্নটা এমন  একটা সাদা সুতির চাদর গায়ে তিনি তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে জিয়ারত করছেন এমন একটা জায়গায়, যেখানে চারটা কালো থামের মাঝখানে সাদা চাদরে ঘেরা কী যেন।

১৫ই ডিসেম্বর সকালে জাহানারা রাব্বী এ স্বপ্নের কথা বললেন ফজলে রাব্বিকে। রাব্বি বললেন, ‘তুমি বোধ হয় আমার কবর দেখেছ’। ভয় পেলেন জাহানারা রাব্বি। টেলিফোন টেনে পরিচিত অধ্যাপকদের বাড়িতে ফোন করতে বললেন।

ফজলে রাব্বি ফোন করলেন, কিন্তু কাউকেও লাইনে পাওয়া যাচ্ছেনা। 

আকাশে তখন  ভারতীয় যুদ্ধবিমান। রকেট, শেলের শব্দে কান ঝালাপালা। সকাল ১০টায় ২ ঘন্টার জন্য  কারফিউ উঠলো।  ফজলে রাব্বি  স্ত্রীকে  বললেন, 'একজন অবাঙালি রোগী দেখতে যাবো পুরান ঢাকায়।'  যেতে মানা করলেন জাহানারা রাব্বি। 

ফজলে রাব্বি কথার এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন ‘ভুলে যেয়ো না, ওরাও মানুষ।’

সেদিন তিনি ফিরেছিলেন কারফিউ শুরু হওয়ার আগেই। 

দুপুরের খাবার ছিলো আগের দিনের বাসি তরকারি। কিন্তু ফজলে রাব্বি উল্টো বলেছিলেন, ‘আজকের দিনে এত ভালো খাবার খেলাম।’

জাহানারা রাব্বি দেখলেন এখানে  থাকা বিপজ্জনক। তিনি বললেন, চলো চলে যাই।  ফজলে রাব্বি বলেছিলেন  'আচ্ছা, দুপুরটা একটু গড়িয়ে নিই।’

কিছুক্ষণ পর বাবুর্চি এসে বললো ‘সাহেব, বাড়ি ঘিরে ফেলেছে ওরা।’

বাইরে তখন কাদালেপা মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে। মাইক্রোবাসের সামনে  রাজাকার, আলবদর আর হানাদারেরা।

খুব হালকা স্বরে ফজলে রাব্বি জাহানারা রাব্বিকে বলেছিলেন, ‘আমাকে নিতে এসেছে।’ এরপর

দারোয়ানকে গেট খুলে দিতে বলেছিলেন তিনি। যখন মাইক্রোবাসে তিনি উঠলেন তখন সময় ঘড়িতে বিকেল চারটা।

১৮ই ডিসেম্বর ডাঃ ফজলে রাব্বির লাশটি পাওয়া গিয়েছিলো  রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। দুই চোখ উপড়ানো। সমগ্র  শরীরে জুড়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আঘাতের চিহ্ন।  দু হাত পিছনে গামছা দিয়ে বাঁধা। লুঙ্গিটা উরুর উপরে আটকানো। তাঁর হৃদপিন্ড আর কলিজাটা ছিঁড়ে  ফেলেছে হানাদার  ও নিকৃষ্ট  আলবদরেরা।

এই সেই ডাঃ ফজলে রাব্বি, যাঁর  গোটা হৃদয় জুড়ে ছিলো বাংলাদেশ  আর অসহায়র্ত  মানুষ।  যার হৃদয় জুড়ে ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন। হানাদার ও আল বদরের ঘৃণ্য  নরপিশাচেরা  সেই হৃদয়কে ছিঁড়ে ফেললেই কি সমগ্র  বাংলার মানুষের হৃদয় থেকে কি তাঁকে  বিছিন্ন করা যায়। যায়না। হাজার বছর পরেও ডাঃ ফজলে রাব্বি  থাকবেন আমাদের প্রাণে, হৃদয়ের গহীনে।  

আজ কিংবদন্তি চিকিৎসক ও বুদ্ধিজীবি শহীদ অধ্যাপক ডাঃ ফজলে রাব্বির জন্মদিন।  জন্মদিনে নতচিত্তে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই কিংবদন্তি চিকিৎসককে। আমাদের ফজলে রাব্বিকে আল্লাহ যেন বেহেশত নসীব করেন - আমীন

আরো বিস্তারিত পড়তে  

Thursday, February 18, 2021

দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবি

শহীদ শামসুজ্জোহা স্যার, একজন ইতিহাস স্রষ্টা। দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবি।  

জানুয়ারি ৬৯ এ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করে। এই ধর্মঘটে পুলিশ বাধা দেয় এবং ছাত্রদের ওপর চরম নির্যাতন চালায়। এর প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে আসে। ছাত্রদের রাজপথের এই মিছিলে গুলি চলে। পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান ( শহীদ আসাদ ) আহত হন এবং হাসপাতালে নেয়ার পথেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে সমগ্র দেশে সূচিত হয় দুর্বার আন্দোলন, স্বাধীনতার আন্দোলন ।

এর মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলার মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি অবস্থায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গুলি করে হত্যা করে।

সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার প্রতিবাদে সারা দেশের মত রাজশাহীর মানুষও ক্ষোভে ফেটে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য স্থানীয় প্রশাসন রাজশাহী শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী সেদিন ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে পড়ে। এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে শুরু হয় সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষে বেশ কিছু ছাত্র আহত হন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে খবরটি প্রচারিত হলে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জোহা স্যার খবরটি পাওয়ামাত্র এস এম হলের প্রভোস্ট ড. মাযহারুল ইসলাম স্যারকে সঙ্গে নিয়ে গাড়িতে করে তাত্ক্ষণিক ঘটনাস্থলে চলে আসেন। আহত ছাত্রদের ভ্যানে তুলে চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেদিন আহত ছাত্রদের রক্তে তার জামা ভিজে গিয়েছিল। তাদের চিকিৎসার  ব্যবস্থা করে তিনি বলেছিলেন,

"কাল আবার এসে তোমাদের দেখে যাব"।  

ঐদিন সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে চলছিল একুশের অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তিনি তাঁর শার্টে ছাত্রদের রক্তের দাগ দেখিয়ে  বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেন,

"আহত ছাত্রদের রক্তের স্পর্শে আজ আমি গৌরবান্বিত। এরপর থেকে শুধু ছাত্রদের রক্ত নয় প্রয়োজনবোধে আমাদেরও রক্ত দিতে হবে। এরপর আর যদি কোনো গুলি করা হয়, কোনো ছাত্রের গায়ে লাগার আগে যেন  সেই গুলি আমার বুকে এসে লাগে।" 

১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯। আনুমানিক বেলা তখন সাড়ে ৯টা, ছাত্রদের সঙ্গে পাকিস্তানি  সৈন‍্যদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিয়ে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তাঁর প্রিয় ছাত্রদের রক্ষায় জোহা স‍্যার আবার ছুটে এলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে, নাটোর রোডের ওপারে যেখানে প্রতিবাদী ছাত্রদের গুলি করার জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জোয়ানরা রাইফেল তাক করে ছিল।

