.

Saturday, January 16, 2021

গাংনী পৌরসভা নির্বাচন- ২০২১

গাংনী প্রতিনিধি : ১৬ ই জানুয়ারী ২০২১ 
মেহেরপুরের গাংনী পৌরসভা নির্বাচনে ৯ হাজার ৪শ’৬৭ ভোট পেয়ে আওয়ামীলীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী আহম্মেদ আলী বেসরকারী ভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান মেয়র সতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল ইসলাম ২ হাজার ৬শ’৫১,বিএনপির প্রার্থী আসাদুজ্জামান বাবলু ৪শ’৮৮,ইসলামী আন্দোলনের আবু হুরাইরা ২শ’৩০ ও সতন্ত্র আনারুল ইসলাম ৫৭ ভোট পেয়ে পরাজিত হন।

পৌরসভার মোট ভোটার ২০ হাজার ৩৫৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৯ হাজার ৭৬০ ও নারী ভোটার রয়েছে ১০ হাজার ৫৯৭ জন। নির্বাচিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা হলেন,১ নং ওয়ার্ডে আলমগীর হোসেন,২ নং ওয়ার্ডে মিজানুর রহমান,৩ নং ওয়ার্ডে সামিউল ইসলাম,৪ নং ওয়ার্ডে আছেল উদ্দীন,৫ নং ওয়ার্ডে আতিয়ার রহমান,৬ নং ওয়ার্ডে নাসির উদ্দীন,৭ নং ওয়ার্ডে মকসেদ আলী,৮ নং ওয়ার্ডে হাফিজুল ইসলাম,৯ নং ওয়ার্ডে রাশিদুল ইসলাম। এবং সংরক্ষিত ১২৩ নং ফিরোজা খাতুন, ৪৫৬ নং ওয়ার্ডে ঝর্না খাতুন ও ৭৮৯ নং ওয়ার্ডে সাজেদা খাতুন নির্বাচিত হন। নির্বাচনে ৫জন মেয়র সহ ৫২জন প্রার্থী এ নির্বাচনে অংশ নেয়। শনিবার সন্ধ্যায় বিভিন্ন কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 

Sunday, November 8, 2020

শহীদ মুফতী ও এক গুচ্ছ রুমাল

বামদিকের পারিবারিক ছবিতে পেছনের সারির মাঝখানের জন মুফতি মোহাম্মদ কাসেদ। ডান দিকে বন্ধুদের সংগ্রহে থাকা শহীদ মুফতির ছবি।

 মুফতীর ছোট বোন সুলতানা অনেকগুলো রুমাল খুব যত্নে ভাঁজ করে সুটকেসে রাখছিল। ময়মনসিংহ জেলা স্কুল ছেড়ে মুফতী চলে যাচ্ছে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে। তালিকা ধরে সুটকেস গোছানো হচ্ছে। ব্যবহার্য প্রতিটি জিনিসের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা আছে। 

রুমালের সংখ্যাই বেশি। আমি এসেছি নৌমহলে, মুফতীর বাসায়। আগামীকাল সে চলে যাবে। তারপর কেটে গেছে ষাট বছরের কাছাকাছি। বহুদিন ধরে ভেবেছি মুফতীকে নিয়ে লিখবো। আমার জেলা স্কুলের সহপাঠী বর্তমানে নিউ জার্সির বাসিন্দা আমিনুর রশিদ পিন্টু দিনকয় আগে ফেইসবুকে মুফতীর ছোটবেলার একটা ছবি পাঠিয়েছে। যে লেখা হয়ে উঠছিল না, ছবিখানা দেখে মুফতীকে নিয়ে সে লেখা লিখতে বসেছি। কেন জানি না ভাইয়ের জন্য ছোট বোন  রুমাল গুছিয়ে সুটকেসে রাখছে – এই দৃশ্যটি প্রথমে মনে এল।

১৯৬১ সাল। আমার স্টেশন মাস্টার বাবা জামালপুরের কাছে বাউশি স্টেশন থেকে বদলি হয়ে ময়মনসিংহ রোড স্টেশনে এসেছেন। এর আগে বিভিন্ন স্টেশনে গ্রামের স্কুলে পড়েছি। এবারে আমাকে ভর্তি করা হয়েছে ময়মনসিংহ শহরের নামকরা জেলা স্কুলে। ক্লাস সিক্সে। বছরের মাঝখানে ভর্তি হয়েছি। লাল ইটের বিশাল ভবনে সারি সারি ক্লাস। হেড স্যারের অফিস থেকে একজন দপ্তরি দেখতে ছোটখাট নতুন এক ছাত্রকে সিক্স বি ক্লাসে নিয়ে এলো। স্যার এবং সারা ক্লাসের দৃষ্টি এই নবাগতের দিকে। উচ্চতায় খাট বলেই হয়তো স্যার আমাকে একেবারে প্রথম সারিতে বসতে বললেন। সেই প্রথম দিনেই পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়ে গেল মুফতীর সাথে। বেঞ্চে তার পাশেই আমি বসেছিলাম।  

অল্প কয়দিনেই জমিয়ে বন্ধুত্ব। আমি চুপচাপ প্রকৃতির। মুফতী সপ্রতিভ। ক্লাসের বাইরের বই প্রচুর পড়ে। “গোয়েন্দা গল্প  বা অ্যাডভেঞ্চার– এসব পড়?” মুফতীর প্রশ্নের উত্তরে জানাই, আমাদের বাসায় মোহন সিরিজের বই আছে। শুনেতো মুফতী উত্তেজিত। “আজই স্কুল শেষে তোমার সাথে বাসায় গিয়ে বই নিয়ে আসবো।” 

বললাম, আমার বাসাতো তিন মাইল দূরে, হেঁটে যেতে হবে। কোনও পরোয়া নেই মুফতীর। রেললাইন ধরে হেঁটে আমি স্কুলে আসা-যাওয়া করি। আমার প্রতিদিন ছয় মাইল হাঁটার সংবাদ মুফতী জানে। সেদিনই মুফতী চলল আমার সাথে। শীতের বিকেলে বাসায় পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যা। মোহন সিরিজের একটি বই নিয়ে মুফতী ফিরে গেল একা নৌমহলে তাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।

ময়মনসিংহ শহরের পূর্ব পাশ ঘেঁষে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। শনিবার স্কুল আগে ছুটি হয়। মুফতী ও আমি চলে যাই ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। নদীর পানি টলটলে স্বচ্ছ। শরতে কাশফুলে ঢাকা চর।  নদী পাড়ের বেঞ্চে বসে থাকি আমরা। শুভ্র কাশের রূপ দেখি। মুফতী বললো, “ওপারে শম্ভুগঞ্জে আমার এক আত্মীয়ের বাড়ি আছে। শীতে নদীর পানি এত কমে যায়, হেঁটেই পার হওয়া যায়। আমরা একবার সে বাড়িতে যাব।”

তারপর শীত এলো। এক বিকেলে স্কুল শেষে আমরা দু’জন নদী পার হলাম। আমরা তখন হাফপ্যান্ট পরতাম। শহরের ছেলেরা জুতো পড়লেও আমি খালি পায়েই স্কুলে আসতাম। অন্যরা তা তেমন নজরও করতো না। তো হাফপ্যান্ট ও খালি পা থাকায় নদী পার হতে কোনও ঝামেলা হলো না। ছোট একটু জায়গা সাঁতরাতে হলো। মুফতীর   আক্ষেপ কেন আজ জুতো পরে এলো! হাতে নিতে হলো জুতো। শম্ভুগঞ্জ থেকে শহরে ফিরতে সন্ধ্যা পার। তারপর আরো তিন মাইল হেঁটে ময়মনসিংহ রোড স্টেশনের বাসায় পৌঁছাতে বেশ রাত। সবাই চিন্তায় পড়েছিলেন। সব বৃত্তান্ত শুনে কোনও বকাঝকা করলেন না আম্মা-আব্বা। ওই বয়সে বড় একটা অ্যাডভেঞ্চার করেছি, এমনটা ভেবে তারা হয়তো ভেতরে ভেতরে খুশিই হয়েছিলেন।

জেলা স্কুলের মাঠে অ্যাসেম্বলি হত। কিছুটা শরীর চর্চাও। তারপর মার্চ করে আমরা ক্লাসে যেতাম। গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানাবার থাকলে আমাদের হেডমাস্টার ফসিহ স্যার অ্যাসেম্বলিতে তা জানাতেন। একদিন বজ্রপাতের মত তেমন একটা ঘোষনা আমরা শুনলাম স্যারের কণ্ঠে। আমাদের ক্লাসের কয়েকজন ছাত্রকে টিসি দেওয়া হবে। নাম ডেকে অ্যাসেম্বলির সামনে জনা ছয়েককে দাঁড়াতে বলা হলো।  

স্যার বললেন, “এরা সবাই ভাল ছাত্র, কিন্তু গুরুতর শৃঙ্খলা ভঙ্গের সাথে এরা যুক্ত।” স্যার আরো জানালেন, দুটো গোপন প্রতিদ্বন্দ্বী দল এরা গঠন করেছে। ‘বজ্রমুষ্টি’ ও ‘ব্ল্যাক টাইগার’। 

বহু বছর আগে ময়মনসিংহ শহরের এক প্রান্তে  নন্দীবাড়ি ছিল সমৃদ্ধ জনপদ। সেসব গত হয়েছে বহু আগে। এখন নন্দী পরিবারের বিশাল অট্টালিকা, বাগান  সবই  ঘন জঙ্গলে ঢাকা। ওই পোড়োবাড়িতে দিনের বেলায় যেতেও মানুষ ভয় পায়।  নন্দীবাড়ির জঙ্গলে ‘বজ্রমুষ্টি’ গোপনে আস্তানা গেড়েছে। ‘ব্ল্যাক টাইগার’ আরেক জায়গায়।  পরষ্পরকে হুমকি দিয়ে পাঠানো এদের গোপন চিঠি স্কুল কর্তৃপক্ষের হাতে এসেছে। অভিভাবকদের এ বিষয়ে জানানো হয়েছে। গভীর বিস্ময়ে জানলাম- আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুফতী ‘বজ্রমুষ্টি’ দলের নেতা। চকিতে মনে পড়লো স্কুলে ভর্তির পরপরই মুফতীর অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীর প্রতি গভীর নেশার কথা। আসা-যাওয়া মিলিয়ে ছয় মাইল পথ হেঁটে আমার বাসা থেকে মোহন সিরিজের বই সংগ্রহের কথা। শেষ পর্যন্ত অভিভাবকদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে এই খুদে রবিনহুডদের আর টিসি দেয়নি স্কুল কর্তৃপক্ষ। 

মুফতীর পক্ষ থেকে অবশ্য কোনও মুচলেকা এলো না। স্কুলে আসাও বন্ধ করলো সে। বাসায় গিয়ে জানলাম জেলা স্কুলে সে আর পড়বে না। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য সে বাসায় থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে পরীক্ষায় পাশ করে মুফতী চলে গেল ক্যাডেট কলেজে। ক্লাস সেভেনে। মনের গহীনে তার কি কোন স্বপ্ন ছিল? জেলা স্কুলে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে সে। এবারে ক্যাডেট কলেজের কঠিন শৃঙ্খলায় নিজেকে তৈরি করবে সামনে অনেক বড় কোনও অ্যাডভেঞ্চারে অংশ নেওয়ার জন্যে। সে মাহেন্দ্রক্ষণ এসেছিল ১৯৭১ সালে। সে সম্পর্কে বলবার আগে মুফতী ও তার পরিবার নিয়ে দুটো কথা বলবো। তার আগে শুধু জানাই যে ক্লাস সিক্সের রবিনহুডদের সবাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল।

আমার সে সময়কার আরেক সহপাঠী ইঞ্জিনিয়ার আমিনুল ইসলাম। তার স্মরণশক্তি প্রখর। ষাট বছর আগের ঘটনা, স্থান, বিভিন্ন জনের নাম তার পরিষ্কার মনে আছে। মুফতীর সাথেতো আমার বন্ধুত্ব বেশিদিনের নয়। কিন্তু আমিনুল ময়মনসিংহ শহরের বাসিন্দা হওয়াতে মুফতী ও তার পরিবারের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। তার শরণাপন্ন হই, মুফতী সম্পর্কে ওইসব কথা জানতে যা আমার জানা নেই। 

মুফতীর বাবা মোহাম্মদ ওয়াহীদ ছিলেন ময়মনসিংহ পৌরসভার সচিব। নৌমহলে তার নিজের বাড়ি। ছয় পুত্র ও চার কন্যার মধ্যে প্রথম পুত্র ছোট বেলায় মারা যায়। তারপর কন্যা। আমরা ডাকতাম সাকী আপা বলে। তারপরেই মুফতি। আমিনুল বলছিল বাবা ওয়াহীদ সাহেবের কথা। স্বল্পবাক এই মানুষটি অবসরে গভীর মনোযোগে বই পড়তেন। বই পড়ার এই অভ্যাসটি পেয়েছিল মুফতি। তবে পাঠ্য বইয়ের বাইরের বই পড়ার নেশা ছিল তার। ওয়াহীদ সাহেব তাতে আপত্তি করতেন না। ছেলে-মেয়েরা কে কী পড়ছে তা নিয়ে মাথাও ঘামাতেন না। তবে তাদের ইংরেজি শেখাবার একটা চেষ্টা তার ছিল। ঘরে রাখা হতো ইংরেজি অবজারভার পত্রিকা। ছেলে-মেয়েরা পড়াশুনা করছে। বাবা বললেন, “মা শাহানা আজকের প্রধান খবরগুলো পড়ে শোনাওতো।” আরেকটি হবি ছিল ওয়াহীদ সাহেবের। ডায়েরি লিখতেন তিনি। নিয়মিত ডায়রি লেখার জন্য মনের একটা শৃঙ্খলা দরকার হয়। ভাবনারও প্রয়োজন পড়ে। মুফতী ছোটবেলা থেকেই বাবার এই বৈশিষ্ট্যগুলো পেয়েছিল। বেহালা বাজানো ও দাবা খেলার প্রতি ঝোঁক তার ছেলে বেলা থেকেই। দুটোর জন্যেই প্রয়োজন ছিল শৃঙ্খলা, চিন্তার গভীরতা ও নিষ্ঠা। আমিনুল বলছিল সেসবের কথা।


নৌমহলে মুফতিদের বাসার কাছেই সমীর চন্দ্র চন্দের বাসা। সবাই কটন-দা বলে ডাকে। সঙ্গীত নিয়েই তিনি ও তার গোটা পরিবার। বেহালা ও গিটার শেখান তিনি। মুফতী ও তার ছোট ভাই হাদীর বেহালায় হাতেখড়ি তার কাছেই। দাবা কোথায় শিখলো? আমিনুল বলতে পারেনি। বললো, “হয়তো নিজে নিজেই শিখছে।” তবে মজার কথাও একটা জানালো আমিনুল। ময়মনসিংহ শহরের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মির্জা আজাদ বখত ওপার বাংলা থেকে এসে এ শহরে বসতি করেছেন। তিনি দাবা খেলতেন মুফতীর সাথে। কখনো মুফতীকে হারাতে পারতেন না। তাতে তার কোন খেদ ছিল না। বলতেন, “বুঝলে মুফতি, কাঠ ঘষলেও ধার হয়, কিন্তু ইস্পাতের মত নয় কখনো। আমি কাঠ আর তুমি হচ্ছো ইস্পাত।” 

