.

Sunday, January 19, 2020

ভাষা সৈনিক নজির হোসেন আর নেই

মেহেরপুরের পিরোজপুর গ্রামের নজির হোসেন বিশ্বাস পাকিস্তানি পুলিসের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেছেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ছিলেন আওয়ামী সৈনিক। রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন, বুকের তাজা রক্ত দেয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই। জীবনের থেকেও তিনি বেশি ভালোবেসেছেন বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষাকে। সেই ভাষা সংগ্রামী আজ দুপুরে বার্ধক্যজনিত মারা গেছে। তাঁর প্রতি গভির শ্রদ্ধা।



Abdullah Al Amin Dhumketu  
" চলে গেলেন ভাষাসংগ্রামী নজির হোসেন বিশ্বাস। মৃত্যুর আগে তিনি শহীদের সন্তান ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চেয়েছিলেন। এ জন্য নজির হোসেনের ছেলে মাসুদ ভাই আমাকে দিয়ে একটি আবেদনপত্র ডাফট করিয়ে নিয়েছিলেন। আবেদনপত্রটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট পৌঁছিয়েছে কিনা জানিনা। আবেদনপত্রটির ড্রাফট ছিল নিম্নরূপ



মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
তেজগাঁও, ঢাকা।
বিষয় : একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ-সংগঠকের সন্তান এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদা প্রাপ্তির আবেদন।
মহোদয়,
যথাবিহীত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক বিনীত নিবেদন এই যে, আমার পিতা শহীদ ফয়েজ উদ্দীন বিশ্বাস একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও দেশপ্রেমিক নাগরিক ছিলেন। তিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। তাঁর বীরোচিত আত্মত্যাগে আমি গর্ব অনুভব করি। সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেও তিনি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন পোস্ট মাস্টারের কাজ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মেহেরপুর জেলার পিরোজপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি দিক-নির্দেশনা প্রদান, খাবার ও অর্থ যোগান করতেন। তার নেতৃত্বে ২০/ ২৫ জনের একটি দল মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে আমার পিতাকে পাকহানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে যায় এবং বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। আমি সেই সময় মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য ভারতের নদীয়া জেলার বেতাই ক্যাম্পে গিয়েছিলাম। বেতাই প্রশিক্ষণ-ক্যাম্পে অবস্থানকালে জানতে পাই যে, পাক-হানাদার বাহিনী আমার পিতাকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। পিতার অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে যাই, পিত্যা-হত্যার প্রতিশোধ নিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ অসমাপ্ত রেখে বাড়ি ফিরে আসি। বাড়ি ফিরে এসে প্রশিক্ষণ ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে শুরু করি। স্বাধীনতার পর আমার পিতার লাশ পাওয়া যায় মেহেরপুর সরকারি কলেজের পিছনের গণকবরে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা, তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমা প্রশাসক ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। এস এম সোবহান ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে দায়িত্ব পালনকালে আমার পিতার লাশের সনাক্ত করেছিলেন। মেহেরপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থে ৪৫ পৃষ্ঠায় শহীদের তালিকায় ১১৪ নং সিরিয়ালে আমার পিতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ১৭ আগস্ট, ১৯৯২ তারিখে মেহেরপুর থেকে প্রকাশিত ”প্রবাহ” নামক বুলেটিনে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের তালিকার ২১ নং সিরিয়ালে আমার পিতার নাম উল্লেখ আছে। আমি নিজে ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেছি, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেও কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাইনি। উল্লেখ্য যে, আমি ১৯৯০-২০০৪ খ্রি. পর্যন্ত ১৪ বছর পিরোজপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ২০০৪-২০১৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছর মেহেরপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে বিএনপি-জামায়াত কর্তৃক উপেক্ষিত ও নিগৃহীত হয়েছি। আমি এখন মারাত্মক অসুস্থ। দীর্ঘ প্রায় ০৭ বছর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী। দীর্ঘদিন রোগশয্যার কারণে পরিবার পরিজনেরাও ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলেছেন। পরিবারে তেমন কোন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি না থাকায় চিকিৎসার টাকা যোগাড় করতে পারছি না। এ কারণে নিজেকে খুবই অসহায় মনে হয়।
মহোদয়, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ-সংগঠকের সন্তান এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হওয়া সত্ত্বেও আমি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মাননা পাইনি। অপ্রাপ্তির বেদনা নিয়ে আমি ক্রমশ মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হচ্ছি। হয়তো বেশিদিন বাঁচবো না। জীবন সায়াহ্নেও যদি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মাননা পেতাম তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম।
বিনীত
( মোঃ নজির হোসেন বিশ্বাস)
পিতা- শহীদ ফয়েজ উদ্দীন বিশ্বাস
গ্রাম ও পোস্ট: পিরোজপুর,
উপজেলা ও জেলা : মেহেরপুর।
মোবাইল: ০১৯১৭-২৪১৭৫৮

সংযুক্তি :
১। মেহেরপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের প্রত্যয়ন পত্রের ফটোকপি।
২। মেহেরপুর সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের প্রত্যয়নপত্রের ফটোকপি।
৩। পিরোজপুর ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের প্রত্যয়নপত্রের ফটোকপি।
৪। পিরোজপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রত্যয়নপত্রের ফটোকপি।
৫। মেহেরপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রত্যয়নপত্রের ফটোকপি।
৬। শহীদ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের নামফলকের ছবি।
৭। নাগরিকত্ব সনদ।
৮। জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি।
৯। ছবি।
১০। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ প্রদত্ত মেহেরপুর জেলার শহীদের নামের তালিকা সংযোজিত মেহেরপুর জেলার ইতিহাসের বইয়ের
ফটোকপি।
১১। প্রকাশিত প্রবাহ নামে বুলেটিনের ফটোকপি। "