ড. শামসুজ্জোহা ( জোহা স‍্যার ) তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। তিনি কর্মরত সামরিক কর্মকর্তাকে বলেন, 

"প্লিজ ডোন্ট ফায়ার। আমার ছেলেরা এখনই ক্যাম্পাসের মধ্যে ফিরে যাবে।"

ছাত্ররা তখন তাঁদের প্রিয় স্যারের আদেশে ক্যাম্পাসে ফিরে যাচ্ছে, এমন সময় হঠাত্ গুলি। কেঁপে উঠল সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়। পিছনে ফিরে  তাকাতেই সবাই দেখল তাদের  স্যার মাটিতে পড়ে চিৎকার  করছেন -

"বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাকে  গুলি করেছে।"

যে স্যার মাত্র গতকাল  তার ছাত্রদের  কথা দিয়েছিলেন, তিনি তার আহত ছাত্রদের আজ হাসপাতালে দেখতে যাবেন,  তিনি তার সেই কথা রাখতে পারেন নি। তবে দ্বিতীয় গুলিটা যেন তার প্রিয় ছাত্রের গায়ে না লেগে তার গায়ে লাগে, সেই  কথাটা কিন্তু তিনি ঠিকই রাখতে পেরেছিলেন। দেশের জন‍্য জীবন দিয়ে তিনি স্বাধীতার অনির্বাণ শিখায় রক্তাক্ত পলাশের নৈবেদ‍্য দিয়ে গেলেন।


এই দেশ, লাল সবুজের এই পতাকা, এই স্বাধীনতা - এ দেশের ছাত্র শিক্ষক  কৃষাণ মজুর শ্রমিক সর্বস্তরের জনগণের ঘামে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। আমরা সশ্রদ্ধ সালাম জানাই সেই সব মহান  শহীদদের। বঞ্চনা, অশিক্ষা, অপসংস্কৃতি, অবিচার ও গনতন্ত্রহীনতায় এই  স্বাধীনতা যেন কোনোভাবে কলুষিত  বা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা দেখা এবং রক্ষার দায়িত্বও দেশের আপামর জনগণ এবং বর্তমান প্রজন্মেরই।

শহীদ শামসুজ্জোহা হলের একজন প্রাক্তন আবাসিক ছাত্র হিসাবে আজকের এই স্মরণীয় ঐতিহাসিক দিনে নিজেকে গৌরান্বিত বোধ করছি। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা আমাদের প্রিয় জোহা স্যারকে আপনি বেহেস্তের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করুন।