মুফতীর বাবা ময়মনসিংহ শহরে ১৯৫৫ সালে একটি আধুনিক কাঠের আসবাবপত্র তৈরির কারখানা শুরু করেছিলেন। সেই কারখানায় মুফতী দাবা খেলার বিশাল সব গুটি তৈরি করেছিল। বাসার মেঝেতে দাবার ছক কেটে বড় বড় দাবার গুটি দিয়ে ভাই-বোন বন্ধু-বান্ধব মিলে দাবা খেলার আসর বসাতো মুফতি। নিজের চোখ বেঁধে মুফতী অনেকের বিরুদ্ধে একা খেলতো। কেউ জিততে পারতো না। ফোনে কথা হয় ময়মনসিংহের নজিব আশরাফ হোসেনের সাথে। মুফতীর  চাচার ছেলে। মুফতীর প্রতি অন্তপ্রাণ নজিব বলছিল, “মুফতী ভাই নিজের চোখ বেঁধে এক সাথে ৭ জন দাবাড়ুকে হারিয়েছিলেন। এমন কৃতিত্ব সে সময়ে আর কারও ছিল না।” 

মুফতীর সব কাজ একা একা। এমনি একদিন থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে একদম একা মুফতী চলে গিয়েছিল ঘাতক পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে বৃদ্ধ সামাদ দফতরিকে বাঁচাতে। ১৯৭১-এর ১৪ জুন তারিখে। সে বিষয়ে বলবো পরে।  

কলেজ শেষ করে আমি ভর্তি হয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োক্যামেস্ট্রি বিভাগে। মুফতী ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে। মুফতী মোহাম্মদ কাসেদ। একের পর এক বিভিন্ন টুর্নামেন্টে বিজয়ী হয়ে চলেছে ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মুফতি। জেলা স্কুলে আমাদের আরেক সহপাঠী কামরুল। ক্লাসে তৃতীয়। নৌমহলে মুফতীর বাসার পাশেই তার বাসা। পরে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মেকানিক্যালে মুফতীর সাথে পড়েছে। বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কৃতি অধ্যাপক মো. কামরুল ইসলামের সাথে ফোনে কথা হয়। “মুফতী থাকতো কায়দে আজম হলের (বর্তমান তিতুমির হল) ২০৭ নম্বর (উত্তর) কক্ষে। দাবায় এত সময় দিত যে তৃতীয় বর্ষে তার ক্লাস উপস্থিতি কম থাকায় বিভাগীয় প্রধান মাদ্রাজি অধ্যাপক ভি জি দেসা তাকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে দেবেন না বলে জানিয়ে দিলেন। তৎকালীন পাকিস্তান শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্রের (বর্তমান বিটাক) পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন অধ্যাপক দেসার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার  অনুরোধে অধ্যাপক দেসা মুফতীকে পরীক্ষায় বসতে দিতে রাজি হলেন। সংযোগটি হলো দাবা খেলা। মুফতীর সাথে বড় আনন্দে দাবা খেলেন মোশাররফ হোসেন। অনুমতি দিলেও মুফতীর উপর বিশাল অ্যাসাইনমেন্টের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিলেন অধ্যাপক দেসা।” 

এত বছর পর কথাগুলো বলতে গিয়ে অধ্যাপক কামরুলের কণ্ঠে ঝরে পড়ছিল শুধুই ভালবাসা। “জানো, পড়াশুনা না করলে কি হবে, পরীক্ষার আগে আগে আমাদের কাছ থেকে নোট নিয়ে অল্প সময়ে সব রপ্ত করে নিত মুফতী। অ্যাসাইনমেন্টও ঠিক সময়ে জমা দিতে পেরেছে। আমরা একটু সাহায্য করেছি মাত্র। যথারীতি পরীক্ষায় ভাল করেছে মুফতী।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন। মুফতীকে বড় ভালবাসেন তিনি। সূত্রটা হচ্ছে দাবা খেলা। 

মজার এক তথ্য জানালো বন্ধু আমিনুল। ছুটি শেষে মুফতী বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ফিরবে।। মাকে বললো, একটা বালিশ আর কম্বল লাগবে। মা তো অবাক। গত ছুটি শেষে নতুন বালিশ ও কম্বল তো সে নিয়ে গিয়েছিল। মুফতী কুণ্ঠার সাথে মাকে জানায় বালিশ-কম্বল নিয়ে দাবা খেলতে গিয়েছিল। সারা রাত ধরে খেলা। দূর সেই জায়গা থেকে ফেরার সময় বালিশ-কম্বল নিতে ভুলে গিয়েছে। মা তার এই আত্মভোলা ছেলেটিকে বড় বেশি ভালবাসেন। সবার বড় ছেলেটিকে হারিয়েছিলেন যখন তার বয়স চার। তারপর মুফতি। মা মুফতীকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “বালিশ-কম্বলের দরকার নেই বাবা, আমার ছেলে ফিরে আসলেই হলো।” 

কত অজানা যায়গায় মুফতী চলে গেছে, কিন্তু প্রতিবারই ফিরে এসেছে। কিন্তু ৭১-এর ১৪ জুনে সেই যে গেল মায়ের ‘আদরের পুতলা’ মুফতী, আর তো ফিরে এলো না! 

১৯৭১। আমাদের প্রজন্মের হিরন্ময় সময়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর অমর ভাষণের পর থেকে ২৫শে মার্চের কালোরাতে পাকিস্তানি  হানাদার বাহিনীর গণহত্যা শুরু পর্যন্ত সময়টি বাঙালির জীবনে দুনিয়া কাঁপানো ১৮ দিন। এ সময়েই বাঙালি জনগণ মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুদ্ধবিদ্যা শেখা ও সামরিক প্রস্তুতির কাজ শুরু করে দেয় এ সময়ে। 

মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য পয়লা মার্চ তারিখে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে আমরা গঠন করি ‘সূর্যসেন স্কোয়াড’। ২৭ মার্চ ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের পথে আমাদের কয়েক জনের যাত্রা শুরু হল। প্রধানত, হেঁটে মুক্তাগাছায় আমরা পৌঁছে যাই এপ্রিলের শুরুতে। ময়মনসিংহ শহর তখনো মুক্ত। পুলিশ লাইন এবং ইপিআর ক্যাম্পের বাঙালি সদস্য এবং ২য় বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানির সৈন্যরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে। জানতে পারলাম এদের  সাথে যুক্ত হয়েছে ছাত্র স্বেচ্ছাসেবকেরা। প্রতিরোধ রচনা করছে টাঙ্গাইল-মধুপুর হয়ে ময়মনসিংহের পথে আগুয়ান হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে। মুক্তাগাছায় গড়ে উঠেছে একটি ঘাঁটি। আমরাও যুক্ত হয়ে গেলাম সেখানে।

ভাই মুফতীর কাছে বোন সুলতানার চিঠি

ভাই মুফতীর কাছে বোন সুলতানার চিঠি

বহু বছর পর মুফতীর  যুদ্ধদিনের কথা বিস্তারিত শুনি মুফতীর ছোট ভাই ও মুক্তিযুদ্ধের সাথী হাদী হাসানের কাছ থেকে। ক্যাডেট কলেজে মুফতীর সহপাঠী জেনারেল (অব) মোহাম্মদ সাঈদের সাথে ফোনে কথা হয়। বলছিলেন, ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনেই মুফতী বললো, “বার্তা পেয়ে গেছি। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে। ময়মনসিংহ চলে গেল মুফতী। অসহযোগের দিনগুলোতে যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করে দিল।” 

২৭ মার্চ ফুলপূর-তারাকান্দা অঞ্চলের এমপি শামসুল হকের নেতৃত্বে তৎকালীন ইপিআর-এর আঞ্চলিক হেডকোয়ার্টার এবং পুলিশ লাইন থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে মুফতী ও তার সঙ্গীরা। মধুপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে বীরের মত লড়াই করে মুফতী ও তার দল। ১০ এপ্রিল ময়মনসিংহ শহরের পতনের পূর্ব পর্যন্ত মুফতী ও তার ভাই হাদী সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকে প্রতিরোধ সংগ্রামে। পাকিস্তানি গোলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। হয়তো আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হানাদার বাহিনী প্রবেশ করবে শহরে। আমার বড় সাঈদ ভাই এবং সাথী তাজুল ইসলাম বেবি ভাই ও আমি শহরের মিশন রোডের পাশে একটি চার্চ থেকে সংগ্রহ করেছি একটি  ফোর্ড করটিনা গাড়ি। শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি জামালপুরের দিকে। সাথে কয়েকটি হাল্কা অস্ত্র ও পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট থেকে নেয়া একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন। হাদী বর্ণনা করছিলেন ঠিক একই সময়ে একটি ল্যান্ড রোভার জিপ ও একটি ট্রাকে করে মুফতীর  নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধার দল শহর ছেড়ে গফরগাঁয়ে  তাদের গ্রামের দিকে যাত্রা করেছে। কত কাছে থেকেও আমাদের দেখা হয়নি। আহা, সে সময় মুফতীর সাথে দেখা হলে হয়তো আমরা একসাথেই যুদ্ধ করতাম!  

মুফতীর আঁকা কার্টুন। ছোটবোন সুলতানার সংগ্রহ থেকে নেওয়া

মুফতী ও তার দল গ্রামের বাড়ি চলে যায় প্রতিরোধ সংগ্রামকে সংগঠিত করার জন্য। ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারে সে গ্রাম। সেখানে পাকিস্তানিদের পৌঁছানো সহজ ছিল না। এপ্রিল মাসের মধ্যেই হানাদার বাহিনী দখল করে নিয়েছিল জেলা শহরগুলো। মে মাস পার হয়ে জুন থেকে গ্রামের দিকে হানাদার বাহিনী এগুতে থাকে। তাদের পথ চিনিয়ে নেবার জন্যে রাজাকার, আলবদর ও অনুগত বাঙালি পুলিশ তখন তৎপর।  

এখন বলবো ১৪ জুনের কথা। একদিন খবর আসে গফরগাঁওয়ের এমপি অধ্যাপক শামসুল হুদার শ্বশুর সামাদ দফতরি গফরগাঁও থানার পুলিশের একটি দল ধরে নিয়ে যাচ্ছে। মুফতী তড়িৎ সিদ্ধান্ত নেয় বৃদ্ধ সামাদ দফতরিকে উদ্ধার করতে হবে। সে মুহূর্তে তার সাথে কোন মুক্তিযোদ্ধা ছিল না। একমাত্র সম্বল তার থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে মুফতী একাই এগিয়ে গেল। কাউরাইদ স্টেশনের কাছে পাইথল গ্রামের এক ধানক্ষেতের সেচ দেয়ার ড্রেনের আড়ালে অবস্থান নিয়ে একটি ফাঁকা গুলি করলো মুফতী। অল্প দূরে পুলিশ বাহিনী। চিৎকার করে মুফতী বললো দফতরিকে ছেড়ে দিতে। তা না হলে তাদের উপর গুলি করবে মুক্তিযোদ্ধারা। ভয় পেয়ে সামাদ দফতরিকে ছেড়ে দিয়ে উর্ধ্বশ্বাসে পালায় পুলিশ। বৃদ্ধ সামাদ দপ্তরী জীবন ফিরে পেয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে এসেছেন। মুফতীর মিশন সফল। পলায়মান পুলিশের অবস্থান জানতে মাথা একটু উঁচু করেছিল মুফতী। 

ঘাতক বাহিনীর একজন তাকে দেখে ফেলে। বুঝে ফেলে মাত্র একজন মুক্তিযোদ্ধা আছে এখানে। তার ছোড়া গুলি সরাসরি আঘাত করে মুফতীর মাথায়। লুটিয়ে পড়ে মুফতি। এবার ঘাতকেরা এগিয়ে আসে। মুফতীর উপর আরো গুলিবর্ষণ করে তারা চলে যায়। সেই জলমগ্ন ধানক্ষেতে পড়ে থাকে শহীদ মুফতী মোহাম্মদ কাসেদের নিথর দেহ। পরদিন ১৫ জুন তারিখে গ্রামবাসী পরম মমতায় শহীদ মুফতীকে   দাফন করে পাইথল গ্রামের জয়ধর খালী পাড়ায়। ১৭ জুন ময়মনসিংহ শহর হেডকোয়ার্টার থেকে পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামে হানা দিয়ে কবর খুঁড়ে লাশ নিয়ে যায় ময়মনসিংহ শহরে। ময়না তদন্ত হয় সে লাশের। তারপর তার স্বজনদের খোঁজ শুরু করে। দালালরা জানিয়ে ছিল এর বাবা ময়মনসিংহ পৌরসভা অফিসের সচিব।

মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় বহু শোকগাঁথার একটি রচিত হয় পৌরসভা অফিসে। একটি লাশ নিয়ে এসেছে হানাদার বাহিনী। পাকিস্তানি এক মেজর মুফতীর বাবা ওয়াহীদ সাহেবকে নির্দেশ দেয় তার ছেলেকে শনাক্ত করতে। পিতার সামনে পুত্রের লাশ। কী করবেন পিতা? যদি স্বীকার করেন এই লাশ তার পুত্রের, তা হলে তিনি ও তার পরিবার শুধু নয়, মুফতীর সহযোদ্ধাদের সমূহ বিপদ। অস্বীকার করলে শুধু নিজের জীবন বিপণ্ণ হতে পারে।  মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেন পিতা। লাশের দিকে ভাল করে তাকান। তারপর মেজরের চোখের দিকে নিস্পলক, নিষ্কম্প চোখে তাকিয়ে উত্তর দেন এ তার ছেলে নয়। কে জানে, কেন সেই মেজর আর কোন জিজ্ঞাসাবাদ করে না। পৌরসভার একটি কাজ হলো বেওয়ারিশ লাশের দাফনের ব্যবস্থা করা। সেই রাতে কয়েজন কর্মচারিকে নিয়ে ওয়াহীদ সাহেব তার আদরের ধন, দশ পুত্র-কন্যার মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী মুফতীর লাশ গোসল করিয়ে সাদা কাপড়ে মুড়ে কালীবাড়ির সরকারী কবরস্থানে সমাহিত  করেন। তার পরনে ছোপ ছোপ রক্তে ভেজা হলুদ রঙের মোটা খদ্দরের হাফশার্টটি ধুয়ে তিনি রেখে দেন পরম যত্নে। এই শার্টতো তার বড় চেনা। 

