.

Friday, June 27, 2014

মেহেরপুরে প্যানেল মেয়র রিপন হত্যাআসামিদের দল ক্ষমতায়, তাই... তানিয়া লাবণ্য

মেহেরপুর পৌরসভার প্যানেল মেয়র রিপন হত্যার ১০ মাস পরও মূল আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। অন্যদিকে মামলা প্রত্যাহার ও প্রাণনাশের হুমকিতে তটস্থ নিহতের পরিবার। মৃত্যুর আগে রিপনের দেয়া জবানবন্দি তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
রিপন হত্যা মামলা প্রসঙ্গে মেহেরপুর-১ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন কালের কণ্ঠকে বলেন, আসামিদের দল ক্ষমতায়। তাই তারা সহজেই পুলিশ ম্যানেজ করে যা ইচ্ছা তাই করতে পারছে। এ রকম হতে থাকলে মানুষ আইনের প্রতি আস্থা হারাবে।
পুলিশ ঘটনার পর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন ওরফে বিপুলকে আটক করে। বিপুল পুলিশকে স্বীকারোক্তি দেয় বোমা হামলার সঙ্গে পৌর মেয়র মোতাছিম বিল্লাহ মতু, গোলাম রসুল, অ্যাডভোকেট মিয়াজান আলী, আমদহ ইউপি চেয়ারম্যান আনারুল ইসলাম, বোমাবাজ লাল্টু, মাসুদ রানা, জাহাঙ্গীর ও আকালী জড়িত। পরে পুলিশ লাল্টু ও জাহাঙ্গীরকে আটক করে। এরপর আর মামলার গতি এগোয়নি। এর মধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি বিপুল জামিনে বেরিয়ে এসেছে। মামলার প্রধান আসামি মেয়র মোতাছিম বিল্লাহ মতু হাইকোর্ট থেকে এক মাসের জন্য এই মামলায় জামিন হলেও নিম্ন আদালতে আর হাজির না হওয়ায় পরে হাইকোর্ট তাঁকে আটকের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। ওই নির্দেশের পর তিনি পলাতক।

গত বছরের ১ এপ্রিল মিজানুর রহমান নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শহরের রাজধানী শপিং সেন্টারে সন্ত্রাসীদের বোমা হামলায় আহত হন। ৮ এপ্রিল তিনি ঢাকায় অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাকালীন অবস্থায় মারা যান। তিনি মারা যাওয়ার আগেই মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসায় থাকাকালে মেহেরপুর জেলা প্রশাসক, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, সিভিল সার্জন ও আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তার (আরএমও) সামনে মৃত্যুকালীন জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, পৌর মেয়র মোতাছিম বিল্লাহ মতু, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিয়াজান আলী, সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম রসুল এবং যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুল্লাহ আল মামুন ওরফে বিপুল এই বোমা হামলা ঘটনার সঙ্গে জড়িত। পৌরসভার কয়েকটি বিষয়ে মেয়র মতু অন্যদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে মেরে ফেলার জন্য এ ঘটনা ঘটাতে পারে বলে তিনি তাঁর জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যজিস্ট্রেট মাসুদ আলী তাঁর এই মৃত্যুকালীন জবানবন্দি রেকর্ড করেন। অথচ রহস্যজনক হলেও সত্য যে জবানবন্দিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও মামলার এজাহার থেকে বাদ যায় জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মিয়াজান আলী ও সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম রসুলের নাম।
মামলার বাদী রিপনের বাবা আবদুল হালিম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'ঘটনার পর থানায় দাখিল করা এজাহার আবেদনে মিয়াজান আলী ও গোলাম রসুলের নাম থাকায় পুলিশ সেটা গ্রহণ করেনি। পরে পুলিশের ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁদের নাম বাদ দিয়ে আরেকটি এজাহার করা হলে সেটা গ্রহণ করে। রিপন মৃত্যুকালে জবানবন্দি দিলে তাঁদের নাম চলে আসে। তখন পুলিশকে বলা হয়, তাঁদের দুজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য; কিন্তু পুলিশ আর সেটা করেনি। সেটা না হয় বাদই দিলাম; কিন্তু রিপনের জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করেও তো পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করতে পারে। এ ধরনের জবানবন্দির চেয়ে আর বড় প্রমাণ কী হতে পারে?'
আবদুল হালিম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, গত ১৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল আলম হানিফ ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মের হক তাঁর বাড়িতে এসে ঘটনার সঠিক তদন্ত করা হবে বলে আশ্বাস দেন। কিন্তু তারও কোনো প্রতিফলন তিনি দেখছেন না।
নিহত রিপনের স্ত্রী রুমানা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, 'রিপন হত্যার আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশের এই টালবাহানা কেন? আসামিদের দাপট আর ক্ষমতার উৎস কোথায়? এখন আসামিরা প্রতিদিনই মোবাইল ফোনে হুমকি দিচ্ছে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য; না হলে আমার পরিবারের সবারই নাকি রিপনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এই হুমকির কারণে ছেলেমেয়ে দুটিকে বাইরে খেলতে দিতে যেতে পারি না। এভাবে হুমকি আর আতঙ্ক থেকে রেহাই পেতে তবে কি আমাদের আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হবে?'
মেহেরপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, মামলাটি বর্তমানে সিআইডিতে। তিনি নতুন এসেছেন। ফলে মামলা থেকে দুজনের নাম কিভাবে বাদ গেল, সেটা তাঁর জানা নেই।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঝিনাইদহ সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক শেখ মাহফুজুর রহমান জানান, দুই মাস আগে তিনি তদন্ত দায়িত্ব পেয়েছেন। রাজনৈতিক কারণে তদন্তের কিছুটা জটিলতা হলেও শিগগিরই মামলার চার্জশিট দেবেন।
মেহেরপুর জেলার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার রাকিবুল ইসলাম জানান, নতুন এসেছেন বলে এ মামলার বিষয়ে তিনি বিশেষ কিছু জানেন না।
সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদ আলী জানান, বোমা হামলার দিন মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। রিপন মৃত্যুকালীন সময়ে জবানবন্দিতে বলেছেন, 'কারা বোমা মেরেছে আমি চিনতে পারিনি। প্যানেল মেয়র নিয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। আমার সন্দেহ হয় যে মেয়র মতু, মিয়া উকিল, বিপুল ও গোলাম রসুল এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত।'
মামলার প্রধান আসামি পৌর মেয়র মোতাচ্ছিম বিল্লাহ মতু কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাঁকে মামলার আসামি করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর নাম জড়িয়ে তাঁকে হয়রানি করা হচ্ছে।
ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুল্লাহ আল মামুন ওরফে বিপুল বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধিতার কারণে তাঁকে আসামি করা হয়েছে। তিনিও রিপন হত্যার বিচার চান। তাঁর দাবি, ষড়যন্ত্রমূলক হয়রানি নয়, প্রকৃত হত্যাকারীদের খুঁজে বিচার করতে হবে। চার্জশিট হওয়ার আগেই চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া নিহতের জবানবন্দি মানুষের হাতে হাতে চলে গেছে। এতে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।