লেখক : জিয়াউর রহমান খান লিটন , সাবেক যুগ্ম সচিব, শিল্প মন্ত্রণালয় 

Friday, March 6, 2020

শহীদ ড. শামসুজ্জোহা দিবস।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দরদি, নামকরা শিক্ষক শহীদ ড. শামসুজ্জোহা ছাত্রছাত্রীদের বাঁচাতে জীবন বিলিয়ে স্থাপন করেছেন চিরকালের ভালোবাসার অপূর্ব নিদর্শন। ১৮ ফেব্রুয়ারি তার ৫১তম শাহাদাত দিবস। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপককে নিয়ে লিখেছেন শাহীন আলম.
১৯৬৯, পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে উত্তাল গণ-আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানে। প্রবল আন্দোলনে ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি– ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র আসাদ (আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান), ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হক ঢাকায় শহীদ হলেন। তাদের মৃত্যু সংগ্রাম আরও বেগবান করল। পুরো পূর্ব পাকিস্তানে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এমন পর্যায়ে গেল যে, ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক– সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ যোগ দিতে থাকলেন। পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার সামরিক বাহিনীর হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে তাদের রাজপথে জনতার মুখোমুখি নামিয়ে পরিস্থিতি পক্ষে সামলানোর চেষ্টা করলেন। দেশের নানা স্থানে সান্ধ্য আইন, ১৪৪ ধারা জারি হয়েছে।
আন্দোলনের ঝড় উঠেছে রাজশাহীতে। ১৭ ফেব্রুয়ারি কারফিউ, কিন্তু প্রতিবাদী জনতা, ছাত্র, শিক্ষক ভেঙে দিলেন রাজপথে নেমে। ড. মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। অসীম ক্ষমতা তার, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রাণ। জানলেন, শহরে আন্দোলন করতে গিয়ে তার কজন ছাত্র সেনাদের হামলার আঘাতে আহত হয়েছেন। সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রিয় বন্ধু বাংলার সভাপতি অধ্যাপক ড. মযহারুল ইসলামকে নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেন। আহতদের অবস্থা দেখে মর্মাহত দুই শিক্ষক। পরম স্নেহেপ্রবল ছাত্রদের কোলে করে ভর্তি করলেন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে। ছাত্রের রক্তে শিক্ষকদের পরনের কাপড় লাল। পোশাক বদলানোর কথা না ভেবে ড. শামসুজ্জোহা ছাত্রদের বাঁচাতে এগিয়ে গেলেন। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ফিরলেন ক্যাম্পাসে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের জরুরি সভা আহ্বান করলেন। নিজের রক্তাক্ত শার্ট দেখিয়ে ছাত্রদের কষ্টে গভীর ব্যথিত শিক্ষক বললেন– ‘আহত ছাত্রদের পবিত্র রক্তের স্পর্শে আমি উজ্জীবিত। এরপর যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুলি হয়– সে গুলি কোনো ছাত্রের গায়ে লাগার আগে আমার বুকে বিঁধবে।’ সভা, আলোচনার পরও তাদের আহত ছাত্রদের সাহায্য এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎপরতা জানা ও প্রতিরোধের চেষ্টা চলতে লাগল।
পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯। ভোর ৬টা। প্রতিদিনের অভ্যাসে ড. শামসুজ্জোহা বিবিসি ও আকাশবাণী কলকাতার অনুষ্ঠান গভীর মনোযোগে শুনেছেন। পাশে তার রেডিও। পণ্ডিত রবিশঙ্করের সেতার বাজছে। বেজে উঠল টেলিফোন। শীত, মোটা লাল শাল গায়ে চড়িয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ছাত্রীরা কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে যাচ্ছেন– টেলিফোনে সংবাদ পেলেন। এক সেকেন্ড দেরি না করে চলে গেলেন উপাচার্য ভবনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক তালা দেওয়া। পরিস্থিতি খুব খারাপ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন প্রশাসন। শিক্ষকদের নির্দেশন না মেনে আসাদ, সার্জেন্ট জহিরের খুনের বদলায়, ৈস্বরাচার আইয়ুব খানকে ফেলে দিতে ছাত্র, ছাত্রীরা দলে, দলে মিছিল করে এগিয়ে চলছেন। বহুদিনের চেনা নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের জীবন বিলিয়ে দিতে দেবেন না। তাই তালা খুলবেন না। দামালরা নাছোড়। উঁচু দেয়াল টপকে ‘ঢাকা-নাটোর মহাসড়ক’-এ যাবেন। রাজপথ অবরোধ হবে। সার্জেন্ট জহুরুল হকের নির্মম হত্যার প্রতিবাদে ছাত্র বিক্ষোভের একটি মিছিল ১৪৪ ধারা ভেঙে তুমুল সেস্নাগানে রাজশাহী শহরে যাবে– কারও মাধ্যমে সামান্য আগে জেনেছেন অধ্যাপকরা। তাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম শামস-উল-হকের রুমেই জরুরি সভা হচ্ছে বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের। পূর্ব পাকিস্তান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তুমুল আন্দোলনে ছাত্র, ছাত্রীদের জীবন বাঁচানো, তাদের নিরাপত্তায় তারা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেবেন? লেখাপড়ার কী হবে? অসীম সাহসী প্রক্টর সাহসী ড. শামসুজ্জোহা বন্ধ করে দেওয়ার বিপক্ষে। হঠাৎ একজন ছাত্র দৌড়ে জরুরি সভার ভেতরেই চলে এলেন–‘স্যার, সর্বনাশ হয়েছে। প্রধান ফটক বন্ধ হলেও ছাত্র, ছাত্রীরা দেয়াল টপকে ওপারের রাজপথে নামছে। ঠেকাতে, বোঝাতে পারছেন না কেউ।’ ওপারে বন্দুক তাক করে রাজপথের নিরাপত্তার আড়ালে ক্যাম্পাসে খেয়াল রাখছেন পাকিস্তান সেনা সদস্যরা। ছাত্র বলে ক্ষমা করার অর্ডার নেই। রক্তগঙ্গা হবে। শুনে থাকতে পারলেন না প্রক্টর– ‘এখুনি সভা মুলতবি করে আমাদের ঘটনাস্থলে যেতে হবে।’ নির্দেশের অপেক্ষা করলেন না। উপাচার্য, সহকর্মীদের দিকে না তাকিয়েই হুড়মুড় করে বেরুলেন। তিনিও যাবেন। অন্য শিক্ষকরাও সঙ্গে, সঙ্গে কর্তব্য স্থির করলেন। কথা নয়। চললেন অধ্যাপক ড. মযহারুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. আবদুল খালেক, গণিতের অধ্যাপক ড. সুব্রত মজুমদার, অধ্যাপক ড. মোল্লাসহ অনেকে। শিক্ষকরা বয়স হয়েছে বলে দেয়াল টপকাতে পারলেন না। নিজে এগিয়ে ড. ইসলাম, ‘গেট খুলে দাও’ বললেন। মাথা নিচু করে চাবি হাতে নিরাপত্তা কর্মকর্তা গেট খুললেন।
সেনাবাহিনীর দলটির নেতৃত্বে ক্যাপ্টেন হাদী ও ক্যাপ্টেন আসলাম। ড. মযহারুল ইসলাম অনুরোধ করলেন হাতজোড় করে, এগিয়ে যেতে যেতে বলছেন, ‘আপনারা গুলি করবেন না ক্যাপ্টেন। আমার ছাত্রদের শান্তভাবে থাকার অনুরোধ করছি। আমরা তাদের ভেতরে নিয়ে যাচ্ছি।’ এগিয়ে গেলেন ড. শামসুজ্জোহা। একবার রাইফেল হাতে সেনা সদস্যদের প্রধান ক্যাপ্টেন হাদী আরেকবার উত্তেজিত, মিছিলে যোগ দেওয়ার জন্য মরিয়া ছাত্র, ছাত্রীদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। সবার সঙ্গে কথা বলছেন, মধ্যস্থতা করছেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীও পিছু হটতে নারাজ। সঙ্গিন পরিস্থিতি টের পেয়ে গিয়েছেন তারা। রক্তে নাচন, হাতে তাদের অস্ত্র। ছাত্র, ছাত্রীর পিছিয়ে যাবেন না। অনেক সয়েছেন। প্রক্টর পাকিস্তানি সেনা দলের এক প্রধানের সঙ্গে ছাত্রদের হয়ে কথা বললেন। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হলো। আরও ক্ষেপে যেতে পারেন– এই ভয়ে ড. শামসুজ্জোহার হয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন অধ্যাপক ড. মযহারুল। বুঝলেন, নিজের ছেলে, মেয়েদের বাঁচাতে চাইবে। শেষ পর্যন্ত জোহা ছাত্রদের পক্ষই নেবে। পরিস্থিতি বাজে হবে, সৈন্যরা গুলি শুরু করার অর্ডার পেতে পারেন। তিনি এগিয়ে গেলেন। ড. শামসুজ্জোহাকে হাত ধরলেন। ছাত্রদের ডেকে আবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়তে চাইলেন।