৭০-এর ডিসেম্বরে তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মুফতী এসেছে বাসায়। বাবা তাকে নিয়ে গেলেন শহরের অভিজাত গৌরহরি বস্ত্রালয়ে। আর মাত্র এক বছর পর ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বেরোবে পুত্র। একটা স্যুট বানিয়ে দেবেন তাকে। নানা রঙের থান দেখানো হচ্ছে মুফতীকে। মুফতী বললো ওই হলুদ রঙের মোটা খদ্দরের থানটি নামাতে। সে কাপড়ে একটি হাফ শার্ট বানাতে দিল মুফতি। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে এই শার্টে বড় বড় পকেট লাগিয়ে নিল মুফতী যাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেলের কয়েকটি ম্যাগাজিন রাখা যায়।  ১৪ জুন পাইথল গ্রামে যখন শত্রু পক্ষের গুলি মুফতীকে বিদ্ধ করছে, তখন তার গায়ে ছিল এই হলুদ শার্ট। মা ছেলের লাশ দেখেননি, মৃত্যু অবধি মুফতীর এই হলুদ শার্টটি বার বার বুকে চেপে ধরেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুফতীর বন্ধুরা তার কবরে লিখেছেন ‘হে পথিক ক্ষণিক থামো, তারপরে নাও পথ! এ মাটির প্রেমে দিয়েছে যে প্রাণ – এখানেই থেমেছে তার জীবন রথ।’

এবারে কিছু কঠিন সত্যের মুখোমুখি আমাদের দাঁড়াতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকেই মুফতী মোহাম্মদ কাসেদের শহীদ হওয়া বিষয়ে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বহুজনেরা জানতেন। গফরগাঁও অঞ্চলের এমপি অধ্যাপক শামসুল হুদার শ্বশুর বৃদ্ধ সামাদ দফতরিকে শত্রু বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত করতে মুফতী একা এগিয়ে গিয়েছিলেন। মুক্ত করেছিলেন তাকে। কিন্তু নিজের জীবন উৎসর্গ করে। এমপি শামসুল হুদা তো তা জানতেন। বাংলাদেশ হওয়ার পর সামাদ দফতরির পুত্র গফরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। অন্তত জয়ধর খালী পাড়ায় মুফতীর প্রথম কবরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ করতে পারতেন। কিছুই করেননি তারা। ফুলপূর-তারাকান্দা অঞ্চলের মুফতীর   আত্মীয় এমপি শামসুল হকের নেতৃত্বে মুফতী মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। মুফতীর   শহীদ হওয়ার খবরতো তারও জানা। ময়মনসিংহ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড জানতো সে তথ্য। ময়মনসিংহের গৌরীপুর এলাকার বর্তমান আওয়ামী লীগ এমপি নাজিমুদ্দিন আহমেদ। সব জানেন মুফতীর   শহীদ হওয়া সম্পর্কে। রাজাকার, আলবদর, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানদের নাম উঠেছে মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদের তালিকায়। মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদের তালিকায় মুফতীর নামটি যুক্ত করতে এদের বড়ই অনীহা।

ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্র ও স্বনামধন্য দাবা খেলোয়াড় হিসেবে মুফতীর  পরিচয় তো অজানা ছিল না। তারপর ও কেন শহীদের তালিকায় এই বীরের নাম নেই। ছোট ভাই ও সহযোদ্ধা হাদীর ক্ষোভ ও আক্ষেপ সেখানে। বলছিলেন তিনি, “সারা পৃথিবীর মানুষ যারা মুক্তিযুদ্ধকালে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন, সরকার তাঁদের যথাযোগ্য সম্মান জানিয়েছে। সে জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু নিজ দেশে মুফতীর মত এমন একজন উৎসর্গিত মুক্তিযোদ্ধার নাম কেন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায়, শহীদের তালিকায় নেই? কেন তার সরকারী স্বীকৃতি থাকবে না।” 

অধ্যাপক কামরুলের কাছে জানলাম বুয়েটে মুফতীর নাম শহীদের তালিকায় আছে। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ কর্তৃপক্ষ ভুলে যায়নি মুফতী কাসেদকে। কিন্তু সরকার, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কী করেছেন? প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এবং তিতুমীর হলে শহীদের তালিকায় মুফতীর   নাম আছে। তারপরও বলবো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যাপকরা বিশেষ করে মুফতীর সহপাঠী যারা সেখানে অধ্যাপনা করেছেন, তাদের আরো কিছু কর্তব্য আছে। মুফতীর পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানলাম, মুফতীর   ছবি, অ্যালবাম, ব্যবহার্য দ্রব্যাদি বুয়েটের একজন অধ্যাপককে তারা দিয়েছিলেন। তিনি চলে গেছেন আমেরিকায়। মুফতীর ব্যাপারে কোন উদ্যোগও নেননি। মহা মূল্যবান মুফতীর স্মৃতি যা কিছু নিয়েছিলেন তার কোন কিছু আর ফেরতও দেননি তিনি। মুফতীর নামে যে দাবা প্রতিযোগিতা হত, তাও নেই। ‘বুয়েট চেস ক্লাব’ আছে। শহীদ মুফতীর   নামে যে এই ক্লাবটি হতে পারে এমন কোন বোধ এই স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কারও কি নেই?


এই লেখা যখন শেষ করে এনেছি, তখন গতরাতে হাতে এলো এক গুচ্ছ দুর্লভ চিঠির ফটো কপি। হাদী হাসান পাঠিয়েছেন। জানিয়েছেন মুফতীর ডায়রি ও আরো বহু চিঠি ছিল। সেগুলো উদ্ধার করা যায়নি। বেশিরভাগ নিয়েছেন গুণীজনেরা, ফেরত দেননি। বাকি সব উঁইপোকার পেটে গেছে। ফৌজদারহাট কলেজে পড়বার সময় মুফতী লিখেছে বাবা-মা-ভাই-বোনদের। মুফতীকে লেখা তাদের  চিঠিও আছে। ক্লাস সিক্স থেকে শুরু করে ক্লাস টেন পর্যন্ত মুফতী সবচেয়ে বেশি লিখেছে বাবাকে। সব চিঠি ইংরেজিতে। বাবাও দীর্ঘ চিঠি লিখেছেন পুত্রকে। ইংরেজিতে। ছোট বেলা থেকে ছেলে-মেয়েদের ইংরেজি শিখিয়েছেন। তার ছাপ পাওয়া গেল ক্লাস সিক্সে পড়বার সময়ে মুফতীর ইংরেজিতে লেখা চিঠি দেখে। 

শুরুতে ছোট বোন সুলতানার রুমাল গুছিয়ে দেওয়ার কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। ভাইকে লেখা তার চিঠিও আছে। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাকে লেখা মুফতীর একটি চিঠি, তারিখ বিহীন। মুফতীর আঁকা কার্টুন আছে। সবার ছোট ছেলে আমেরিকা প্রবাসী প্রকৌশলী পুত্র তোফাকে লেখা বাবার চিঠিটি ইংরেজিতে টাইপ করা। বয়স তখন তার ৮৫। তাই হয়তো হাতে লিখতে অপারগ হয়েছেন। গভীর অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন এক দার্শনিকের পত্র যেন পাঠ করলাম। পত্রের শেষ কটি লাইন, “So pray for me – for your mother & our forefathers  who have preceded us to the Great unknown. It is immaterial in whichever part of this planet we live & die – because we must leave it – our stay here is very insignificant in the boundless canvas of eternity.”

আহা, এই বাবা শেষ পর্যন্ত দেখে যেতে পারেননি তার সবচাইতে যোগ্য পুত্র মুফতীর নামটি শহীদের তালিকায় উঠেছে! 


শেষ করবো কয়েকটি প্রস্তাব করে:

১. মুক্তিযোদ্ধা তালিকা এবং মুক্তিযুদ্ধে মহান শহীদদের তালিকায় মুফতী মোহাম্মদ কাসেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হোক। সে লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম মোজাম্মেল হক এবং সচিব জনাব তপন কান্তি ঘোষের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

২. মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করে দখলদার বাহিনীর হাত থেকে বৃদ্ধ সামাদ দফতরিকে উদ্ধার এবং বিনিময়ে নিজের  জীবন উৎসর্গ করার যে মহত্তম দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তার জন্য মুফতী মোহাম্মদ কাসেদকে মরণোত্তর বীরত্বসূচক খেতাব দেওয়া হোক। আশা করি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

৩. ময়মনসিংহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ কোনও স্থানে তার একটি আবক্ষ ভাস্কর্য স্থাপন করা হোক। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ পৌরসভা ও জেলা প্রশাসকের সুদৃষ্টি কামনা করছি।  

৪. বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কোন হল বা স্থাপনার নাম মুফতী মোহাম্মদ কাসেদের নামে করা হোক। খুব আশা করছি মাননীয় উপাচার্য এবং সিন্ডিকেট এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। শহীদ মুফতীর   নামে হোক ‘বুয়েট চেস’ ক্লাবটি। দাবা টুর্নামেন্ট আবার চালু হোক তার নামে।

৫. ১৯৭১ সালের ১৪ জুন গফরগাঁও থানায় কর্মরত যে পুলিশ সদস্যরা মুফতীর  হত্যাকাণ্ডে জড়িত তাদের খুঁজে বের করা হোক। কেউ জীবিত থাকলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচারের সম্মুখীন করা হোক। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মহামান্য বিচারকদের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

২৩ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিয়েছিল মুফতী। আমার বয়স এখন ৭১। দীর্ঘদিন বেঁচে আছি। মৃত্যুর আগে যদি উপরের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হয়, তবে নিজের জীবনকে ধন্য মনে করবো। ভাইয়ের জন্য পরম মমতায় যে ছোট বোন সুলতানা রুমাল গুছিয়ে দিয়েছিল, মুফতীর  সহযোদ্ধা ছোটভাই হাদী যে তার সাথে বেহালা বাজাতো সে ও মুফতীর পরিবারের বাকি সদস্যরা তাতে হয়তো কিছুটা শান্তি পাবে।

(ড. মো. আনোয়ার হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও শহীদ মুফতী মোহাম্মদ কাসেদের স্কুল জীবনের বন্ধু।)



Saturday, October 31, 2020

‘সিলিকন ভ্যালি’ এখন হতাশার নাম

‘সিলিকন ভ্যালি’ এখন হতাশার নাম

কথা ছিল যশোর শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক হবে বাংলাদেশের সিলিকন ভ্যালি। মেধাভিত্তিক অর্থনীতির দ্বার উন্মোচিত হবে পার্কটি চালুর মাধ্যমে। তিন বছর পর সেটি এখন হতাশার নাম।


কেন হতাশা? কারণ, বিনিয়োগ ততটা হয়নি, যতটা প্রত্যাশিত ছিল। বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি বললেই চলে। বর্তমান বিনিয়োগকারীদের বেশির ভাগ প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল মার্কেটিং, কল সেন্টার পরিচালনা ও গ্রাফিকস ডিজাইনিংয়ের কাজ করেন। কর্মসংস্থানের লক্ষ্য পূরণের ধারেকাছেও যেতে পারেনি পার্কটি। বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ পার্কটি ছেড়েছেন। বিপুল ব্যয়ে নির্মিত ডরমিটরি বা আবাসনসুবিধা খালিই থাকছে। সম্মেলনকেন্দ্র বা অ্যাম্ফিথিয়েটার বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক উদ্বোধন করা হয়। যশোর শহরের নাজির শঙ্করপুর এলাকায় ১২ একরের কিছু বেশি জমিতে পার্কটি করতে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৩০৫ কোটি টাকা। এটি চালুর আগে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ গণমাধ্যমে বলেছিলেন, যশোর হাইটেক পার্ক হবে বাংলাদেশের সিলিকন ভ্যালি। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি বহু প্রযুক্তি কোম্পানির আঁতুড়ঘর। গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সেটি অদ্বিতীয়।

যশোর শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে বক্তব্য জানতে নানাভাবে চেষ্টা করেও প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তাঁকে এ-সংক্রান্ত প্রশ্নও লিখে পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি কোনো জবাব দেননি।

বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসনে আরা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, কিছু সমস্যা আছে। বিনিয়োগকারীদের নানা চাহিদা আছে। ভাড়া মওকুফ, বিদ্যুৎ বিল মওকুফসহ অনেক কিছুই তাঁরা চাইতে পারেন। কিন্তু এটা তো কোনো সংস্থা করতে পারে না। বিনিয়োগকারীদের সব চাওয়া সঠিক নয়।

বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে না পারার বিষয়ে হোসনে আরা বলেন, ‘বড় প্রতিষ্ঠান আসার চেয়ে সফটওয়্যারের কাজ হবে, তেমনটাই কথা ছিল। বড় প্রতিষ্ঠান এলে তাদের আমরা উৎসাহ দেব। বড় প্রতিষ্ঠান না আসায় সে উৎসাহের বিষয়টি হয়নি।’

বিনিয়োগ মাত্র ৬০ কোটি টাকা

হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ জানায়, এখন পর্যন্ত যশোর হাইটেক পার্কে বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। পার্কটি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান টেক সিটি জানিয়েছে, সেখানে ৫০টি প্রতিষ্ঠান জায়গা বরাদ্দ নিয়েছে। এর মধ্যে কার্যক্রমে রয়েছে ৩৮টি। অবশ্য সরেজমিনে ৩২টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পাওয়া যায়।

পার্কটির মূল ১৫ তলা ভবনে ১ লাখ ৩৭ হাজার বর্গফুট জায়গা ইজারাযোগ্য। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া প্রায় ৯৫ হাজার বর্গফুট। ৩টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১০ হাজার বর্গফুট জায়গা নিয়ে ফেলে রেখেছে। ফলে ৩৮ শতাংশ জায়গা এখনো খালি রয়েছে। আশানুরূপ বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থানও হয়নি। মোট ১ হাজার ৪০০ কর্মী সেখানে কাজ করেন। তবে প্রতিষ্ঠার সময় পাঁচ হাজার কর্মীর কাজ পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

বিনিয়োগের ধরনও খুব বেশি আশাজাগানিয়া নয়। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই প্রশিক্ষণধর্মী। তারা বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে প্রশিক্ষণের কাজ করে। সফটওয়্যার তৈরি করে, এমন প্রতিষ্ঠান রয়েছে মাত্র ছয়টি, যা হলো মাইক্রো ড্রিম আইটি, টেকনোসফট বাংলাদেশ, সফট এক্স টেকনোলজি, ডেসটিনি আইএনসি ডট, সেমিকোলন আইটি ও অংশ ইন্টারন্যাশনাল। কিছু প্রতিষ্ঠান কল সেন্টার পরিচালনা, ডিজিটাল বিপণন, গ্রাফিকস ডিজাইনসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করে। সূত্র জানায়, পার্কটিতে বিদেশি কোনো বিনিয়োগ নেই। ডেসটিনি আইএনসি ডট নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে জাপানি বিনিয়োগকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আসলে প্রতিষ্ঠানটির মালিক বাংলাদেশি, যিনি জাপানে থাকেন।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবদুস সাত্তারের এন সল্যুশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে যশোর হাইটেক পার্কে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভেবেছিলাম বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো যশোর হাইটেক পার্কে বিনিয়োগ করবে। তাদের মাধ্যমে আমরাও শিখব। কিন্তু কিছুই হয়নি।’ এখন নিজের প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়েই শঙ্কার কথা জানান তিনি।