ড. জোহা কিংবদন্তি শিক্ষক। তার সঙ্গে চলে এলেন অনেকে। কারও, কারও বেপরোয়া জীবনবাজি রাখার শপথ পূরণ হতে চলেছে। অন্যায়ের শেষ তারা দেখবেন। প্রধান ফটক বন্ধ করলেও প্রতিবাদে মুখর ছাত্রছাত্রীদের কয়েকজন সামান্য পরে দেয়াল টপকে রাজপথে নামলেন। শিক্ষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, সৈন্যদের পাশবিকতা সহ্য করতে পারছেন না। ক্ষুব্ধ শিক্ষকদের দলটি প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা ও অধ্যাপক ড. মযহারুল ইসলামের সঙ্গে প্রধান ফটক খুলে আবার বেরিয়ে গেলেন। অস্ত্রের মুখে তারা দাঁড়িয়ে পড়লেন। উত্তাল ছাত্র, ছাত্রীরা স্লোগান দিচ্ছেন। তারা সবাই পাকিস্তানের হাত থেকে মুক্তি চান, সেনাবাহিনীর অপশাসনের শেষ চান। ফিরে যেতে বলছেন নিজের দেশে। সৈন্যরা ক্যাপ্টেনদের আদেশে পজিশন নিয়েছেন। যেকোনো মুহূর্তে গুলি করবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন, তাদের ভাই, বোনের মতো ছাত্রছাত্রীরা–কোনো বিকার নেই। অ্যাকশন। বহুদিনের প্রশিক্ষণে আদেশ পালন করছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (পদটি তখন রিডার) ড. শামসুজ্জোহা বারবার একটি কথা বলছেন– ‘প্লিজ, ডোন্ট ফায়ার, প্লিজ, ডোন্ট ফায়ার; দে আর স্টুডেন্টস। দে আর আওয়ার চাইল্ডস।’
তিনি এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছেন আগে। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম কর্মী; তবে এবার আরও এগিয়েছে বাঙালি স্বাধীনতার প্রশ্নে; অপশাসন অবসানের লড়াইয়ে। বললেন করজোড়ে অনেকবার তিনি, ‘আমার ছাত্ররা এখুনি এখান থেকে চলে যাবে। আমরা তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাব।’ তবে হঠাৎ সবাই চমকে গেলেন, ‘ফায়ার’– সশব্দে জোরে আদেশ, গুলির শব্দকেও সেকেন্ডের ব্যবধানে ছাপিয়ে উঠল। নির্দিষ্ট টার্গেট নয়, এলোপাতাড়ি গুলি করা হলো। ড. হাবিবুর রহমান, অধ্যাপক আবু সায়ীদ, ড. মযহারুল ইসলামসহ কয়েকজন শিক্ষক আছেন। প্রধান ফটকের কাছে, গুলিবর্ষণের আওতার বাইরে রয়েছেন বলে চলে যেতে পারলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের ভেতরে। মাথা নিচু করে রেখেছিলেন। হামাগুড়ি দিয়ে কয়েকজন ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে পারলেন। প্রক্টর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের দক্ষিণে। সঙ্গে ড. মান্নান, ড. খালেকসহ কয়েকজন। শিক্ষকরা ছাত্রদের সঙ্গে থেকে নিরাপদে সরেছেন। ড. শামসুজ্জোহা তাদের পেছনে পড়েছেন। চারদিক থেকে তাকে ঘিরলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুর্বিনীত, হিংস্র ও রক্তলোলুপ সৈন্য, অফিসার। আদেশ পেয়ে বেয়নেট দিয়ে কুপিয়ে শরীরের মাংস কেটে ফেলতে লাগল তার। হাড় ভাঙতে লাগল। চিৎকার করে কাঁদছেন তিনি। মাটিতে পড়ে গিয়েছেন; ক্ষমা নেই। তার লাল পবিত্র রক্তে ভেসে যাচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। অনেকক্ষণ কোপানোর পর শািন্তর অগ্রনায়কের শরীরে সাড়া নেই দেখে মরে গিয়েছেন ভেবে গাড়িতে তুলে ফেললেন সৈন্যরা। ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে ফিরবেন ও লাশ গায়েব করে ফেলবেন। জানেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থামবে না। প্রিয়তম শিক্ষককে এখন পেলে তাদের জানে ফিরতে দেবেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ছাত্রীরা। তখনো শরীর বেয়ে অঝোরে রক্ত গড়াচ্ছে ড. শামসুজ্জোহার। মাটি করেছে পবিত্র। দূর থেকে অন্য অধ্যাপকরা অন্যায় ও অবিচার ও শিক্ষকের মৃত্যু থমকে দেখছেন। ভাবছেন, ড. মোল্লা মারা যাচ্ছেন। এগোতে পারলেন না। সৈন্যদের পিশাচ আচরণের সঙ্গে তারা পরিচিত নন। আজরাইলের চেহারা আগে দেখেননি। সৈন্যদের আরেক দল এগুলেন দক্ষিণের গেটে। গ্রেপ্তার করলেন উপস্থিত শিক্ষকদের। প্রাণ ও ছাত্রদের বাঁচিয়ে যারা আশ্রয়ে আছেন। গাড়িতে ওঠার সময় তারা জানলেন, আহত ড. শামসুজ্জোহা মুমূর্ষু। তারা বন্দি হয়ে রাজশাহী মিউনিসিপ্যালিটির অফিসে ঢুকলেন। তখন সেটিই কাছাকাছি জেলখানা হয়েছে। একটি ঘর কয়েদখানা। কোনো পরোয়া নেই কারও। সবাই জানেন, পরিস্থিতি যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের রিডার ড. শামসুজ্জোহার রক্তাক্ত প্রায় মৃত শরীর মিনিউসিপ্যালিটির বারান্দায় সৈন্যরা নিয়ে গিয়ে তুলে ফেলে রাখলেন। বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত তিনি এভাবে রইলেন।
তার বিশ্ববিদ্যালয় এখন বিস্ফোরণোন্মুখ। সেনাবাহিনীর গাড়ি চলে গিয়েছে। ছাত্র, ছাত্রীরা জমা হচ্ছেন। শিক্ষক ও অন্যরা তাদের জানিয়েছেন, জোহা স্যারকে ক্যাম্পাসেই মেরে ফেলছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সবাই আরও ফুঁসে উঠলেন। উপাচার্য ও অন্যরা ব্যস্ত প্রিয় সহকর্মী, বন্ধুকে বাঁচাতে। নানা জায়গায় যোগাযোগ করলেন তারা। নিজেরা গেলেন। ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলতে চললেন দলটি।
অনেক কষ্টে, বহু শ্রমে সাড়ে ৪টায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা সম্ভব হলো ড. শামসুজ্জোহাকে। তারা দেখলেন, বারান্দা লাল হয়ে গিয়েছে তার রক্তে। অনেক চেষ্টা করে উদ্যোগ নিয়ে বিখ্যাত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. দত্ত তার অপারেশন করতে পারলেন। শিক্ষকরা সেখানে ছাত্রদের নিয়ে আছেন। উপাচার্য অধ্যাপক শামস-উল-হক, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব শিক্ষক; রাজশাহীর অনেক মান্যগণ্য হাসপাতালে ড. জোহাকে বাঁচাতে আছেন। সবাই জীবনের আশায়। তবে অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে ক্লান্ত, রিক্ত ডা. দত্ত বললেন, ‘সরি, আমরা ড. শামসুজ্জোকে বাঁচাতে পারছি না। তার শরীরে গুলি নেই। গুলি করে মারা হয়নি। বেয়নেট অস্ত্রের আঘাত করে পেট ফেঁড়ে ফেলা হয়েছে। কিডনি, প্লিহা ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শরীরে রক্ত নেই। তার বাঁচার খুব একটা আশা নেই। আপনারা প্রার্থনা করুন। ঈশ্বরই তাকে বাঁচাতে পারেন।’
সন্ধ্যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সারা দিনের অত্যাচার, রক্তক্ষরণে, আঘাতে মারা গেলেন বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান কৃতী এই অধ্যাপক। গণিতের অধ্যাপক ড. সুব্রত মজুমদার সারা দিনের লুকিয়ে রাখা খবর তার স্ত্রীর কাছে বয়ে নিয়ে গেলেন। তিনি কাঁদছেন। তারা হাহাকারে আকুল। ড. জোহা থাকতেন শিক্ষক কোয়ার্টার ভবনের তৃতীয় তলায়। এখনো জ্বলজ্বল করে সেই বেদনার্ত স্মৃতিটি মনে প্রিয় সহকর্মীর– ‘আমার সঙ্গে ড. জোহা স্যারের দেখা হয়েছে সকালেই। সব সময় হাসিখুশি থাকতেন। কুশলবিনিময় করেছেন হেসে। তিনি ও আমি জরুরি শিক্ষক সভায় যাচ্ছিলাম। ভীষণ ভালো মানুষ। হাসি ছাড়া কথা বলতে পারতেন না।’
শহীদ অধ্যাপকের শাহাদতের খবরে সঙ্গে সঙ্গে থমকে গেল বিরাট বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষকের মৃত্যু জালেম সেনাবাহিনীর অত্যাচারে হতে পারে, মেনে নিতে পারছেন না কোনো ছাত্র, ছাত্রী। কয়েকজন ছাত্র ও কয়েকজন শিক্ষক আহত হয়েছেন– বাতাসের বেগে খবর ছড়াল বিরাট; অল্প ছাত্র, ছাত্রীর ক্যাম্পাসে। কী করবেন তারা? কয়েকজন শিক্ষক সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার ও বন্দি। ভয়, উত্তেজনা ও প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে, নিভছে; আবার বাড়ছে। করণীয় ঠিক হচ্ছে না। পাগলাটে ক্যাম্পাসে গাছের পাতা ভয় পাচ্ছে। চলছে রেডিও, খবরের কাগজ হাতে, হাতে ঘুরছে। নেতারা আলোচনা, ভাবনায় ব্যস্ত। বাংলাদেশ বেতার কী বলেছিল? বিবিসি জানিয়েছে, তাদের ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে রাত ১১টার খবরে– ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন।’
এতই অন্ধকারে দেশ, সামরিক শাসনের বুটের তলায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তেজনা এত তুঙ্গে যে, সত্যি খবরটি গুলি না আঘাত, খুঁচিয়ে, খুঁচিয়ে হত্যা– জানতে পারেননি সংবাদদাতা। তবে ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরলেন খবরে। রাষ্ট্র, বিশ্ব হয়ে গেল। সবাই জানলেন। থমকে গেল পূর্ব পাকিস্তান। শেখ মুজিব, তাজউদ্দীনের মতো নিরুত্তাপ মানুষও বাক্যহারা। এখানে, সেখানে সামান্য সময়ের জন্য, অল্প কী এক আলোচনায় নামলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্র, ছাত্রীরা। এরপর একে একে জমা হতে লাগলেন প্রকৃতির নিয়মে। সাইক্লোন আসছে। বাঁশের লাঠি, গাছের ডাল, লুঙ্গিতে গোছ; গায়ে সাদা গেঞ্জি; প্যান্ট-শার্ট; স্যান্ডেল নেই– আসছেন তারা। চোখ উজ্জ্বল। হাজার, হাজার মানুষ। কে শিক্ষক, কে ছাত্র, কে রিকশা চালান স্বীকৃতির আর কোনো দরকার নেই। ‘জোহা হত্যার বিচার চাই; তদন্ত চাই’, ‘সামরিক শাসন মানি না মানব না’ ‘সান্ধ্য আইন মানি না, মানব না’; ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই’– এই বলে, বলে চললেন তারা দারুণ রাগে ঘুরে, ঘুরে। শান্ত রাজশাহী ফুঁসছে। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মিছিল চলছে রাত ১২টায়ও। সবাই জানেন– যেকোনো মুহূর্তে তাদের ওপর গুলি চালাবে সেনাবাহিনী। তবুও তারা মরিয়া।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও আগুন। অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীরা মিছিল করেছেন। অন্যত্রও। স্বাধীনতার দিকে এগোল ড. শামসুজ্জোহা, আসাদের রক্ত। ছাত্ররা প্রাণপ্রিয় শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহার মৃত্যুর সংবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে এলেন। শোকে বিহ্বলরা ছুটলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। ১৯৬৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পরদিন তার মৃত শরীর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসা হলো। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শুভার্থীরা লাল ফুলে জড়িয়ে আরও রঙিন করলেন রক্তাক্ত দেহ। ড. জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে কয়েক সদস্যের কমিটি করা হলো। তাদের ভীষণ সাহসী সিদ্ধান্ত এলো– রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে কবর হবে ড. শামসুজ্জোহার। ‘শাবাশ বাংলাদেশ’ মাঠে জানাজা হলো। মাঠজুড়ে ড. জোহার শুভার্থীরা একটিই প্রার্থনা করেছেন, ‘আল্লাহ স্যারকে জান্নাত নসিব করুন।’ তাকে কবরে শোয়ানো হবে। হঠাৎ একজন শিক্ষার্থী এসে স্যারের কবরে শুয়ে পড়লেন। কাঁদতে, কাঁদতে চিৎকার করে বলছেন, ‘স্যারের বদলে আমাকে কবর দিন। স্যার আমাদের জন্য মারা গিয়েছেন।’
তার জন্ম পশ্চিম বাংলায়। ১৯৪৩ সালের ১ মে। মেদিনীপুরের বাঁকুড়া। পাড়ার লোক, বন্ধুরা বলত ‘মন্টু’। দেখতে ভালো; হিন্দি সিনেমার পোকা; আরেক নাম ‘দিলীপ কুমার’। বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুর রশীদ। লেখাপড়ায় বরাবর ভালো তার মন্টু। বাঁকুড়া জেলা স্কুলে ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৪৮ অবধি-দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে মেট্রিক পর্যন্ত পড়েছেন। বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে ভালো ফল নিয়ে পাস করেছেন। বাঁকুড়া ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট বিজ্ঞানে। সেখানেও খুব ভালো ফল। দেশভাগের আগ, পর থেকে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা তাদের প্রিয় জন্মভূমিতে থাকতে দিল না। ১৯৫০ সালের শুরুতে জেগে উঠল ইবলিস। পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা রক্তগঙ্গায় ভাসল। থাকতে পারলেন না তারাও। মুসলমান বলে এত কষ্ট পেতে হচ্ছে? বাঁকুড়ার অত্যন্ত সম্পদশালী পরিবারের কর্তা আবদুর রশীদ স্ত্রী, সন্তান, সামান্য সম্বল ও স্বর্ণ-গহনা নিয়ে চলে এলেন পূর্ব পাকিস্তান। খুব গরিব হয়ে গেলেন। জোহার মেধা তাদের সম্বল। তারা নামকরা সৈয়দ পরিবার। জোহা পড়ালেখা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, হলে থেকে। ১৯৫৩ সালে সেরা ছাত্র হয়ে অনার্স পাস। কৃতী অধ্যাপক ও নামকরা রসায়নবিদ শিক্ষক ড. খন্দকার মোকাররম হোসেনের (তার নামে ভবন আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে) অধীনে প্রিয় ছাত্র এমফিল থিসিস করেছেন। জোহার গবেষণার বিষয়– ‘বৈদ্যুতিক পদ্ধতিতে ক্রোমাইট খনিজের জারক প্রক্রিয়া।’ বিখ্যাত গবেষণা। লন্ডনের নামকরা ‘রসায়ন ও শিল্প’ পত্রিকায় ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয়ে সুনাম কুড়িয়েছে। ভালো ফল নিয়ে ১৯৫৪ সালে এমএসসি পাস করেছেন। বিস্তৃত গবেষণার আরেক ভাগ প্রকাশিত হয়েছে পাকিস্তানের নামকরা ‘পাকিস্তান সায়েন্স রিসার্চ জার্নাল’-এ, ১৯৫৫ সালে। এই বছরই সংসারের অভাব ঠেকাতে, পরিবারের হাল ধরতে চাকরিতে যোগ দিতে হলো তাকে। বছরের শেষে ‘শিক্ষানবিশ সহকারী কারখানা পরিচালক’ পদে ভালো বেতনে কঠিন পরীক্ষায় পাওয়া চাকরিতে যোগ দিলেন। খুব ভালো করলেন। মেধার পরিচয় দিলেন । প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৫৫ সালে ব্রিটেনের সাউথ ওয়েলসের ‘রয়্যাল অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি’তে বিস্ফোরক দ্রব্যের উচ্চতর প্রশিক্ষণে গেলেন। তাদের মাধ্যমে ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিন বছর লন্ডনের ‘ইমপেরিয়্যাল কলেজ অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’র ছাত্র ছিলেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএসসি (স্পেশাল) ডিগ্রি, ইমপেরিয়্যাল কলেজের এআরসিএস ডিগ্রি লাভ করেছেন। ১৯৫৯ সালের ৪ আগস্ট পশ্চিম পাকিস্তানের ওয়াহ ক্যান্টনমেন্টে সহকারী পরিচালক পদে যোগ দিলেন কৃতী বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ও মেধাবী এই গবেষক।
সব সময় সমাজসচেতন, তাদের একটি দেশের প্রয়োজন জানতেন। শামসুজ্জোহা বিদেশে যাওয়ার আগেই জেনেছেন, তার দেশে যুক্তফ্রন্ট ও প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় বাঙালিদের অবস্থান ও অপমান। দেশে ফেরার সুযোগ খুঁজছিলেন। ১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অর্ডন্যান্স কারখানার চাকরি ছেড়ে রাজশাহীতে এলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সামান্য সময়ের জন্য ডেভেলপমেন্ট (উন্নয়ন) অফিসার পদে নিয়োগ পেলেন পরীক্ষায় পাশ করে। তত দিনে ইমপেরিয়্যাল কলেজের উচ্চতর ডিগ্রির স্কলারশিপ পেয়েছেন।