পার্ক ছেড়েছে ১৭টি প্রতিষ্ঠান

৩ বছরে ১৭টি প্রতিষ্ঠান যশোর হাইটেক পার্ক ছেড়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা যেসব প্রত্যাশা নিয়ে গিয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। এর মধ্যে একটি বড় সমস্যা দক্ষ জনবল না পাওয়া। ইজারামূল্য নিয়ে বিরোধ, উন্নত বিদ্যুৎ সেবা না থাকা এবং বিভিন্ন দাবিদাওয়াকেও সমস্যার তালিকায় যুক্ত করছেন বিনিয়োগকারীরা।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, সরকারের যেসব স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেয়, তাতে কোনো দক্ষ কর্মী তৈরি হয় না। ২০১৭ সালে যশোর পার্কে বেশ আয়োজন করে চাকরি মেলা করা হয়েছিল। চাকরিপ্রার্থীদের প্রচুর আবেদন জমা পড়ে। কিন্তু সেখান থেকে জনবল তৈরি হয়নি।

সে সময়ে যশোর পার্কের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন যুগ্ম সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম (বর্তমানে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক তরুণ সাড়া দিয়েছিল। কিন্তু যেহেতু এটা তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ের, তাই সবার আবেদন নেওয়া যায়নি।’

একটি ডেটা সেন্টার করতে চেয়েও যশোর হাইটেক পার্কে তা করতে পারেনি ঢাকাকোলো লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ডেটা সেন্টারের জন্য বিদ্যুতের একাধিক বিকল্প উৎস থাকতে হয়। অন্তত দুটি জেনারেটর থাকতে হবে। কিন্তু হাইটেক পার্কে জেনারেটর বসানোর মতো কোনো জায়গা নেই। বিদ্যুতের বিকল্প উৎসও পাওয়া যায়নি।

যশোর হাইটেক পার্কটিকে ১৫ বছরের জন্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে টেকসিটি বাংলাদেশ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে। তাদের নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নানা অভিযোগ রয়েছে। একটি হলো ইজারামূল্য। কোনো প্রতিষ্ঠানের বর্গফুটপ্রতি ১৮ টাকা, কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২২ টাকা ভাড়া নেওয়া হয় বলে অভিযোগ। সূত্র জানিয়েছে, ছয়টি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের ভাড়া তিন মাসের বেশি বকেয়া রয়েছে। অবশ্য যারা হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ইজারা নিয়েছিল, তাদের ভাড়া পড়েছে বর্গফুটপ্রতি ১৪ টাকা।

টেকসিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওয়াহিদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এখানে নীতিগত কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেটা ভেবে হাইটেক পার্কের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তবতার অনেক পার্থক্য। এত বড় একটা অবকাঠামোর ব্যবস্থাপনার খরচ অনেক। অনেক কিছু হিসাব না করেই সরকার সেখানে ভাড়া নির্ধারণ করেছিল। তিনি পাল্টা অভিযোগ করেন, বিনিয়োগকারীদের অনেকে ভাড়া দিচ্ছেন না। তাঁদের কাছে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা ভাড়া বাকি।

‘সিলিকন ভ্যালি’ এখন হতাশার নাম

অ্যাম্ফিথিয়েটারে বিয়ে, ডরমিটরি খালি

যশোর হাইটেক পার্কে ডরমিটরিটি তিন তারকা মানের। মোট কক্ষ ৯০টি। ভিআইপি সুইট কক্ষ ১২টি, ফ্যামিলি ডিলাক্স কক্ষ ৩৬টি ও দুই বিছানার কক্ষ ৩০টি। ১৪০ জনের মতো থাকার সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। ভিআইপি কক্ষে থাকার জন্য প্রতি রাতের ভাড়া ৭ হাজার ৬০০ টাকা ও অপর দুই ধরনের কক্ষের ভাড়া ৩ হাজার ৮০০ টাকা করে। তবে পার্কে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ভাড়া নির্ধারিত আছে ৮০০ টাকা।

কথা ছিল দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, ক্রেতা ও কর্মীরা গেলে ডরমিটরিতে থাকবেন। যদিও এখন বেশির ভাগ কক্ষ সব সময় খালি থাকে। ২২ অক্টোবর গিয়ে দেখা গেছে, মাত্র ১২ জন অতিথি আছেন। পুরো সেপ্টেম্বর মাসে ডরমিটরিটিতে ১৬২ জন অতিথি ছিলেন।

সম্মেলন কেন্দ্র বা অ্যাম্ফিথিয়েটার করা হয়েছিল সম্মেলন, সভা-সেমিনার করার জন্য। এখন বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্যও ভাড়া দেওয়া হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে যশোরের একজন পরিবহন ব্যবসায়ীর ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল অ্যাম্ফিথিয়েটারে। সেখানে অতিথি ছিলেন প্রায় আড়াই হাজার মানুষ।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত ততটা বড় হয়নি। এমন তো নয় যে দেশে হাজার হাজার কোম্পানি তৈরি হচ্ছে। কোম্পানি যদি তৈরি না হয়, হাইটেক পার্কে কারা যাবে? তিনি বলেন, দেশে বেশির ভাগ কোম্পানির জনবল ২০ থেকে ৩০ জন। এত কম লোক নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের ঢাকার বাইরের পার্কে যাওয়া পোষাবে না।

ফাহিম মাশরুরের মতে, শুধু পার্ক বানালেই হবে না, প্রযুক্তি খাত যাতে বড় হয়, চাহিদা তৈরি হয়, সে ব্যাপারে সরকারকে কাজ করতে হবে। এসব পার্ক নির্মাণের আগে দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিষয়েও মনোযোগী হতে হবে।

‘করার জন্যই করা হয়’

তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার লক্ষ্যে সরকার ২৮টি হাইটেক পার্ক করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। পরে ৬৪টি জেলায় হাইটেক পার্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে। বিগত পাঁচ বছরে ঢাকায় জনতা টাওয়ার সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, যশোরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটি, নাটোরে শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার এবং রাজশাহীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাইটেক পার্ক চালু হয়েছে।

এ বিষয়ে বৃহৎ প্রকল্প বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের প্রকল্প করার আগে সম্ভাব্যতা যাচাই এবং দক্ষ জনবল থেকে শুরু করে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হয়। নিয়ম হচ্ছে, পাইলট (পরীক্ষামূলক) প্রকল্প করা। তার সফলতার ভিত্তিতে বাকিগুলো করতে হয়। এতে আগের ভুল বা সমস্যাগুলো যাচাইয়ের সুযোগ থাকে। আমাদের এখানে সেটা হচ্ছে না। প্রকল্প করতে হবে, তাই করা হয়।’


সুহাদা আফরিন

সুহাদা আফরিনমনিরুল ইসলামঢাকা ও যশোর

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২০, ১০:২৮


Monday, October 19, 2020

বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ বীরপ্রতীক

বঙ্গবন্ধুর কোলে যার ছবি, যে কিশোরটিকে দেখছেন তার নাম শহীদুল ইসলাম লালু, বীরপ্রতীক। বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ বীরপ্রতীক, যিনি মাত্র ১৩ বছর বয়সে এই খেতাব পেয়েছেন।

কি করেছিলেন লালু? অপারেশন গোপালপুর থানা নামে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের ঘটনাটি একান্তই শহীদুল ইসলাম লালুময়। যুদ্ধের উত্তুঙ্গ দিনগুলোতে গ্রুপ কমান্ডার পাহাড়ি তাকে নির্দেশ দেন গোপালপুর থানার হালহকিকত জেনে আসতে, মুক্তিযোদ্ধারা কিভাবে তা দখল করতে পারে। লালু গিয়ে সেখানে তার এক দূর সম্পর্কের তুতো ভাই সিরাজের দেখা পান। সিরাজ পাকিস্তানী সেনাদের দালালী করে, তাকেও একই কাজ করার প্রস্তাব দেয়। লালু রাজী হয়ে যান। পরের দফা তিনটি গ্রেনেড নিয়ে থানায় হাজিরা দেন তিনি। অল্পবয়স বলে তাকে চেক করা হয় না। মুক্তিযোদ্ধাদের আগেই জানান দিয়ে রেখেছিলেন তার অভিপ্রায়। পুরো পুলিশ স্টেশন একবার চক্কর মেরে এসে, এক বাংকারে প্রথম গ্রেনেড চার্জ করলেন লালু। ভীত ও হতভম্ব পাকিস্তানীরা আন্দাজে গুলি ছুড়তে শুরু করে লক্ষহীন। শুয়ে লালু দ্বিতীয় গ্রেনেডটি ছোড়েন, কিন্তু এটা ফাটে না। এখান থেকে আর বেরুনো হবে না- এই ভয় পেয়ে বসে তাকে। তারপরও তৃতীয় গ্রেনেডটি সশব্দে ফাটে আরেকটি বাংকারে। এদিকে মুক্তিযোদ্ধারাও এগিয়ে এসেছেন। গোলাগুলির এই পর্যায়ে সিরাজ এসে লালুকে একটি অস্ত্র ধরিয়ে দেয়, জিজ্ঞেস করে চালাতে পারে কিনা। লালু তাকে পয়েন্ট ব্ল্যান্ক রেঞ্জে গুলি করেন। এই ঘটনায় কিছু পাকিস্তানী পালায়, কিছু ধরা পড়ে, মারা যায় অনেক। হতাহতের মধ্যে দিয়েও মুক্তিযোদ্ধারা দখল করে নেন গোপালপুর থানা। বলতে গেলে শহীদুল ইসলাম লালুর একক কৃতিত্বে। 

Friday, September 25, 2020

নিমতলা কোর্ট চত্বর মেহেরপুর

 

যায়গাটা সবাই চেনে
সবাই যানে এটা মেহেরপুর কোর্ট চত্বরের #নিমতলা কিন্তু অনেকেই জানেনা এই নিমতলার ইতিহাস।
হ্যা ছবির এই লোকটি এই নিমগাছের বহমান জীবিত সাক্ষি।
১৯৬৪ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর তিনি এই গাছটি এখানে লাগান। মানুষটার নাম মো রমজান অালি মোহরি।
গ্রাম হরিরামপুর, অনেক্ষন কথা বললাম মুরুব্বির সাথে। আমার মনে হয় এখনকার যত বড় সব উকিল, মুহরি রয়েছেন তাহার নিচ সব।
শ্রদ্ধার সাথে সালাম যানাই এই মানুষটি কে।

Thursday, September 24, 2020

নিয়ন আলোয় ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে বাংলার প্রথম নারী শহীদ

 


১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পাহাড়বেষ্টিত ভূখণ্ড কর্ণফুলী নদীর উত্তাল স্রোত এসে যেখানে বঙ্গোপসাগরে মিশে গেছে সেই পটিয়ার ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আমাদের অগ্নিযুগের অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা। কন্যাসন্তান তার ওপরে গায়ের রঙ কালো। সে সময়ে এমনিতেই কন্যাসন্তানের জন্ম খুব স্বাভাবিকভাবে নিতে পারত না সব পরিবার। প্রীতিলতার বাবা জগদ্বন্ধু ওয়েদ্দেদার ছিলেন মিউনিসিপাল অফিসের হেড কেরানি। 

৫ মে যখন প্রীতিলতার জন্ম হয় তার বাবা খুশি হতে পারেননি। তার ওপর প্রীতিলতার গায়ের রঙ ছিল কালো। মায়ের নাম ছিল প্রতিভা দেবী। পরিবারের ৬ ভাই বোনের মধ্যে প্রীতিলতা ছিল দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকে অন্তর্মুখী, লাজুক ও মুখ চোরা ছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি নম্রতা, বদান্যতা, রক্ষণশীলতা লালন করেছিলেন। প্রীতিলতার ডাকনাম ছিল রানী। 


প্রীতিলতার পড়াশোনার হাতেখড়ি মা-বাবার কাছে। তার স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। জগদ্বন্ধু ওয়েদ্দেদার মেয়েকে ড. খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে সরাসরি তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করান। অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পান তিনি। ওই স্কুল থেকে ১৯১৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন প্রীতিলতা। তারপর ভর্তি হন ঢাকার ইডেন কলেজে। কলেজে পড়া অবস্থায় লীনা নাগের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। লীনা নাগ ওই সময়ে দীপালি সংঘের নেতৃত্বে ছিলেন। শিক্ষা জীবনে প্রীতিলতা সফলতা অর্জন করেন। ১৯৩০ সালে সবার মধ্যে পঞ্চম ও মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে আইএ পাস করেন। বিএ পাস করে তিনি চট্টগ্রামের নন্দন কানন অর্পনাচরন ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন। ইডেন কলেজে পড়ার সময় বিপ্লবী সংগঠন 'দীপালি সংঘ' ও বেথুন কলেজে থাকতে 'ছাত্রী সংঘের সক্রিয় কর্মী হলেও মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি স্কুলের শিক্ষকতায় যোগদানের পর।

প্রীতিলতা যখন চট্টগ্রামের ড. খাস্তগীর স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী তখন দেখলেন যে মাস্টারদা সূর্যসেন ও আম্বিকা চক্রবর্তীকে রেলওয়ের টাকা ডাকাতির অপরাধে মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছে।১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল বিপ্লবী নেতা মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে অস্ত্র লুট, রেললাইন উপড়ে ফেলা, টেলিগ্রাফ-টেলিফোন বিকল করে দেয়াসহ ব্যাপক আক্রমণ হয়। এ আক্রমন চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ নামে পরিচিতি পায়।এ আন্দোলন সারাদেশের ছাত্রসমাজকে উদ্দীপ্ত করে। 

চাঁদপুরে হামলার ঘটনায় বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসির আদেশ হয়। এবং তিনি আলীপুর জেলে বন্দি হন। প্রীতিলতা রামকৃষ্ণের বোন পরিচয় দিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতেন। রামকৃষ্ণের প্রেরণায় প্রীতিলতা বিপ্লবী কাজে আরো বেশি সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৩১ সালে ৪ আগস্ট রামকৃষ্ণের ফাঁসি হওয়ার পর প্রীতিলতা আরো বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। ওই সময়ের আরেক বিপ্লবী কন্যা কল্পনা দত্তের সঙ্গে পরিচয় হয় প্রীতিলতার। বিপ্লবী কল্পনা দত্তের মাধ্যমে মাস্টারদার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন প্রীতিলতা। 

বিশ শতকের শুরু থেকে তিরিশের দশক ছিল ‍বৃটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের অগ্নিযুগ।অনুশীলন, স্বদেশী, খেলাফত, অসহযোগ, কমিউনিস্ট আন্দেোলন, সংগ্রাম, বিপ্লব, প্রবল আকার ধারণ করে।কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, প্রজা সমিতি প্রভৃতি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোও শক্তিশালী হওয়ায় সাধারণ মানুষ সচেতন হয়ে ওঠে। এ সময়ে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু ফাঁসিকাষ্ঠে আত্মদান করেন, প্রফুল্ল চাকীর আত্মহত্যাও নিকটবর্তী সময়ে, ঘটে খ্যাতনামা বিপ্লবী বিনয়, বাদল, দীনেশদের রাইটাস বিল্ডিং এ অলিন্দ যুদ্ধ ও আত্মাহুতি, ১৯৩০ সালে সূর্যসেনের নেতৃত্বে ঘটে ঐতিহাসিক চট্রগ্রামে অস্ত্রগার লুণ্ঠন ।

পূর্ণেন্দু দস্তিদার টেবিলের পাশে বসে রানীর ইতিহাসের বইটি উল্টাচ্ছিলেন। হঠাৎ বইয়ের পৃষ্ঠার মধ্য থেকে একটি ছবি পড়ে গেল। রানী ছবিটি উঠিয়ে দাদাকে দেখিয়ে বলে, "নিশ্চয়ই তুমি এই ছবিটি চেনো? 'ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাই'। এই বই অনেক আগেই পড়ে শেষ করেছি।সিদ্ধান্ত নিয়েছি ঝাঁসির রানী, রানী ভবানীর মতো আমি দেশের জন্য কাজ করবো, লড়বো। প্রয়োজনে এদের মতো জীবন উৎসর্গ করবো। তোমাদের সাথে যুক্ত হব।তাছাড়া তোমরা আমায় 'রানী' বলে ডাক।নাটোরের রানী আর ঝাঁসির রানী যা পেরেছিল, চাটগাঁর রানী নিশ্চয়ই তা পারবে, দাদা?