বিয়ে করে জীবন গুছিয়েছেন। ১৯৬১ সালের ১১ জুন ঢাকার গাজীপুরের গজারিয়া গ্রামের হায়াত আলী খানের মেয়ে নিলুফা বেগমের সঙ্গে পরিণয়। সে বছরই তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিলেন। এরপরই ইমপেরিয়্যাল কলেজে উচ্চশিক্ষা নিতে শিক্ষা ছুটিতে চলে গেলেন। ১৯৬১-১৯৬৪ সাল তিন বছর বিদেশে গবেষণা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষায়। পিএইচডি, ইমপেরিয়্যালের ডিআইসি ডিগ্রি নিয়ে ড. শামসুজ্জোহা ফিরলেন নতুন ভুবনে। ড. শামসুজ্জোহা হলেন সহযোগী অধ্যাপক। তখন পদটি ছিল ‘রিডার’।
১৯৬৬ সালে তাদের অপরূপ মেয়ের জন্ম হলো। তিনি ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত শাহ মখদুম হলের আবাসিক শিক্ষক ছিলেন। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে নরওয়ের অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বছরের উচ্চতর গবেষণার সরকারি বৃত্তি লাভ করলেন। ফিরে হলেন সহযোগী অধ্যাপক। ১৯৬৮ সালের ১৫ এপ্রিল ড. মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্ব পেলেন।
জীবনের শেষ তাকে এই পদেই করতে হয়েছে। ছাত্র-শিক্ষক সবার প্রিয় ছিলেন। হাস্যোজ্জ্বল, ব্যক্তিত্বময়। মায়াময় মুখের হাসিতে কোনো দিন তার পিছুটান বুঝতে পারেননি কেউ। ১১ ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। বড় ভাই নদীতে ডুবে মারা গিয়েছেন। বাবার মৃত্যুর পর তাকে পরিবারের দায়িত্ব হয়েছে। ছোট দুই ভাই, বোনকে পড়ালেখা করাতেন নিজের কাছে রেখে। অপুষ্টিতে চোখের আলো চিরকালের জন্য নিভেছে দুই বোনের। কাউকে বলতেন না, কোনো দিন বোঝা যেত না তার ব্যথা। আবাসিক শিক্ষক হয়েই প্রতিটি রুমে গিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। মিশতেন খুব। ছাত্রদের কাঁধে হাত রেখে কথা বলতেন। ঘুচিয়ে দিতেন দূরত্ব। ‘ভাই’ ডাকতেন। শাহ মখদুম হলের আবাসিক ছাত্র মুহম্মদ মীর কাশেমের মনে আছে, ‘স্যারকে দেখেছি প্রকৃত মানুষ হিসেবে। শিক্ষক সার্থক, খেলোয়াড় দক্ষ, আচরণ ভদ্র, অমায়িক। নিবিড়ভাবে, বন্ধুর মতো মিশেছেন; এখনো বিরল।’ তখন রাজশাহীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এক আবাসিকছাত্র বৈদ্যুতিক শক খেয়ে মারা গিয়েছেন। খবর জেনে সে রাতেই ড. শামসুজ্জোহা মখদুম হলের প্রতি রুমে গিয়ে ছাত্ররা কীভাবে আছেন, বিদ্যুৎ ব্যবহার কীভাবে করছেন পরীক্ষা করে দেখেছেন। ছাত্র, ছাত্রী নিয়ে তার জীবন ছিল। গোলমালে বা বৈরিতায় ধমক না দিয়ে বন্ধু হয়ে সমাধান করেছেন। তেমনটাই সবার কাছে চেয়েছেন।
শিক্ষকদের কাছে প্রিয় সহকর্মী, ‘জোহা ভাই’। তাদের পরিবারে সংগীত, খেলাধুলা ও শিক্ষা-দীক্ষার চল ছিল। তাই সবেতেই তিনি পারদর্শী ছিলেন। খেলতেন ক্রিকেট, টেনিস, বাস্কেটবল ও ফুটবল। ক্রিকেট বেশি পছন্দ। পূর্ব পাকিস্তান ক্রিকেট দলের ক্রিকেটার ছিলেন। নামকরা খেলোয়াড় কর্মজীবনে ছেড়ে দেননি ক্রিকেট। নিয়মিত অনুশীলন করতেন ছাত্রদের নিয়ে। তাদের প্রেরণা দিতেন। রাজশাহী জেলা ক্রিকেট লিগে নিয়মিত ক্রিকেটার ছিলেন। উৎসাহী তরুণ শিক্ষক, কর্মকর্তাদের নিয়ে গড়েছিলেন ক্রিকেট দল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের সঙ্গে একটি ম্যাচ খেলার খুব ইচ্ছা ছিল তার। শেষ পর্যন্ত পারেননি। তাদের বিভাগের হয়ে নিয়মিত ফুটবল খেলতেন। বিশেষ কারণে না খেলতে পারলে তাকে মাঠে পাওয়া যেত। ফুটবল, ক্রিকেটে ধারাভাষ্য দিতেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃবিভাগ প্রতিযোগিতাগুলোতে বিভাগের শিক্ষকদের অংশগ্রহণের সুযোগ আছে। ড. শামসুজ্জোহা রসায়ন দলে ক্রিকেট ও হকি খেলেছেন। তার অধিনায়কত্বে রসায়ন বেশ কবার ফুটবলে টানা চ্যাম্পিয়ন। দলে গোলরক্ষক না থাকলে উৎসাহী, ভালো গোলরক্ষক হতেন। আন্তঃবিভাগ ক্রিকেট প্রতিযোগিতা তার উৎসাহে শুরু হয়েছে। খেলোয়াড় কেমন ছিলেন? গণিতের অধ্যাপক ড. শিশির কুমার ভট্টাচার্যের মনে পড়ে– ‘জীবনকে খেলার মতোই দেখতেন। খুব ভালো খেলোয়াড় ছিলেন। জীবনে যা আসুক সবখানে ফাইট করে জিততে চেয়েছেন। তার জীবন দর্শনে এ প্রভাব ছিল সবচেয়ে। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ঘটনায় তার খেলোয়াড়ি মনের পরিচয় পাওয়া যেত।’
তিনি প্রত্যক্ষভাবে কোনো রাজনৈতিক মতবাদ সমর্থন করেননি। তবে রাজনৈতিক চেতনা ছিল যথেষ্ট। উঠতি বয়সে, ছাত্রাবস্থায়, শিক্ষক হিসেবে, প্রক্টর হয়েও রাজনৈতিক বিষয়গুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণ সূক্ষ্ম রাজনৈতিক চেতনার প্রমাণ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। তখন সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড বয়েছেন। ভাষার মিছিলে সামনের সারিতে ছিলেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে সক্রিয় সিভিল ডিফেন্স কর্মী। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশি জুলুমের প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণ করেছেন। প্রথম সারিতে ছিলেন।
১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যু কোনো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, এমন কোনো দুর্ঘটনা ছিল না জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই। তারা নিশ্চিত, সুনির্দিষ্টভাবে তাকে ছুড়ে দেওয়া হয়েছিল মরণবাণ। কিছুক্ষণ আগে তিনি ক্যাপ্টেন আসলামের কাছে ধৈর্য ও সংযমের আবেদন জানিয়েছেন। তার কাছে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় প্রার্থনা করেছেন। সেই সময়ের মধ্যে ছাত্রদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। তারও আগে ক্যাপ্টেন হাদীর সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে তার। কারণ আগের দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি তার প্রক্টর অফিস থেকে পেট্রল এনে আন্দোলনের ছাত্ররা ঢাকা-নাটোর মহাসড়কের গাড়ি পুড়িয়েছেন বলেছে সেনাবাহিনী। ফলে পাকিস্তান সেনাদের সব ক্ষোভ জমেছিল তার ওপর।
তিনি মৃত্যুর দিনে কোনো বিক্ষোভ মিছিলের নেতা ছিলেন না। তারপরও বের হয়েছিলেন। মনে করেছিলেন, কারফিউ ভেঙে ছাত্ররা ক্যাম্পাসের বাইরে বেরোলে সরকারের ক্ষতি হবে না, ক্ষতি হবে সাধারণ ঘরের মা-বাবার। তাই ছাত্রদের মিছিল বিশ্ববিদ্যালয় গেটে আটকে দেওয়ার জন্য ছুটেছিলেন। আশঙ্কা করেছিলেন, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক পার হওয়া মাত্র নাটোর রোডে টহল দেওয়া অন্ত্রধারী সেনাদের গুলিতে অনেকে নিহত বা আহত হবে। সেটিই সত্য হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শ্রদ্ধায় তাদের প্রিয়তম শিক্ষকের স্মৃতি লালন করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি তার স্বরণে ‘শহীদ দিবস’ হয়। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকে। তাদের ‘শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা’য় আত্মদানকারীদের সঙ্গে তার স্মৃতিচিহ্ন আছে। পরের প্রজন্মের ছাত্র, ছাত্রীরা তার ও তাদের সম্পর্কে জানছেন। যেখানে তাকে খুন করা হয়েছে, তৈরি হয়েছে তার স্মৃতিস্তম্ভ। অাছে ‘শহীদ ড. শামসুজ্জোহা হল’। বাংলাদেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় এই শিক্ষকের আত্মোৎসর্গের সাক্ষ্য বহন করে প্রশাসনিক ভবনের সামনে তার কবর। তিনি এই দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী। ন্যায়, সংগ্রাম, স্বাধীনতার প্রদীপ্ত সাহসের অনন্য প্রতীক। বীর বাঙালি।

বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি শহীদ ডঃ জোহা স্যারের স্মৃতির প্রতি।

Sunday, January 19, 2020

ভাষা সৈনিক নজির হোসেন আর নেই

মেহেরপুরের পিরোজপুর গ্রামের নজির হোসেন বিশ্বাস পাকিস্তানি পুলিসের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেছেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ছিলেন আওয়ামী সৈনিক। রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন, বুকের তাজা রক্ত দেয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই। জীবনের থেকেও তিনি বেশি ভালোবেসেছেন বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষাকে। সেই ভাষা সংগ্রামী আজ দুপুরে বার্ধক্যজনিত মারা গেছে। তাঁর প্রতি গভির শ্রদ্ধা।



Abdullah Al Amin Dhumketu  
" চলে গেলেন ভাষাসংগ্রামী নজির হোসেন বিশ্বাস। মৃত্যুর আগে তিনি শহীদের সন্তান ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চেয়েছিলেন। এ জন্য নজির হোসেনের ছেলে মাসুদ ভাই আমাকে দিয়ে একটি আবেদনপত্র ডাফট করিয়ে নিয়েছিলেন। আবেদনপত্রটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট পৌঁছিয়েছে কিনা জানিনা। আবেদনপত্রটির ড্রাফট ছিল নিম্নরূপ



মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
তেজগাঁও, ঢাকা।
বিষয় : একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ-সংগঠকের সন্তান এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদা প্রাপ্তির আবেদন।
মহোদয়,
যথাবিহীত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক বিনীত নিবেদন এই যে, আমার পিতা শহীদ ফয়েজ উদ্দীন বিশ্বাস একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও দেশপ্রেমিক নাগরিক ছিলেন। তিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। তাঁর বীরোচিত আত্মত্যাগে আমি গর্ব অনুভব করি। সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেও তিনি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন পোস্ট মাস্টারের কাজ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মেহেরপুর জেলার পিরোজপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি দিক-নির্দেশনা প্রদান, খাবার ও অর্থ যোগান করতেন। তার নেতৃত্বে ২০/ ২৫ জনের একটি দল মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে আমার পিতাকে পাকহানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে যায় এবং বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। আমি সেই সময় মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য ভারতের নদীয়া জেলার বেতাই ক্যাম্পে গিয়েছিলাম। বেতাই প্রশিক্ষণ-ক্যাম্পে অবস্থানকালে জানতে পাই যে, পাক-হানাদার বাহিনী আমার পিতাকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। পিতার অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে যাই, পিত্যা-হত্যার প্রতিশোধ নিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ অসমাপ্ত রেখে বাড়ি ফিরে আসি। বাড়ি ফিরে এসে প্রশিক্ষণ ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে শুরু করি। স্বাধীনতার পর আমার পিতার লাশ পাওয়া যায় মেহেরপুর সরকারি কলেজের পিছনের গণকবরে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা, তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমা প্রশাসক ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। এস এম সোবহান ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে দায়িত্ব পালনকালে আমার পিতার লাশের সনাক্ত করেছিলেন। মেহেরপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থে ৪৫ পৃষ্ঠায় শহীদের তালিকায় ১১৪ নং সিরিয়ালে আমার পিতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ১৭ আগস্ট, ১৯৯২ তারিখে মেহেরপুর থেকে প্রকাশিত ”প্রবাহ” নামক বুলেটিনে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের তালিকার ২১ নং সিরিয়ালে আমার পিতার নাম উল্লেখ আছে। আমি নিজে ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেছি, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেও কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাইনি। উল্লেখ্য যে, আমি ১৯৯০-২০০৪ খ্রি. পর্যন্ত ১৪ বছর পিরোজপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ২০০৪-২০১৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছর মেহেরপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে বিএনপি-জামায়াত কর্তৃক উপেক্ষিত ও নিগৃহীত হয়েছি। আমি এখন মারাত্মক অসুস্থ। দীর্ঘ প্রায় ০৭ বছর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী। দীর্ঘদিন রোগশয্যার কারণে পরিবার পরিজনেরাও ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলেছেন। পরিবারে তেমন কোন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি না থাকায় চিকিৎসার টাকা যোগাড় করতে পারছি না। এ কারণে নিজেকে খুবই অসহায় মনে হয়।
মহোদয়, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ-সংগঠকের সন্তান এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হওয়া সত্ত্বেও আমি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মাননা পাইনি। অপ্রাপ্তির বেদনা নিয়ে আমি ক্রমশ মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হচ্ছি। হয়তো বেশিদিন বাঁচবো না। জীবন সায়াহ্নেও যদি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মাননা পেতাম তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম।
বিনীত
( মোঃ নজির হোসেন বিশ্বাস)
পিতা- শহীদ ফয়েজ উদ্দীন বিশ্বাস
গ্রাম ও পোস্ট: পিরোজপুর,
উপজেলা ও জেলা : মেহেরপুর।
মোবাইল: ০১৯১৭-২৪১৭৫৮

সংযুক্তি :
১। মেহেরপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের প্রত্যয়ন পত্রের ফটোকপি।
২। মেহেরপুর সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের প্রত্যয়নপত্রের ফটোকপি।
৩। পিরোজপুর ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের প্রত্যয়নপত্রের ফটোকপি।
৪। পিরোজপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রত্যয়নপত্রের ফটোকপি।
৫। মেহেরপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রত্যয়নপত্রের ফটোকপি।
৬। শহীদ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের নামফলকের ছবি।
৭। নাগরিকত্ব সনদ।
৮। জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি।
৯। ছবি।
১০। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ প্রদত্ত মেহেরপুর জেলার শহীদের নামের তালিকা সংযোজিত মেহেরপুর জেলার ইতিহাসের বইয়ের
ফটোকপি।
১১। প্রকাশিত প্রবাহ নামে বুলেটিনের ফটোকপি। "

Tuesday, July 1, 2014

আমাদের ভাষা সৈনিকদের কয়েকজন - ৩

বাম থেকে-
আমানুজ্জামান খান (বেবী)
মীর ফজলুল হক
মোঃ পিয়ারু সর্দার
আব্দুল মমিন
জুলমত আলী খান
কামরুজ্জামান
সুফিয়া খাতুন
ফকির শাহাবুদ্দিন
মোহাম্মদ আলী
আনসার আলী
নঈম বিশ্বাস
মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান
ডা. ফরিদুল হুদা
ডা. মোহাম্মদ আলী আসগর
শামসুল হক
মোহাম্মদ মোকাম্মেল হোসেন
অধ্যাপক মোস্তফা নুরুল ইসলাম
শাহেদ আলী
মৌলভী ফরিদ আহম
অধ্যাপক আব্দুল গফুর
আমেনা বেগম
মোসলেমা খাতুন
মুস্তফা মনোয়ার
উষা ব্যাপারী
গুলে ফেরদৌস
রওশন জাহান হোসেন
কাজী খালেদা খাতুন
রওশন আহম দোলন
রওশন আরা বাচ্চু
মুস্তাফা সারোয়ার

আমাদের ভাষা সৈনিকদের কয়েকজন - ২

বাম থেকে-
মোহাম্মদ সুলতান
এস এ বারি এ টি
মোহাম্মদ তকীউল্লাহ
ইমাদ উল্লাহ
মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ
আব্দুল মতিন খান চৌধুরী
আব্দুর রহমান চৌধুরী
সৈয়দ নজরুল ইসলাম
তাজউদ্দিন আহমদ
কামরুদ্দীন আহমদ
মনোরঞ্জন ধর
নেয়ামাল বসির
মীর্জা গোলাম হাফিজ
মহিউদ্দিন আহমদ
হাসান হাফিজুর রহমান
অধ্রাপক অজিত কুমার গুহ
আব্দুস সামাদ আজাদ
ডা. বদরুল আলম
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ
আবুল কালাম শামসুদ্দিন
মুনীর চৌধুরী
শহীদুল্লাহ কায়সার
জহীর রায়হান
আব্দুল গাফফার চৌধুরী
ড. আলা উদ্দিন আল আজাদ
সাইয়িদ আতীকুল্লাহ
বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
এম আর আখতার মুকুল
ডা. সাঈদ হায়দার


আমাদের ভাষা সৈনিকদের কয়েকজন - ১



বাম থেকে-
ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ
ড. কাজী মোতাহার হোসেন
অধ্যাপক আবুল কাশেম
আবুল হাশিম
আব্দুল হক
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত
মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী
শেরে বাংলা একে ফজলুল হক
আনোয়ারা খাতুন
শামসুল হক
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
আতাউর রহমান খান
আব্দুর রশীদ খান তর্কবাগীশ
এস এম নুরুল হক ভূইয়া
কাজী গোলাম মাহবুব
অলি আহাদ
মোহাম্মদ তোয়াহা
আব্দুল মতিন
গাজীউল হক
অধ্যাপক হালিমা খাতুন
অধ্যাপক সাফিয়া খাতুন
অধ্যাপক সুফিয়া আহমদ
ডা. গোলাম মাওলা
খালেক নেওয়াজ খান
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম
আবুল মনসুর আহমদ
তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞ্চা
মুহম্মদ হাবিবুর রহমান শেলী
মোহাম্মদ শামসুল আলম
কামরুদ্দিন আহমদ শহদ