১৯৩২, ১৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কাট্টলী গ্রামে এক গোপন বৈঠকের উদ্দেশ্যে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত রওনা হন, কিন্তু পথে পাহাড়তলীতে কল্পনা দত্ত ধরা পড়েন। মাষ্টারদা সূর্য সেন পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের নেতৃত্ব প্রীতিলতাকে নিতে বলেন। 

২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ 

ইউরোপিয়ান ক্লাব : 

পরনে ছিল মালকোঁচা দেওয়া ধুতি আর পাঞ্জাবী, চুল ঢাকার জন্য মাথায় সাদা পাগড়ি এবং পায়ে রাবার সোলের জুতা।

সাথে ছিলেন - কালীকিংকর দে, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, শান্তি চক্রবর্তী (এদের পরনে ছিল- ধুতি আর শার্ট), মহেন্দ্র চৌধুরী, সুশীল দে এবং পান্না সেন (এদের পরনে ছিল- লুঙ্গি আর শার্ট)।রাত আনুমানিক ১০টা ৪৫ এর দিকে ক্লাব আক্রমণ শুরু হয়। সেদিন ছিল শনিবার, তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বিপ্লবীরা ক্লাব আক্রমণ শুরু করেন।প্রীতিলতা হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ শুরুর নির্দেশ দেবার পরেই ঘন ঘন গুলি আর বোমার আঘাতে পুরো ইউরোপিয়ান ক্লাব কেঁপে উঠেছিলো।কয়েক জন ইংরেজ অফিসারের কাছে রিভলবার থাকায় তারা পাল্টা আক্রমণ করে।প্রীতিলতার দেহের বাম পাশে গুলি লাগে।আক্রমণ শেষে পূর্ব সিদ্বান্ত অনুযায়ী প্রীতিলতা পটাসিয়াম সায়ানাইড খান।কারণ ধরা পড়লে বিপ্লবীদের অনেক গোপন তথ্য ব্রিটিশদের নৃসংশ অত্যাচারের ফলে ফাঁস হয়ে যেতে পারে। ক্লাবের পাশে পড়ে থাকা লাশটিকে পুলিশ প্রথমে পুরুষ ভেবে ভুল করে। কিন্তু মাথার পাগড়ি খুলে লম্বা চু্লের মেয়েটিকে দেখে শুধু পুলিশ নয়, গোটা ব্রিটিশ সরকার নড়েচড়ে ওঠে। আলোড়িত আর আন্দোলিত হয় গোটা ভারতবর্ষ আর বাঙালি, দেশভাগের আগের সেই ভারত বর্ষ স্বাধীনতা লাভের সোপানে আরেক পা অগ্রসর হয়, ২১ বছরের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের বাঙালি মেয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জীবন উৎসর্গ করে রচনা করে গেলেন ইতিহাস ! 

প্রমান করে দিলেন নারী আর পুরুষের 

মধ্যে ব্যবধান শুধু প্রকৃতিগত, 

সাহসিকতায় তারা এক কাতারে ।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এর আত্মাহুতি দিবসে 

সশ্রদ্ধ  সালাম.....

Wednesday, August 12, 2020

সাবেক জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি এর নামে মামলা

 

মেহেরপুর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বারিকুল ইসলাম লিজন ও সদর থানার ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আনন্দর নামে আদালাতে মামলা ও সদর থানায় এজহার করেছে খোকন নামে এক ব্যক্তি। অজ্ঞাতনামা রয়েছে ৬/৭ জনের বিরুদ্ধে।

বুধবার দুপুরে এ মামলা করা হয়েছে মেহেরপুর আদালাতে। মামলা নং ১৯৯/২০। মামলা তদন্তের জন্য জেলা গোয়েন্দা পুলিশের(ডিবি) কাছে দিয়েছে আদালত। লিজন আমদাহ ইউপি চেয়ারম্যান আনারুল ইসলামের ছেলে। আনন্দ শহরের গোরস্থান পাড়ার আব্দুল বারি ছেলে।

মামলার বিবরণে জানা গেছে, মেহেরপুর সদর উপজেলা আশরাফপুর গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমান হবির ছেলে খোকন কে মারপিট করেছে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বারিকুল ইসলাম লিজন ও সদর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আনন্দ।

গত ১ আগস্ট ঈদের দিন বিকালে আশরাফপুর গ্রামের সোহাগ ও আশরাফুল নামে দুই যুবক সজিবকে এলোপাতাড়ি ভাবে কুপিয়ে জখম করলে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।

গ্রামের ছেলে হিসেবে সজীবকে হাসপাতালে দেখতে যায় খোকনসহ কয়েকজন। পরে লিজন ও আনন্দ সহ অজ্ঞাতনামা ৬/৭ জন হাসপাতালের ভিতরে গিয়ে খোকনকে বলে এই তোরা এখানে কি করতে এসেছিস এই বলে হত্যার করার উদ্দেশ্যে এলোপাতাড়ী মারপিট করে খোকনকে। পরে পুলিশ গেলে জখম করে তাকে ফেলে পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় হত্যার হুমকি দিয়ে বলে পরে দেখে নেব।

এই বিষয়ে বারিকুল ইসলাম লিজন ও আনন্দের সাথে কথা বললে-তারা জানায় এই শব ভুয়া ও মিথ্যা সাজানো নাটক। সঠিক ভাবে তদন্ত করা হলে আসল ঘটনা বের হয়ে আসবে।

Sunday, July 5, 2020

e-GP সিস্টেমে উল্লেখিত প্রকিউরমেন্ট মেথডগুলোর সংক্ষিপ্ত রুপের পূর্ণরুপ

e-GP সিস্টেমে এডভান্স সার্চ অপশনে গেলে আমরা ‘প্রকিউরমেন্ট মেথড’ কম্বো বক্সে ক্লিক করলে ১৬ টি মেথডের নাম সংক্ষিপ্ত রুপে দেখতে পাই। আজকের এই লিখায় আমি এই সংক্ষিপ্ত রুপগুলোর পূর্ণরুপ লিখবো।
অদূর ভবিষ্যতে আল্লাহ তায়ালা তৌফিক দান করলে সবগুলো প্রকিউরমেন্ট মেথড নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার নিয়ত আছে। আভ্যন্তরিন ক্রয় ও আন্তর্জাতিক ক্রয়ের (কার্য, পণ্য, সেবা – Works, Goods, Services) ক্ষেত্রে কোন্ মেথড কখন ব্যবহার করার আইন ও বিধি রয়েছে, সেই বিষয়েও Public Procurement Act (PPA-2006) ও Public Procurement Rules (PPR-2008) এর আলোকে আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।
আপনাদের দোয়া আমার লিখার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
এবার প্রকিউরমেন্ট মেথডগুলোর পূর্ণরুপ দেখিঃ
১। RFQ = Request for Quotation
২। OTM = Open Tendering Method
৩। LTM = Limited Tendering Method
৪। TSTM = Two Stage Tendering Method
৫। QCBS = Quality & Cost Based Selection
৬। LCS = Least Cost Selection
৭। SFB = Selection under a Fixed Budget
৮। DC = Design Contest
৯। SBCQ = Selection Based on Consultant’s Qualifications
১০। SSS = Single Source Selection
১১। IC = [PPR-2008 তে একে SIC = Selection of ‘Individual Consultant’ বলে, অনেকে আবার ICS = ‘Individual Consultant’ Selection বলে]
১২। CSO = Selection amongst ‘Community Service Organisations’ (CSOs)
১৩। DPM = Direct Procurement Method
১৪। OSTETM = One Stage Two Envelopes Tendering Method
১৫। RFQU = ‘Request For Quotation Unit’ Rate
১৬। RFQL = Request For Quotation Lump Sum

নবীন ও অভিজ্ঞ ঠিকাদারদের সফলতার প্রস্তুতি

যেকোন ব্যবসায় সফলতার জন্য সুন্দর প্রস্তুতির দরকার। আর ব্যবসার অন্যতম সৌন্দর্য প্রোপার ডকুমেন্টেশন (প্রয়োজনীয় নথি-পত্র প্রনয়ণ ও সংরক্ষণ)।
একটা চাকরির বিজ্ঞাপনে মাস্টার্স পাশ যোগ্যতা চাওয়া হলেও আমরা একাডেমিক সার্টিফিকেটের পাশাপাশি (না চাইলেও) ভাষা-শিক্ষার সার্টিফিকেট, কম্পিউটার শিক্ষার সার্টিফিকেট, ক্রীড়ার সার্টিফিকেট, সামাজিক কর্মকান্ডের সার্টিফিকেট ইত্যাদি (যার যা আছে) সংযুক্ত করে দেই। নিয়োগ-কর্তার বাড়তি দৃষ্টি/সুনজর আকর্ষনের জন্য এই এক্সট্রা কারিকুলামগুলো সংযুক্ত করা হয়। যেকোন প্রজেক্ট প্রোপোজাল সাবমিটের ক্ষেত্রে বা টেন্ডার সাবমিটের ক্ষেত্রেও রিক্যুয়ার্ড ডকুমেন্টের সাথে (কর্তৃপক্ষ না চাইলেও) কিছু এক্সট্রা নথি-পত্র সংযুক্ত করে দিলে তা অবশ্যই মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ গুরুত্ব বহন করে।
যে নথি-পত্রগুলি নিয়ে নিম্নে আলোচনা করছি, তার সবগুলিই ব্যবসার শুরুতেই বাধ্যতামূলক, তা নয়। ফান্ডামেন্টাল ডকুমেন্টগুলো দিয়ে আপনি ব্যবসা শুরু করতে পারবেন। কিন্তু আপনার লক্ষ্য থাকতে হবে সবগুলি নথি-পত্র/সার্টিফিকেট অর্জন করা।
শুরু করছি,
e-GP তে রেজিস্ট্রেশনের সময় যা লাগে তা প্রথমে লিখছিঃ
১। কোম্পানি ইনকর্পোরশন সার্টিফিকেট অথবা রেজিস্ট্রেশন ডকুমেন্ট (যাদের ইনকর্পোরশন সার্টিফিকেট নেই, অর্থাৎ যাদের বিজনেসের ধরণ একক মালিকানা বা প্রোপ্রাইটরশিপ, তাদের ক্ষেত্রে মালিকানা অঙ্গীকারনামা/হলফনামা/এফিডেভিড লাগবে)
২। ট্রেড লাইসেন্স (আপডেট)
৩। TIN সার্টিফিকেট (আপডেট)
৪। VAT (আপডেট-১৩ ডিজিট)
৫। ফার্ম/কোম্পানি এডমিন এর জন্য কোম্পানি/ফার্মের মালিক থেকে অথোরাইজেশন লেটার
৬। অথোরাইজড এডমিন এর জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা পাসপোর্ট (পাসপোর্টের প্রথম ২ পৃষ্ঠা)
৭। অথোরাইজড এডমিন এর ১ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি
৮। ই-জিপি নিবন্ধন এর ব্যাংক ফি জমার রশিদ কপি
এরপর বিজনেসের ধরণ এবং প্রয়োজন অনুসারে যে লাইসেন্সগুলি করতে পারেনঃ
১। Public Works Department (PWD)
২। Local Government Engineering Department (LGED)
৩। Health Engineering Department (HED)
৪। Education Engineering Department (EED)
৫। Electric Contractor & Supervisor (ABC) License
৫। Military Engineering Services (MES)
৬। BEPZA
৭। ইত্যাদি
ফিনান্সিয়াল ক্যাপাবিলিটির জন্য যে নথি-পত্রগুলো প্রস্তুত রাখা দরকারঃ
১। Audited Financial Statement
২। Average Annual Turnover (Minimu Last 3 Years)
৩। Bank Solvency Certificate / Bank Statement
৪। Source of Credit Line (for Adequacy of Working Capital)
পূর্ববর্তী এবং চলমান কাজের নথি-পত্রসমূহঃ
১। Completed Project (Work Order & Agreement)
২। Work Completion Certificate
৩। On-going Project (Contract Agreement/Notice of Commencement)
৪। List of Client References (With Contact Details according to Project)
কোম্পানি/ফার্মের অবকাঠামোগত নথি-পত্রঃ
১। কোম্পানি প্রোফাইলঃ কোম্পানির যাবতীয় তথ্যের সমন্বয়ে সুন্দর একটা প্রোফাইল তৈরি করে রাখুন
২। এমপ্লয়ি লিস্টঃ নাম, পদবি, যোগ্যতা, নিয়োগের তারিখ ইত্যাদি দিয়ে একটা এমপ্লয়ি লিস্ট তৈরি করে রাখুন এবং অফিস ম্যানেজমেন্ট স্টাফ ও অপারেশন ম্যানেজমেন্ট স্টাফদের জন্য আলাদা ছক করুন
৩। প্রত্যেক এমপ্লয়ির সিভি/রিজিউম আপডেট রাখুন
৪। HR পলিসিঃ আপনার কোম্পানির জন্য একটি HR পলিসি তৈরি করুন
৫। ইকুপমেন্ট লিস্টঃ নাম, কার্য-ক্ষমতা, সংখ্যা, নিজের, নাকি ভাড়া ইত্যাদি তথ্য দিয়ে একটা ইকুইপমেন্ট লিস্ট তৈরি করে রাখুন
৬। সেফটি পলিসিঃ আপনার কোম্পানির জন্য একটি সেফটি পলিসি তৈরি করুন
ওয়ার্কিং পলিসি রিলেটেড নথি-পত্রঃ
১। ওয়ার্কিং পলিসিঃ ওয়ার্ক এক্সিকিউশন প্রসেস, টেকনিক্যাল এপ্রোচ, ওয়ার্ক মেথডোলজি, ওয়ার্ক প্ল্যান, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, ওয়ার্ক ইভালুয়েশন ইত্যাদি উল্লেখপূর্বক একটা ওয়ার্কিং পলিসি তৈরি করে রাখুন
২। Gantt চার্টঃ সম্ভাব্য ওয়ার্ক প্রগ্রেস কেমন হতে পারে তার একটা টেমপ্লেট তৈরি করে রাখতে পারেন
সম্ভব হলে নিম্নোক্ত অর্গানাইজেশন হতে মেম্বারশিপ বা সার্টিফিকেট নিতে পারেনঃ
১। International Organization for Standardization (ISO)
২। Bangladesh Association of Construction Industry (BACI)
৩। Dhaka Chamber of Commerce & Industry (DCCI) / (যার যার) জেলার চেম্বার অফ কমার্স
৪। ইত্যাদি
অন্যান্যঃ
১। লেটিগেশনসঃ কোম্পানির মামলা-মোকদ্দমার কোন বিষয় যদি না থাকে তাহলে প্রয়োজনে একটা এফিডেভিড করে নোটারি করে রাখতে পারেন
২। ডেবারমেন্টঃ কোন কারণে কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ডেবার্ড হয়ে থাকলে তার জন্য যথাযথ এবং বিশ্বাসযোগ্য কারণ দর্শিয়ে ডকুমেন্ট প্রস্তুত রাখুন।

Saturday, May 30, 2020

গাংনীর ইউএনও এর নামে ফেসবুক লাইভে মামলা করার হুমকি দিলেন মেয়র আশরাফুল

গত ২৮ মে বৃহস্পতিবার রাত ৮ টা ২৫ মিনিটে তার নিজ ফেসবুক পেইজে ( https://www.facebook.com/watch/live/?v=535994777070320&ref=watch_permalink) অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে প্রায় ৪০ মিনিটের লাইভ দেন। ইতোমধ্যে পৌর মেয়রের ফেসবুক লাইভটি ভাইরাল হয়েছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন সহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় বইছে।
জানা গেছে,করোনা সংক্রমনের কারনে সরকার সারা দেশের ন্যায় গাংনী পৌরসভার ১২শ’ অসচ্ছল মানুষের ওএমএস চাল প্রদানের জন্য তালিকা তৈরির নির্দেশনা প্রদান করেন। তালিকায় অসচ্ছল ব্যক্তিদের ১০ টাকা কেজি দরে প্রতি মাসে ২০ কেজি চাউল দেয়া হবে। সেই তালিকার তদন্ত প্রতিবেদনে ১০৯ জনের সচ্ছল ও ঠিকানা বিহীন নাম থাকায় গত ১৮ মে রাত ৯টা ৪০ মিনিটে সংশোধনের নির্দেশনা দিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিলারা রহমান।
এ ঘটনায় গাংনী পৌর মেয়র আশরাফুল ইসলাম তার ফেসবুক লাইভ ভিডিওতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিলারা রহমানের বিরুদ্ধে আরসিসি পাইপ,জলাতংকের টিকা না দেয়া ও পুকুরে মাছ না ছেড়ে বিল উত্তোলন সহ বিভিন্ন কাজের নানা অনিয়মের অভিযোগের ফিরিস্তি তুলে ধরেন। এসময় পৌর মেয়র আশরাফুল ইসলাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিলারা রহমানের ব্যক্তিগত ও বিভিন্ন কর্মকান্ড নিয়ে বিদ্রুপ এবং নানা সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, ওএমএস তালিকায় কোন অনিয়ম হয়নি তদন্ত ছাড়াই সচ্ছল ও ঠিকানা বিহীন বলা হয়েছে। অনিয়মনের বিষয় গুলো তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম বলেই আমার সম্মানহানি করা হয়েছে। আমি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করে আদালতের দরজায় হাজির করবো।
এছাড়া বাড়িতে বসে অফিস করার অভিযোগ তুলে তালিকা যাচাই বাছাই কারীদের নাম প্রকাশের আহবান জানান মেয়র।
গত বৃহস্পতিবার গাংনী উপজেলা্র বর্তমান সমসাময়িক পরিস্থিতি বিষয়ে লাইভে ব্রিফকালে বিদায়ী ইউএনও কেমন মানুষ ছিলেন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ খালেক জানান, এক কথায় তিনি অত্যন্ত ভালো ছিলেন। তাঁর নীতি আদর্শ সততা নিষ্ঠা ও যোগ্যতার প্রশংসা করা যায়। তিনি এখানে যোগদান করার পর করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে যোগ্যতা দেখিয়েছেন। সকলের সাথে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে কাজ করেছেন। সকলের ঐক্যমতে কাজ করেছেন। তিনি আরো আশা করেন বিদায়ী ইউএনও যেন গাংনীর মত নতুন কর্মস্থলে কাজ করে সুনাম অর্জন করেন এবং তিনি তার পরিবার পরিজন নিয়ে যেন সুখী থাকেন।
সদ্য বিদায়ী গাংনী উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিলারা রহমান বলেন,আরসিসি পাইপ সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সময় এডিবি থেকে প্রকল্প নিয়ে তিনিই বাস্তবায়ন করেছেন। তাছাড়া এডিবি থেকে ইউনিয়ন পরিষদে বরাদ্দ দেয়া হয় পৌরসভাকে নয়। জলাতংকের টিকা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দেয়া হয়েছে তার সকল ডকুমেন্ট অফিসে সংরক্ষিত রয়েছে। মাছের বিষয়টা মৎস্য কর্মকর্তার কাছে খোঁজ নিয়ে সঠিক তথ্য জানা যাবে। এছাড়া সহকারী কমিশনার ভূমিকে দিয়ে পৌর এলাকায় তদন্ত করা হয়েছে সেখানে ১ হাজার ২শ জনের মধ্যে ১০৯ জনের সচ্ছল ও ঠিকানা বিহীন পাওয়া যায়। এছাড়া গাংনী উপজেলার দুস্থ অসহায় ২২ হাজার পরিবারের তালিকা প্রেরন করা হয়েছে সেই তালিকা ট্যাগ অফিসারকে দিয়ে কার্ড যাচাই বাছাই করা হয়েছে। এছাড়া নীতিমালা অনুযায়ী খাদ্য কর্মকর্তা কার্ড ইস্যুকারী একারনে তাকেই তালিকা সংশোধনের জন্য বলে আমি আমার দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করেছি। এখানে মেয়রের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। এছাড়া জেলা প্রশাসককে ২৭ তারিখে এ বিষয়ে লিখিত ভাবে জানানো হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, তালিকা যাচাই করে দেখা যায় তিনতলা বাড়ি গাড়ির মালিকদের কার্ড দেয়া হয়েছে। যেমন- গাংনী উত্তরপাড়ার জমির উদ্দিনের ছেলে নজরুল ইসলাম, উত্তরপাড়ার মৃত ইউসুফ আলীর ছেলে ও হামিদ ডিজিটাল সাইন এর মালিক আঃ হামিদ ও আঃ হামিদের বোন এবং শ্রমিক নেতা ও সদর উদ্দিন মার্কেটের স্বত্বাধিকারী ফজলুল হকের স্ত্রী খালেদা খাতুন। এমনকি দুজন কাউন্সিলরের স্বামীকে তালিকা ভুক্ত করা হয়েছে। যাদের একজনের তিনতলা বাড়ি আরেকজন পৌরসভার নিয়মিত কর্মচারী। এছাড়া গার্মেন্টস মালিক,মার্কেট মালিকসহ পৌরসভার নিয়মিত সচ্চল কর্মচারীকে ওএমএসের তালিকায় অন্তভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন,পৌর মেয়র তার ফেসবুক লাইভে আক্রমনাত্মক এ ভাষায় আমার পারিবারিক, জেন্ডার ও সরকারী কাজের নানা সমালোচনা করতে গিয়ে মিথ্যাচার করেছেন। দাপ্তরিক কর্মকান্ডে ভুল ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে তিনি আমার উর্দ্ধত্বন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে পারেন। কিন্তু তা না করে ফেসবুক লাইভে তার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করা হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের উদ্ধর্ত্বন মহলকে লিখিত ভাবে জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন উপজেলার ২২ হাজার অসচ্ছল পরিবারের তালিকার মধ্যে পৌর এলাকার ৪ হাজার জনের নামের তালিকা জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কার্যালয়ে প্রেরন করা হয়েছে। পরবর্তী ব্যবস্থা সেখান থেকেই নেয়া হয়। তিনি আরো বলেন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার পুবেই তার বদলি হলেও এ বিষয় বিভ্রান্ত ছড়ানো হচ্ছে।
মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক আতাউল গনী বলেন, এখন পর্যন্ত লিখিত কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। লিখিত পেলে পরবর্তীতে তদন্ত পূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। উল্লেখ্য যে গত গত বৃহস্পতিবার দিলারা রহমানের শেষ কর্ম দিবস ছিলো। তাঁকে সরকারি নির্দেশে চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলায় ১৮ মে বদলি করা হয়েছে।

Friday, March 6, 2020

শহীদ ড. শামসুজ্জোহা দিবস।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দরদি, নামকরা শিক্ষক শহীদ ড. শামসুজ্জোহা ছাত্রছাত্রীদের বাঁচাতে জীবন বিলিয়ে স্থাপন করেছেন চিরকালের ভালোবাসার অপূর্ব নিদর্শন। ১৮ ফেব্রুয়ারি তার ৫১তম শাহাদাত দিবস। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপককে নিয়ে লিখেছেন শাহীন আলম.
১৯৬৯, পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে উত্তাল গণ-আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানে। প্রবল আন্দোলনে ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি– ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র আসাদ (আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান), ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হক ঢাকায় শহীদ হলেন। তাদের মৃত্যু সংগ্রাম আরও বেগবান করল। পুরো পূর্ব পাকিস্তানে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এমন পর্যায়ে গেল যে, ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক– সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ যোগ দিতে থাকলেন। পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার সামরিক বাহিনীর হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে তাদের রাজপথে জনতার মুখোমুখি নামিয়ে পরিস্থিতি পক্ষে সামলানোর চেষ্টা করলেন। দেশের নানা স্থানে সান্ধ্য আইন, ১৪৪ ধারা জারি হয়েছে।
আন্দোলনের ঝড় উঠেছে রাজশাহীতে। ১৭ ফেব্রুয়ারি কারফিউ, কিন্তু প্রতিবাদী জনতা, ছাত্র, শিক্ষক ভেঙে দিলেন রাজপথে নেমে। ড. মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। অসীম ক্ষমতা তার, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রাণ। জানলেন, শহরে আন্দোলন করতে গিয়ে তার কজন ছাত্র সেনাদের হামলার আঘাতে আহত হয়েছেন। সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রিয় বন্ধু বাংলার সভাপতি অধ্যাপক ড. মযহারুল ইসলামকে নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেন। আহতদের অবস্থা দেখে মর্মাহত দুই শিক্ষক। পরম স্নেহেপ্রবল ছাত্রদের কোলে করে ভর্তি করলেন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে। ছাত্রের রক্তে শিক্ষকদের পরনের কাপড় লাল। পোশাক বদলানোর কথা না ভেবে ড. শামসুজ্জোহা ছাত্রদের বাঁচাতে এগিয়ে গেলেন। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ফিরলেন ক্যাম্পাসে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের জরুরি সভা আহ্বান করলেন। নিজের রক্তাক্ত শার্ট দেখিয়ে ছাত্রদের কষ্টে গভীর ব্যথিত শিক্ষক বললেন– ‘আহত ছাত্রদের পবিত্র রক্তের স্পর্শে আমি উজ্জীবিত। এরপর যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুলি হয়– সে গুলি কোনো ছাত্রের গায়ে লাগার আগে আমার বুকে বিঁধবে।’ সভা, আলোচনার পরও তাদের আহত ছাত্রদের সাহায্য এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎপরতা জানা ও প্রতিরোধের চেষ্টা চলতে লাগল।
পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯। ভোর ৬টা। প্রতিদিনের অভ্যাসে ড. শামসুজ্জোহা বিবিসি ও আকাশবাণী কলকাতার অনুষ্ঠান গভীর মনোযোগে শুনেছেন। পাশে তার রেডিও। পণ্ডিত রবিশঙ্করের সেতার বাজছে। বেজে উঠল টেলিফোন। শীত, মোটা লাল শাল গায়ে চড়িয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ছাত্রীরা কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে যাচ্ছেন– টেলিফোনে সংবাদ পেলেন। এক সেকেন্ড দেরি না করে চলে গেলেন উপাচার্য ভবনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক তালা দেওয়া। পরিস্থিতি খুব খারাপ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন প্রশাসন। শিক্ষকদের নির্দেশন না মেনে আসাদ, সার্জেন্ট জহিরের খুনের বদলায়, ৈস্বরাচার আইয়ুব খানকে ফেলে দিতে ছাত্র, ছাত্রীরা দলে, দলে মিছিল করে এগিয়ে চলছেন। বহুদিনের চেনা নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের জীবন বিলিয়ে দিতে দেবেন না। তাই তালা খুলবেন না। দামালরা নাছোড়। উঁচু দেয়াল টপকে ‘ঢাকা-নাটোর মহাসড়ক’-এ যাবেন। রাজপথ অবরোধ হবে। সার্জেন্ট জহুরুল হকের নির্মম হত্যার প্রতিবাদে ছাত্র বিক্ষোভের একটি মিছিল ১৪৪ ধারা ভেঙে তুমুল সেস্নাগানে রাজশাহী শহরে যাবে– কারও মাধ্যমে সামান্য আগে জেনেছেন অধ্যাপকরা। তাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম শামস-উল-হকের রুমেই জরুরি সভা হচ্ছে বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের। পূর্ব পাকিস্তান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তুমুল আন্দোলনে ছাত্র, ছাত্রীদের জীবন বাঁচানো, তাদের নিরাপত্তায় তারা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেবেন? লেখাপড়ার কী হবে? অসীম সাহসী প্রক্টর সাহসী ড. শামসুজ্জোহা বন্ধ করে দেওয়ার বিপক্ষে। হঠাৎ একজন ছাত্র দৌড়ে জরুরি সভার ভেতরেই চলে এলেন–‘স্যার, সর্বনাশ হয়েছে। প্রধান ফটক বন্ধ হলেও ছাত্র, ছাত্রীরা দেয়াল টপকে ওপারের রাজপথে নামছে। ঠেকাতে, বোঝাতে পারছেন না কেউ।’ ওপারে বন্দুক তাক করে রাজপথের নিরাপত্তার আড়ালে ক্যাম্পাসে খেয়াল রাখছেন পাকিস্তান সেনা সদস্যরা। ছাত্র বলে ক্ষমা করার অর্ডার নেই। রক্তগঙ্গা হবে। শুনে থাকতে পারলেন না প্রক্টর– ‘এখুনি সভা মুলতবি করে আমাদের ঘটনাস্থলে যেতে হবে।’ নির্দেশের অপেক্ষা করলেন না। উপাচার্য, সহকর্মীদের দিকে না তাকিয়েই হুড়মুড় করে বেরুলেন। তিনিও যাবেন। অন্য শিক্ষকরাও সঙ্গে, সঙ্গে কর্তব্য স্থির করলেন। কথা নয়। চললেন অধ্যাপক ড. মযহারুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. আবদুল খালেক, গণিতের অধ্যাপক ড. সুব্রত মজুমদার, অধ্যাপক ড. মোল্লাসহ অনেকে। শিক্ষকরা বয়স হয়েছে বলে দেয়াল টপকাতে পারলেন না। নিজে এগিয়ে ড. ইসলাম, ‘গেট খুলে দাও’ বললেন। মাথা নিচু করে চাবি হাতে নিরাপত্তা কর্মকর্তা গেট খুললেন।
সেনাবাহিনীর দলটির নেতৃত্বে ক্যাপ্টেন হাদী ও ক্যাপ্টেন আসলাম। ড. মযহারুল ইসলাম অনুরোধ করলেন হাতজোড় করে, এগিয়ে যেতে যেতে বলছেন, ‘আপনারা গুলি করবেন না ক্যাপ্টেন। আমার ছাত্রদের শান্তভাবে থাকার অনুরোধ করছি। আমরা তাদের ভেতরে নিয়ে যাচ্ছি।’ এগিয়ে গেলেন ড. শামসুজ্জোহা। একবার রাইফেল হাতে সেনা সদস্যদের প্রধান ক্যাপ্টেন হাদী আরেকবার উত্তেজিত, মিছিলে যোগ দেওয়ার জন্য মরিয়া ছাত্র, ছাত্রীদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। সবার সঙ্গে কথা বলছেন, মধ্যস্থতা করছেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীও পিছু হটতে নারাজ। সঙ্গিন পরিস্থিতি টের পেয়ে গিয়েছেন তারা। রক্তে নাচন, হাতে তাদের অস্ত্র। ছাত্র, ছাত্রীর পিছিয়ে যাবেন না। অনেক সয়েছেন। প্রক্টর পাকিস্তানি সেনা দলের এক প্রধানের সঙ্গে ছাত্রদের হয়ে কথা বললেন। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হলো। আরও ক্ষেপে যেতে পারেন– এই ভয়ে ড. শামসুজ্জোহার হয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন অধ্যাপক ড. মযহারুল। বুঝলেন, নিজের ছেলে, মেয়েদের বাঁচাতে চাইবে। শেষ পর্যন্ত জোহা ছাত্রদের পক্ষই নেবে। পরিস্থিতি বাজে হবে, সৈন্যরা গুলি শুরু করার অর্ডার পেতে পারেন। তিনি এগিয়ে গেলেন। ড. শামসুজ্জোহাকে হাত ধরলেন। ছাত্রদের ডেকে আবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়তে চাইলেন।
ড. জোহা কিংবদন্তি শিক্ষক। তার সঙ্গে চলে এলেন অনেকে। কারও, কারও বেপরোয়া জীবনবাজি রাখার শপথ পূরণ হতে চলেছে। অন্যায়ের শেষ তারা দেখবেন। প্রধান ফটক বন্ধ করলেও প্রতিবাদে মুখর ছাত্রছাত্রীদের কয়েকজন সামান্য পরে দেয়াল টপকে রাজপথে নামলেন। শিক্ষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, সৈন্যদের পাশবিকতা সহ্য করতে পারছেন না। ক্ষুব্ধ শিক্ষকদের দলটি প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা ও অধ্যাপক ড. মযহারুল ইসলামের সঙ্গে প্রধান ফটক খুলে আবার বেরিয়ে গেলেন। অস্ত্রের মুখে তারা দাঁড়িয়ে পড়লেন। উত্তাল ছাত্র, ছাত্রীরা স্লোগান দিচ্ছেন। তারা সবাই পাকিস্তানের হাত থেকে মুক্তি চান, সেনাবাহিনীর অপশাসনের শেষ চান। ফিরে যেতে বলছেন নিজের দেশে। সৈন্যরা ক্যাপ্টেনদের আদেশে পজিশন নিয়েছেন। যেকোনো মুহূর্তে গুলি করবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন, তাদের ভাই, বোনের মতো ছাত্রছাত্রীরা–কোনো বিকার নেই। অ্যাকশন। বহুদিনের প্রশিক্ষণে আদেশ পালন করছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (পদটি তখন রিডার) ড. শামসুজ্জোহা বারবার একটি কথা বলছেন– ‘প্লিজ, ডোন্ট ফায়ার, প্লিজ, ডোন্ট ফায়ার; দে আর স্টুডেন্টস। দে আর আওয়ার চাইল্ডস।’
তিনি এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছেন আগে। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম কর্মী; তবে এবার আরও এগিয়েছে বাঙালি স্বাধীনতার প্রশ্নে; অপশাসন অবসানের লড়াইয়ে। বললেন করজোড়ে অনেকবার তিনি, ‘আমার ছাত্ররা এখুনি এখান থেকে চলে যাবে। আমরা তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাব।’ তবে হঠাৎ সবাই চমকে গেলেন, ‘ফায়ার’– সশব্দে জোরে আদেশ, গুলির শব্দকেও সেকেন্ডের ব্যবধানে ছাপিয়ে উঠল। নির্দিষ্ট টার্গেট নয়, এলোপাতাড়ি গুলি করা হলো। ড. হাবিবুর রহমান, অধ্যাপক আবু সায়ীদ, ড. মযহারুল ইসলামসহ কয়েকজন শিক্ষক আছেন। প্রধান ফটকের কাছে, গুলিবর্ষণের আওতার বাইরে রয়েছেন বলে চলে যেতে পারলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের ভেতরে। মাথা নিচু করে রেখেছিলেন। হামাগুড়ি দিয়ে কয়েকজন ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে পারলেন। প্রক্টর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের দক্ষিণে। সঙ্গে ড. মান্নান, ড. খালেকসহ কয়েকজন। শিক্ষকরা ছাত্রদের সঙ্গে থেকে নিরাপদে সরেছেন। ড. শামসুজ্জোহা তাদের পেছনে পড়েছেন। চারদিক থেকে তাকে ঘিরলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুর্বিনীত, হিংস্র ও রক্তলোলুপ সৈন্য, অফিসার। আদেশ পেয়ে বেয়নেট দিয়ে কুপিয়ে শরীরের মাংস কেটে ফেলতে লাগল তার। হাড় ভাঙতে লাগল। চিৎকার করে কাঁদছেন তিনি। মাটিতে পড়ে গিয়েছেন; ক্ষমা নেই। তার লাল পবিত্র রক্তে ভেসে যাচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। অনেকক্ষণ কোপানোর পর শািন্তর অগ্রনায়কের শরীরে সাড়া নেই দেখে মরে গিয়েছেন ভেবে গাড়িতে তুলে ফেললেন সৈন্যরা। ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে ফিরবেন ও লাশ গায়েব করে ফেলবেন। জানেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থামবে না। প্রিয়তম শিক্ষককে এখন পেলে তাদের জানে ফিরতে দেবেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ছাত্রীরা। তখনো শরীর বেয়ে অঝোরে রক্ত গড়াচ্ছে ড. শামসুজ্জোহার। মাটি করেছে পবিত্র। দূর থেকে অন্য অধ্যাপকরা অন্যায় ও অবিচার ও শিক্ষকের মৃত্যু থমকে দেখছেন। ভাবছেন, ড. মোল্লা মারা যাচ্ছেন। এগোতে পারলেন না। সৈন্যদের পিশাচ আচরণের সঙ্গে তারা পরিচিত নন। আজরাইলের চেহারা আগে দেখেননি। সৈন্যদের আরেক দল এগুলেন দক্ষিণের গেটে। গ্রেপ্তার করলেন উপস্থিত শিক্ষকদের। প্রাণ ও ছাত্রদের বাঁচিয়ে যারা আশ্রয়ে আছেন। গাড়িতে ওঠার সময় তারা জানলেন, আহত ড. শামসুজ্জোহা মুমূর্ষু। তারা বন্দি হয়ে রাজশাহী মিউনিসিপ্যালিটির অফিসে ঢুকলেন। তখন সেটিই কাছাকাছি জেলখানা হয়েছে। একটি ঘর কয়েদখানা। কোনো পরোয়া নেই কারও। সবাই জানেন, পরিস্থিতি যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের রিডার ড. শামসুজ্জোহার রক্তাক্ত প্রায় মৃত শরীর মিনিউসিপ্যালিটির বারান্দায় সৈন্যরা নিয়ে গিয়ে তুলে ফেলে রাখলেন। বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত তিনি এভাবে রইলেন।
তার বিশ্ববিদ্যালয় এখন বিস্ফোরণোন্মুখ। সেনাবাহিনীর গাড়ি চলে গিয়েছে। ছাত্র, ছাত্রীরা জমা হচ্ছেন। শিক্ষক ও অন্যরা তাদের জানিয়েছেন, জোহা স্যারকে ক্যাম্পাসেই মেরে ফেলছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সবাই আরও ফুঁসে উঠলেন। উপাচার্য ও অন্যরা ব্যস্ত প্রিয় সহকর্মী, বন্ধুকে বাঁচাতে। নানা জায়গায় যোগাযোগ করলেন তারা। নিজেরা গেলেন। ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলতে চললেন দলটি।
অনেক কষ্টে, বহু শ্রমে সাড়ে ৪টায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা সম্ভব হলো ড. শামসুজ্জোহাকে। তারা দেখলেন, বারান্দা লাল হয়ে গিয়েছে তার রক্তে। অনেক চেষ্টা করে উদ্যোগ নিয়ে বিখ্যাত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. দত্ত তার অপারেশন করতে পারলেন। শিক্ষকরা সেখানে ছাত্রদের নিয়ে আছেন। উপাচার্য অধ্যাপক শামস-উল-হক, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব শিক্ষক; রাজশাহীর অনেক মান্যগণ্য হাসপাতালে ড. জোহাকে বাঁচাতে আছেন। সবাই জীবনের আশায়। তবে অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে ক্লান্ত, রিক্ত ডা. দত্ত বললেন, ‘সরি, আমরা ড. শামসুজ্জোকে বাঁচাতে পারছি না। তার শরীরে গুলি নেই। গুলি করে মারা হয়নি। বেয়নেট অস্ত্রের আঘাত করে পেট ফেঁড়ে ফেলা হয়েছে। কিডনি, প্লিহা ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শরীরে রক্ত নেই। তার বাঁচার খুব একটা আশা নেই। আপনারা প্রার্থনা করুন। ঈশ্বরই তাকে বাঁচাতে পারেন।’
সন্ধ্যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সারা দিনের অত্যাচার, রক্তক্ষরণে, আঘাতে মারা গেলেন বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান কৃতী এই অধ্যাপক। গণিতের অধ্যাপক ড. সুব্রত মজুমদার সারা দিনের লুকিয়ে রাখা খবর তার স্ত্রীর কাছে বয়ে নিয়ে গেলেন। তিনি কাঁদছেন। তারা হাহাকারে আকুল। ড. জোহা থাকতেন শিক্ষক কোয়ার্টার ভবনের তৃতীয় তলায়। এখনো জ্বলজ্বল করে সেই বেদনার্ত স্মৃতিটি মনে প্রিয় সহকর্মীর– ‘আমার সঙ্গে ড. জোহা স্যারের দেখা হয়েছে সকালেই। সব সময় হাসিখুশি থাকতেন। কুশলবিনিময় করেছেন হেসে। তিনি ও আমি জরুরি শিক্ষক সভায় যাচ্ছিলাম। ভীষণ ভালো মানুষ। হাসি ছাড়া কথা বলতে পারতেন না।’
শহীদ অধ্যাপকের শাহাদতের খবরে সঙ্গে সঙ্গে থমকে গেল বিরাট বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষকের মৃত্যু জালেম সেনাবাহিনীর অত্যাচারে হতে পারে, মেনে নিতে পারছেন না কোনো ছাত্র, ছাত্রী। কয়েকজন ছাত্র ও কয়েকজন শিক্ষক আহত হয়েছেন– বাতাসের বেগে খবর ছড়াল বিরাট; অল্প ছাত্র, ছাত্রীর ক্যাম্পাসে। কী করবেন তারা? কয়েকজন শিক্ষক সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার ও বন্দি। ভয়, উত্তেজনা ও প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে, নিভছে; আবার বাড়ছে। করণীয় ঠিক হচ্ছে না। পাগলাটে ক্যাম্পাসে গাছের পাতা ভয় পাচ্ছে। চলছে রেডিও, খবরের কাগজ হাতে, হাতে ঘুরছে। নেতারা আলোচনা, ভাবনায় ব্যস্ত। বাংলাদেশ বেতার কী বলেছিল? বিবিসি জানিয়েছে, তাদের ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে রাত ১১টার খবরে– ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন।’
এতই অন্ধকারে দেশ, সামরিক শাসনের বুটের তলায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তেজনা এত তুঙ্গে যে, সত্যি খবরটি গুলি না আঘাত, খুঁচিয়ে, খুঁচিয়ে হত্যা– জানতে পারেননি সংবাদদাতা। তবে ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরলেন খবরে। রাষ্ট্র, বিশ্ব হয়ে গেল। সবাই জানলেন। থমকে গেল পূর্ব পাকিস্তান। শেখ মুজিব, তাজউদ্দীনের মতো নিরুত্তাপ মানুষও বাক্যহারা। এখানে, সেখানে সামান্য সময়ের জন্য, অল্প কী এক আলোচনায় নামলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্র, ছাত্রীরা। এরপর একে একে জমা হতে লাগলেন প্রকৃতির নিয়মে। সাইক্লোন আসছে। বাঁশের লাঠি, গাছের ডাল, লুঙ্গিতে গোছ; গায়ে সাদা গেঞ্জি; প্যান্ট-শার্ট; স্যান্ডেল নেই– আসছেন তারা। চোখ উজ্জ্বল। হাজার, হাজার মানুষ। কে শিক্ষক, কে ছাত্র, কে রিকশা চালান স্বীকৃতির আর কোনো দরকার নেই। ‘জোহা হত্যার বিচার চাই; তদন্ত চাই’, ‘সামরিক শাসন মানি না মানব না’ ‘সান্ধ্য আইন মানি না, মানব না’; ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই’– এই বলে, বলে চললেন তারা দারুণ রাগে ঘুরে, ঘুরে। শান্ত রাজশাহী ফুঁসছে। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মিছিল চলছে রাত ১২টায়ও। সবাই জানেন– যেকোনো মুহূর্তে তাদের ওপর গুলি চালাবে সেনাবাহিনী। তবুও তারা মরিয়া।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও আগুন। অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীরা মিছিল করেছেন। অন্যত্রও। স্বাধীনতার দিকে এগোল ড. শামসুজ্জোহা, আসাদের রক্ত। ছাত্ররা প্রাণপ্রিয় শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহার মৃত্যুর সংবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে এলেন। শোকে বিহ্বলরা ছুটলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। ১৯৬৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পরদিন তার মৃত শরীর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসা হলো। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শুভার্থীরা লাল ফুলে জড়িয়ে আরও রঙিন করলেন রক্তাক্ত দেহ। ড. জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে কয়েক সদস্যের কমিটি করা হলো। তাদের ভীষণ সাহসী সিদ্ধান্ত এলো– রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে কবর হবে ড. শামসুজ্জোহার। ‘শাবাশ বাংলাদেশ’ মাঠে জানাজা হলো। মাঠজুড়ে ড. জোহার শুভার্থীরা একটিই প্রার্থনা করেছেন, ‘আল্লাহ স্যারকে জান্নাত নসিব করুন।’ তাকে কবরে শোয়ানো হবে। হঠাৎ একজন শিক্ষার্থী এসে স্যারের কবরে শুয়ে পড়লেন। কাঁদতে, কাঁদতে চিৎকার করে বলছেন, ‘স্যারের বদলে আমাকে কবর দিন। স্যার আমাদের জন্য মারা গিয়েছেন।’
তার জন্ম পশ্চিম বাংলায়। ১৯৪৩ সালের ১ মে। মেদিনীপুরের বাঁকুড়া। পাড়ার লোক, বন্ধুরা বলত ‘মন্টু’। দেখতে ভালো; হিন্দি সিনেমার পোকা; আরেক নাম ‘দিলীপ কুমার’। বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুর রশীদ। লেখাপড়ায় বরাবর ভালো তার মন্টু। বাঁকুড়া জেলা স্কুলে ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৪৮ অবধি-দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে মেট্রিক পর্যন্ত পড়েছেন। বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে ভালো ফল নিয়ে পাস করেছেন। বাঁকুড়া ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট বিজ্ঞানে। সেখানেও খুব ভালো ফল। দেশভাগের আগ, পর থেকে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা তাদের প্রিয় জন্মভূমিতে থাকতে দিল না। ১৯৫০ সালের শুরুতে জেগে উঠল ইবলিস। পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা রক্তগঙ্গায় ভাসল। থাকতে পারলেন না তারাও। মুসলমান বলে এত কষ্ট পেতে হচ্ছে? বাঁকুড়ার অত্যন্ত সম্পদশালী পরিবারের কর্তা আবদুর রশীদ স্ত্রী, সন্তান, সামান্য সম্বল ও স্বর্ণ-গহনা নিয়ে চলে এলেন পূর্ব পাকিস্তান। খুব গরিব হয়ে গেলেন। জোহার মেধা তাদের সম্বল। তারা নামকরা সৈয়দ পরিবার। জোহা পড়ালেখা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, হলে থেকে। ১৯৫৩ সালে সেরা ছাত্র হয়ে অনার্স পাস। কৃতী অধ্যাপক ও নামকরা রসায়নবিদ শিক্ষক ড. খন্দকার মোকাররম হোসেনের (তার নামে ভবন আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে) অধীনে প্রিয় ছাত্র এমফিল থিসিস করেছেন। জোহার গবেষণার বিষয়– ‘বৈদ্যুতিক পদ্ধতিতে ক্রোমাইট খনিজের জারক প্রক্রিয়া।’ বিখ্যাত গবেষণা। লন্ডনের নামকরা ‘রসায়ন ও শিল্প’ পত্রিকায় ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয়ে সুনাম কুড়িয়েছে। ভালো ফল নিয়ে ১৯৫৪ সালে এমএসসি পাস করেছেন। বিস্তৃত গবেষণার আরেক ভাগ প্রকাশিত হয়েছে পাকিস্তানের নামকরা ‘পাকিস্তান সায়েন্স রিসার্চ জার্নাল’-এ, ১৯৫৫ সালে। এই বছরই সংসারের অভাব ঠেকাতে, পরিবারের হাল ধরতে চাকরিতে যোগ দিতে হলো তাকে। বছরের শেষে ‘শিক্ষানবিশ সহকারী কারখানা পরিচালক’ পদে ভালো বেতনে কঠিন পরীক্ষায় পাওয়া চাকরিতে যোগ দিলেন। খুব ভালো করলেন। মেধার পরিচয় দিলেন । প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৫৫ সালে ব্রিটেনের সাউথ ওয়েলসের ‘রয়্যাল অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি’তে বিস্ফোরক দ্রব্যের উচ্চতর প্রশিক্ষণে গেলেন। তাদের মাধ্যমে ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিন বছর লন্ডনের ‘ইমপেরিয়্যাল কলেজ অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’র ছাত্র ছিলেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএসসি (স্পেশাল) ডিগ্রি, ইমপেরিয়্যাল কলেজের এআরসিএস ডিগ্রি লাভ করেছেন। ১৯৫৯ সালের ৪ আগস্ট পশ্চিম পাকিস্তানের ওয়াহ ক্যান্টনমেন্টে সহকারী পরিচালক পদে যোগ দিলেন কৃতী বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ও মেধাবী এই গবেষক।
সব সময় সমাজসচেতন, তাদের একটি দেশের প্রয়োজন জানতেন। শামসুজ্জোহা বিদেশে যাওয়ার আগেই জেনেছেন, তার দেশে যুক্তফ্রন্ট ও প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় বাঙালিদের অবস্থান ও অপমান। দেশে ফেরার সুযোগ খুঁজছিলেন। ১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অর্ডন্যান্স কারখানার চাকরি ছেড়ে রাজশাহীতে এলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সামান্য সময়ের জন্য ডেভেলপমেন্ট (উন্নয়ন) অফিসার পদে নিয়োগ পেলেন পরীক্ষায় পাশ করে। তত দিনে ইমপেরিয়্যাল কলেজের উচ্চতর ডিগ্রির স্কলারশিপ পেয়েছেন।
বিয়ে করে জীবন গুছিয়েছেন। ১৯৬১ সালের ১১ জুন ঢাকার গাজীপুরের গজারিয়া গ্রামের হায়াত আলী খানের মেয়ে নিলুফা বেগমের সঙ্গে পরিণয়। সে বছরই তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিলেন। এরপরই ইমপেরিয়্যাল কলেজে উচ্চশিক্ষা নিতে শিক্ষা ছুটিতে চলে গেলেন। ১৯৬১-১৯৬৪ সাল তিন বছর বিদেশে গবেষণা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষায়। পিএইচডি, ইমপেরিয়্যালের ডিআইসি ডিগ্রি নিয়ে ড. শামসুজ্জোহা ফিরলেন নতুন ভুবনে। ড. শামসুজ্জোহা হলেন সহযোগী অধ্যাপক। তখন পদটি ছিল ‘রিডার’।
১৯৬৬ সালে তাদের অপরূপ মেয়ের জন্ম হলো। তিনি ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত শাহ মখদুম হলের আবাসিক শিক্ষক ছিলেন। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে নরওয়ের অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বছরের উচ্চতর গবেষণার সরকারি বৃত্তি লাভ করলেন। ফিরে হলেন সহযোগী অধ্যাপক। ১৯৬৮ সালের ১৫ এপ্রিল ড. মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্ব পেলেন।
জীবনের শেষ তাকে এই পদেই করতে হয়েছে। ছাত্র-শিক্ষক সবার প্রিয় ছিলেন। হাস্যোজ্জ্বল, ব্যক্তিত্বময়। মায়াময় মুখের হাসিতে কোনো দিন তার পিছুটান বুঝতে পারেননি কেউ। ১১ ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। বড় ভাই নদীতে ডুবে মারা গিয়েছেন। বাবার মৃত্যুর পর তাকে পরিবারের দায়িত্ব হয়েছে। ছোট দুই ভাই, বোনকে পড়ালেখা করাতেন নিজের কাছে রেখে। অপুষ্টিতে চোখের আলো চিরকালের জন্য নিভেছে দুই বোনের। কাউকে বলতেন না, কোনো দিন বোঝা যেত না তার ব্যথা। আবাসিক শিক্ষক হয়েই প্রতিটি রুমে গিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। মিশতেন খুব। ছাত্রদের কাঁধে হাত রেখে কথা বলতেন। ঘুচিয়ে দিতেন দূরত্ব। ‘ভাই’ ডাকতেন। শাহ মখদুম হলের আবাসিক ছাত্র মুহম্মদ মীর কাশেমের মনে আছে, ‘স্যারকে দেখেছি প্রকৃত মানুষ হিসেবে। শিক্ষক সার্থক, খেলোয়াড় দক্ষ, আচরণ ভদ্র, অমায়িক। নিবিড়ভাবে, বন্ধুর মতো মিশেছেন; এখনো বিরল।’ তখন রাজশাহীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এক আবাসিকছাত্র বৈদ্যুতিক শক খেয়ে মারা গিয়েছেন। খবর জেনে সে রাতেই ড. শামসুজ্জোহা মখদুম হলের প্রতি রুমে গিয়ে ছাত্ররা কীভাবে আছেন, বিদ্যুৎ ব্যবহার কীভাবে করছেন পরীক্ষা করে দেখেছেন। ছাত্র, ছাত্রী নিয়ে তার জীবন ছিল। গোলমালে বা বৈরিতায় ধমক না দিয়ে বন্ধু হয়ে সমাধান করেছেন। তেমনটাই সবার কাছে চেয়েছেন।
শিক্ষকদের কাছে প্রিয় সহকর্মী, ‘জোহা ভাই’। তাদের পরিবারে সংগীত, খেলাধুলা ও শিক্ষা-দীক্ষার চল ছিল। তাই সবেতেই তিনি পারদর্শী ছিলেন। খেলতেন ক্রিকেট, টেনিস, বাস্কেটবল ও ফুটবল। ক্রিকেট বেশি পছন্দ। পূর্ব পাকিস্তান ক্রিকেট দলের ক্রিকেটার ছিলেন। নামকরা খেলোয়াড় কর্মজীবনে ছেড়ে দেননি ক্রিকেট। নিয়মিত অনুশীলন করতেন ছাত্রদের নিয়ে। তাদের প্রেরণা দিতেন। রাজশাহী জেলা ক্রিকেট লিগে নিয়মিত ক্রিকেটার ছিলেন। উৎসাহী তরুণ শিক্ষক, কর্মকর্তাদের নিয়ে গড়েছিলেন ক্রিকেট দল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের সঙ্গে একটি ম্যাচ খেলার খুব ইচ্ছা ছিল তার। শেষ পর্যন্ত পারেননি। তাদের বিভাগের হয়ে নিয়মিত ফুটবল খেলতেন। বিশেষ কারণে না খেলতে পারলে তাকে মাঠে পাওয়া যেত। ফুটবল, ক্রিকেটে ধারাভাষ্য দিতেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃবিভাগ প্রতিযোগিতাগুলোতে বিভাগের শিক্ষকদের অংশগ্রহণের সুযোগ আছে। ড. শামসুজ্জোহা রসায়ন দলে ক্রিকেট ও হকি খেলেছেন। তার অধিনায়কত্বে রসায়ন বেশ কবার ফুটবলে টানা চ্যাম্পিয়ন। দলে গোলরক্ষক না থাকলে উৎসাহী, ভালো গোলরক্ষক হতেন। আন্তঃবিভাগ ক্রিকেট প্রতিযোগিতা তার উৎসাহে শুরু হয়েছে। খেলোয়াড় কেমন ছিলেন? গণিতের অধ্যাপক ড. শিশির কুমার ভট্টাচার্যের মনে পড়ে– ‘জীবনকে খেলার মতোই দেখতেন। খুব ভালো খেলোয়াড় ছিলেন। জীবনে যা আসুক সবখানে ফাইট করে জিততে চেয়েছেন। তার জীবন দর্শনে এ প্রভাব ছিল সবচেয়ে। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ঘটনায় তার খেলোয়াড়ি মনের পরিচয় পাওয়া যেত।’
তিনি প্রত্যক্ষভাবে কোনো রাজনৈতিক মতবাদ সমর্থন করেননি। তবে রাজনৈতিক চেতনা ছিল যথেষ্ট। উঠতি বয়সে, ছাত্রাবস্থায়, শিক্ষক হিসেবে, প্রক্টর হয়েও রাজনৈতিক বিষয়গুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণ সূক্ষ্ম রাজনৈতিক চেতনার প্রমাণ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। তখন সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড বয়েছেন। ভাষার মিছিলে সামনের সারিতে ছিলেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে সক্রিয় সিভিল ডিফেন্স কর্মী। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশি জুলুমের প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণ করেছেন। প্রথম সারিতে ছিলেন।
১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যু কোনো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, এমন কোনো দুর্ঘটনা ছিল না জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই। তারা নিশ্চিত, সুনির্দিষ্টভাবে তাকে ছুড়ে দেওয়া হয়েছিল মরণবাণ। কিছুক্ষণ আগে তিনি ক্যাপ্টেন আসলামের কাছে ধৈর্য ও সংযমের আবেদন জানিয়েছেন। তার কাছে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় প্রার্থনা করেছেন। সেই সময়ের মধ্যে ছাত্রদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। তারও আগে ক্যাপ্টেন হাদীর সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে তার। কারণ আগের দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি তার প্রক্টর অফিস থেকে পেট্রল এনে আন্দোলনের ছাত্ররা ঢাকা-নাটোর মহাসড়কের গাড়ি পুড়িয়েছেন বলেছে সেনাবাহিনী। ফলে পাকিস্তান সেনাদের সব ক্ষোভ জমেছিল তার ওপর।
তিনি মৃত্যুর দিনে কোনো বিক্ষোভ মিছিলের নেতা ছিলেন না। তারপরও বের হয়েছিলেন। মনে করেছিলেন, কারফিউ ভেঙে ছাত্ররা ক্যাম্পাসের বাইরে বেরোলে সরকারের ক্ষতি হবে না, ক্ষতি হবে সাধারণ ঘরের মা-বাবার। তাই ছাত্রদের মিছিল বিশ্ববিদ্যালয় গেটে আটকে দেওয়ার জন্য ছুটেছিলেন। আশঙ্কা করেছিলেন, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক পার হওয়া মাত্র নাটোর রোডে টহল দেওয়া অন্ত্রধারী সেনাদের গুলিতে অনেকে নিহত বা আহত হবে। সেটিই সত্য হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শ্রদ্ধায় তাদের প্রিয়তম শিক্ষকের স্মৃতি লালন করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি তার স্বরণে ‘শহীদ দিবস’ হয়। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকে। তাদের ‘শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা’য় আত্মদানকারীদের সঙ্গে তার স্মৃতিচিহ্ন আছে। পরের প্রজন্মের ছাত্র, ছাত্রীরা তার ও তাদের সম্পর্কে জানছেন। যেখানে তাকে খুন করা হয়েছে, তৈরি হয়েছে তার স্মৃতিস্তম্ভ। অাছে ‘শহীদ ড. শামসুজ্জোহা হল’। বাংলাদেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় এই শিক্ষকের আত্মোৎসর্গের সাক্ষ্য বহন করে প্রশাসনিক ভবনের সামনে তার কবর। তিনি এই দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী। ন্যায়, সংগ্রাম, স্বাধীনতার প্রদীপ্ত সাহসের অনন্য প্রতীক। বীর বাঙালি।

বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি শহীদ ডঃ জোহা স্যারের স্মৃতির প্রতি।